Tuesday, 5 April 2016

স্মরণঃ রফিক আজাদের একটি কবিতা

মারা গেলেন কবি রফিক আজাদ। বাঙ্গালী আজকে একটু গরিব হলো। আপনি বাংলায় লিখতেন, তাই বিশ্বজুড়ে ফেইসবুক রেডিকেলরা শোক ও শক দেখাতে হামলে পড়বে না। তবু আপনি বেঁচে থাকবেন আমাদের বাংলার বুকে। যেখানেই গেলেন, ভালো থাকবেন। পরের জন্মে পারলে এই দেশেই ফিরবেন।
"ভাত দে হারামজাদা
- রফিক আজাদ---সংকলিত (রফিক আজাদ)
ভীষণ ক্ষুধার্ত আছিঃ উদরে, শরীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভূত হতে থাকে- প্রতিপলে- সর্বগ্রাসী ক্ষুধা
অনাবৃষ্টি- যেমন চৈত্রের শষ্যক্ষেত্রে- জ্বেলে দ্যায়
প্রভুত দাহন- তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোন দাবী
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায়ঃ
বাড়ি, গাড়ি, টাকা কড়ি- কারো বা খ্যাতির লোভ আছে
আমার সামান্য দাবী পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর-
ভাত চাই- এই চাওয়া সরাসরি- ঠান্ডা বা গরম
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চাল হ’লে
কোনো ক্ষতি নেই- মাটির শানকি ভর্তি ভাত চাইঃ
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য-সব দাবী;
অযৌক্তিক লোভ নেই, এমনকি নেই যৌন ক্ষুধা
চাইনিতোঃ নাভি নিম্নে পরা শাড়ি, শাড়ির মালিক;
যে চায় সে নিয়ে যাক- যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে দাও
জেনে রাখোঃ আমার ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই।
যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবী
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘ’টে যাবে
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন কানুন-
সম্মুখে যা কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমেঃ
থাকবে না কিছু বাকি- চলে যাবে হা ভাতের গ্রাসে।
যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে ধরো পেয়ে যাই-
রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার হবে।
সর্বপরিবেশগ্রাসী হ’লে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ করে।
দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো : গাছপালা, নদী-নালা
গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব প্রধান নারী
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ী
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ
ভাত দে হারামজাদা,
তা না হলে মানচিত্র খাবো।"

কেন এই ব্লগ- শমীকের খসড়া


কেন এই ব্লগ (খসড়া)

Standard

ফরাসী দার্শনিক জিল দেল্যুজের লেখা ‘দিফেরঁস এ রেপিতিশিঁও’ (ফারাক এবং পুনরাবৃত্তি) প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। ফ্রান্স তখন উত্তাল মে ৬৮ আন্দোলনে। প্রকাশিত হওয়ার সময়ই ফ্রান্সে সারা ফেলে বইটি। দেল্যুজের এই বইটির ইংরাজি অনুবাদ হয় ১৯৯৪ সালে। দেল্যুজ মারা যান ১৯৯৫ সালে। ইংরাজি অনুবাদের মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, এই বইটিই তার লেখা দর্শনের প্রথম বই। এর আগে যে বইগুলো তিনি লিখেছিলেন, সেগুলো মূলত দর্শনের ইতিহাস বই। আর এর পরবর্তীতে তিনি যা যা লিখেছেন, এমনকি গুয়াত্তারির সঙ্গেও যা যা লিখেছেন, সবই এই বইটির সঙ্গে সংযুক্ত। সেদিক দিয়ে দেখলে, দেল্যুজের নিজের জবানেই, এই বইটা হলো দার্শনিক দেল্যুজের মূল দর্শন — দেল্যুজের নিজের ভাষায়, ফারাকের দর্শন।আমরা যারা পশ্চিমবাংলায় রাজনীতি ও সমাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত আছি কোনো না কোনো ভাবে, তাদের কেউ কেউ বেশ কিছুদিন ধরেই উপলদ্ধি করছি, আমাদের এখানকার রাজনীতি এবং সমাজকর্মে রাজনৈতিক দর্শন বেশ মান্ধাতার আমলের। ঋষি অরবিন্দ, মহাত্মা গান্ধী, আম্বেদকর থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্স, মাও জে দং — রাজনৈতিক দর্শনের চৌহদ্দিতে এদের কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ, কেউ বা খণ্ডিত — কিন্তু এদের দিয়ে কি সমসাময়িক পারিপার্শ্বিককে মোকাবিলা করা যাচ্ছে?
গত শতাব্দীর শেষভাগে মিশেল ফুকো যাকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘একদিন এই শতাব্দীকে বলা হবে দেল্যুজিয়ান’, সেই জিল দেল্যুজের দর্শন সমসাময়িক পারিপার্শ্বিককে অনেকটাই ছুঁতে পারে। জিল দেল্যুজের মূল দর্শনের বইটির কিছু অনুবাদ, ব্যাখ্যা এবং তার সূত্র ধরে আমাদের সক্রিয়তার পরিসরের বিভিন্ন দিকগুলোর সমালোচনার মাধ্যমে সমসাময়িক এবং অদূর ভবিষ্যতে সমাজকর্মীদের রাজনৈতিক দর্শনের অভাব মেটানোর দিকে কিছুটা এগোনো যেতে পারে। সেই লক্ষ্যেই এই ব্লগ। দেল্যুজের ভাষা ধার করে বলা যেতে পারে, দেল্যুজের ফারাকের দর্শন যদি একটি ভার্চুয়াল আইডিয়া হয়, তবে আমাদের সমসাময়িক ও আশু ভবিষ্যতের সমাজকর্মের সময়-পরিসরে এই ব্লগটি সেটার অ্যাকচুয়ালাইজেশন করার চেষ্টা। একটি রাজনৈতিক দর্শন তৈরির চেষ্টা।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, সত্তর ও আশির দশকে স্বয়ং দেল্যুজ বন্ধুবর গুয়াত্তারিকে সঙ্গে নিয়ে দুই খণ্ডে একটি রাজনৈতিক দর্শনের বই লিখেছিলেন, ‘কাপিতালিজম এ সিজোফ্রেনি : আঁতি-এদিপ’ ও ‘কাপিতালিজম এ সিজোফ্রেনি : মিল প্লাতো’। এ দুটো বই-ই বেশ বিখ্যাত।
এই উদ্যোগের সম্বন্ধে বিশদে জানতে যোগাযোগ করুন :  9674486426 (শমীক) এই নাম্বারে।

কবি কাহিনী নির্মলেন্দু গুন

কবি-কাহিনি
................
আপনারা কবিত্ব-হারানো একজন কবির সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন? কবিতা পাঠের আসরে দাঁড়িয়ে কবি জানতে চাইলেন।
দর্শকদের ভিতর থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললঃ "আমরা তাঁর বই কেনা বন্ধ করে দেব।"
কবি হাসলেন। বই না-কেনা বা কবিতা না-পড়ার হুমকিতে কবিকে বিন্দুমাত্র বিচলিত মনে হল না।
অন্য একজন দাঁড়িয়ে বললেনঃ "আমরা অনুসন্ধান চালাব তাঁর জীবনের গোপন-পৃথিবীতে। জানব, সেখানে কোনো ত্রুটি ঘটেছে কি না।"
এবারও কবি মুচকি হাসলেন। মনে হল তাতে পণ্ডশ্রম ছাড়া কিছুই হবে না। কবির জন্য এটা একেবারেই কোনো কাজের কথা নয়।
ঐ যুবকের বক্তব্য শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালেন এক প্রৌঢ়। তিনি বললেনঃ "আমরা তাঁর কবিত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকব।তাঁর বেশ কিছু ভালোকবিতার কথা আমাদের মনে আছে। তিনি যদি আর লিখতে নাও পারেন, তবু তিনি আমাদের প্রিয়-কবি হিসেবেই আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন।"
কবি খুব মনোযোগ সহকারে, কৃতজ্ঞ চিত্তে ঐ প্রৌঢ়ের কথা শুনলেন।
তখন লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ। তিনি বললেনঃ "আমরা কবির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব। কেন না কবিত্ব হচ্ছে ঈশ্বর প্রদত্ত এক ধরনের সৃষ্টি-শক্তি; যা
কবির মাধ্যমে ঈশ্বর সমাজকেই দান করেন। কবিত্ব হারানোর জন্য আমি তাই শুধু কবিকেই দায়ী বলে মনে করি না। আমি মনে করি, সমাজে ঘটে-যাওয়া নানাবিধ অপরাধের কারণেও একজন কবি কবিত্ব হারাতে পারেন। তাই, কবির জীবনচরিতে নয়, আমরা অনুসন্ধান চালাব আমাদের সমাজচরিতের মধ্যে। সমাজের কোথায় ঘটেছে সেই অপরাধ, আমাদের কাজ হবে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা।
এবার কবির চোখ অশ্রুসিক্ত হল। তিনি করজোড়ে বৃদ্ধের উদ্দেশে প্রণাম নিবেদন করলেন। মনে হল, হঠাৎ করেই কবির বুকের ভিতর থেকে সেইপাথরটি সরে গেছে, যা তাঁর আবেগের প্রবাহকে দীর্ঘদিন রুদ্ধ করে রেখেছিল। তাঁর ডান হাতের মধ্যমার অগ্রভাগে চোখের একবিন্দু অশ্রুকে ধারণ করে তখন কবি বললেনঃ "এই হচ্ছে কবিত্ব, এ ছাড়া কবিতা হয় না।"
-নির্মলেন্দু গুণ

Monday, 4 April 2016

পরিবর্তন কি কিছু হল? দীপঙ্কর দে



পরিবর্তন কি কিছু হল?        দীপঙ্কর দে

পরিবর্তন কি কিছু হল? অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে বলতে পারি হয়েছে। সাথে উন্নয়নও। এই লেখা যারা অর্ন্তজালে পড়বেন তাঁরা পরিসংখ্যান প্রিয়। তাই একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করি। ২০১০-১১ সালে এ রাজ্যের বার্ষিক উৎপাদন(GSDP) ছিল ৪.৬১ লক্ষ কোটি টাকা। চার বছর বাদে ২০১৪-১৫ তে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.০১ লক্ষ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬-র হিসেব পাওয়া যায়নি এখনও। তবে বার্ষিক বৃদ্ধির হার ১২.৫% ধরলে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৯ লক্ষ কোটি টাকা। যার অর্থ, গত পাঁচ বছরে রাজ্যের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এবং এই সময়কালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যভিত্তিক জিএসডিপি’র নিরিখে পাঁচ নম্বর স্থানে (সূত্র-state domestic product and other aggregates 2004-05 series, ministry of statistics and programmed implementation, Gov. of India)। এখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে এগিয়ে মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট আর তামিলনাড়ু। এ রাজ্য এখন ধান উৎপাদনে ভারতের মধ্যে প্রথম। গত কয়েক বছরে মাছ, সব্জি, ডিম, মুরগী ইত্যাদি দৈনন্দিন সামগ্রীর উৎপাদন ও যোগান বেড়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে চোখে পড়ার মতো। প্রায় প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে, কমেছে স্কুল ছুটের সংখ্যা। ‘কন্যাশ্রী’ এখন প্রধান আলোচিত প্রকল্প। ‘জল ধরো জল ভরো’ কর্মসূচী বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। পরিকাঠামো তৈরী হয়েছে – মান হয়তো ততটা বাড়েনি। একই কথা প্রযোজ্য উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। দুটো ক্ষেত্রেই মূল কারণ, ঘুঘুর বাসা ভাঙ্গা যায়নি বা ভাঙ্গা হয়নি। মোটা দাগে এগুলিই হচ্ছে আর্থিক উন্নয়নের মাপকাঠি। পরিসংখ্যান দিয়ে এ’লেখা অহেতুক ভারী করলাম না। বরং কি করে এই অসাধ্য সাধন হল সেটাই ভেবে দেখব আমরা। পাঁচবছরে রাজ্যের একটা বিধ্বস্ত অর্থব্যবস্থাকে টেনে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়।
গ্রাম বাংলার হাল কেমন ছিল ২০১০-১১ সালে, বামফ্রন্টের ৩৪ বছর শাসনের পর? এখন সেটা একটু দেখে নেওয়া যাক (সূত্র:SECC 2011)। ২০১১ সালে পশ্চিমবাংলার ৭৭.৩৬ শতাংশ পরিবার বাস করতেন গ্রামে। নিরক্ষরতার হার ছিল ৩৩.৫৮ শতাংশ। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে উত্তরণের হার ছিল যথাক্রমে ৬.৮ শতাংশ ও ৩.৫ শতাংশ। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর উত্তরণের হার ছিল মাত্র ২.৬৭ শতাংশ। সেই সময় গ্রামবাংলার মাত্র ৮.৫ শতাংশ গৃহে কেউ স্থায়ী চাকরী করতেন। ৮২.৪৭ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কারও সর্বোচ্চ মাসিক আয় ৫০০০ টাকার বেশী ছিল না। উপনিবেশবাদী ব্রিটিশ শাসন শেষ হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগুলোই ছিল নগর কলকাতার অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ। সেই ১৭৪১ সালে বর্গীরা গ্রাম বাংলা লুঠের যে পরম্পরা নির্মাণ করেছিল – তাই অব্যাহত রেখেছিল এ’রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার।
নূতন সরকার এসে সর্বপ্রথম অর্থনীতির এই অভিমুখটাকে বদলে দিল। বাংলার গ্রাম – নগর কলকাতার উপনিবেশ, এই প্রচলিত ধারণাকেই আঘাত করল। কলকাতা কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিতে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর সরে গেল গঙ্গার ওপারে। উত্তরবঙ্গের জন্য শিলিগুড়িতে নির্মাণ হল ভিন্ন দপ্তর। এবং সরকারি কাজের তদারকি করতে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর গোটা মন্ত্রীসভা ও আমলাদের নিয়ে পৌঁছে গেলেন প্রতিটি জেলায়। এটা যে এ’দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার সাবেকি চিন্তাধারায় কতবড় পরিবর্তন তা কলকাতায় বসে অনুধাবন করা যাবে না।
মুখ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী বুঝতে পেরেছিলেন বড় শিল্পের মরীচিকার পিছনে ছুটে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তাঁরা ভরসা রাখলেন গ্রামীণ শিল্পের ওপর। তাঁতি, চাষি, কামার, কুমোর, ছুতোরের উপর। মাত্র কয়েকশো বছর আগেও তো বাংলা ছিল ‘পৃথিবীর তাঁত ঘর’। বাউল, চিত্রকর, পটচিত্রী, পুতুল, মিষ্টি, সুগন্ধী-চাল, কী নেই এ বাংলায়? দরকার শুধু একটু পরিকল্পনা। তৈরি হল ‘বিশ্ববাংলা’ ব্র্যান্ড। হোক না খণ্ডিত বাংলা তবু কম কিসে! পুনরুদ্ধার হল হারিয়ে যাওয়া মসলিন, লুপ্ত প্রায় পুতুল, হাজারো কৃষি বীজ। লৌকিজ্ঞান ভিত্তিক এক নূতন অর্থব্যবস্থার জন্ম দিল পশ্চিমবঙ্গ। যার ভরকেন্দ্র বাংলার প্রতিটি গ্রাম। চিরাচরিত অর্থনীতির দর্শনে এটাই মূল পরিবর্তন। এই অভিমুখটা বদলে দেওয়ার ফলে বাকী যা যা ঘটেছে তা অর্থনীতির নিয়মে ঘটেছে। যেমন ধরুন, বেসরকারী বড় পুঁজি বিনিয়োগ না হলেও, সরকারি ব্যয় বাড়ার দরুন (রাস্তাঘাট তৈরী ইত্যাদি) অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে, গ্রামীণ হস্তশিল্প, লোকশিল্পকে অনুদান দেওয়ার ফলে চাহিদা বেড়েছে, বাজারে-তার একটা ‘মাল্টিপ্লায়ার’ এফেক্ট হয়েছে। কাজে শৃঙ্খলা আসার দরুন শিল্পোৎপাদন বেড়েছে। এখন ব্যাঙ্কগুলোও বাংলায় বেশী করে ঋণ দিচ্ছে।
আরও একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে যা নিয়ে কেউ আমরা আলোচনা করছি না। ক’বছর আগেও এই রাজ্যে কয়েকশো NBFC, সারদা, রোজভ্যালী, ইত্যাদি গ্রামবাংলা থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা কলকাতা, শিলিগুড়ি, মালদা,আসানসোলে পাঠাত। সেই টাকার বেশীর ভাগই গ্রামে ফিরত না। সঞ্চয়িতার আমল থেকেই এই লুঠ চলছিল। হালে তা বন্ধ হয়েছে। গ্রামের টাকা গ্রামেই বিনিয়োগ হচ্ছে বা খরচ হচ্ছে। এটাও একটা বড় পরিবর্তন।
সব শেষে বলব, একটা আর্থিক পরিবর্তন কিন্তু তখনই সম্ভব যখন এক বিশাল জনগোষ্ঠী সত্যিই মনে করে তারা সফল হতে পারে। বিগত প্রায় পাঁচ দশকে বাংলা শুধু শুনে এসেছে ‘হবে না’ ‘চলবে না’ ‘বন্ধকরো’ ‘পিছন দিকে এগিয়ে যান দাদা’। কেউ বাংলার ঐতিহ্যময় ইতিহাস নিয়ে কথা বলেনি। এই প্রথম কেউ বলছে জোর গলায় ‘Bengal leads’, ‘এগিয়ে বাংলা’। ভেঙ্গে পড়া অর্থব্যবস্থার পুনঃনির্মাণে, বাঙালি জাতিসত্ত্বা বিকাশের পক্রিয়ায়, এই দুটি শব্দ কম কার্যকরী নয়।
কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন এই নূতন অর্থব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী? উত্তর – খুব ভালো, যদি না রাজনৈতিক পালাবদল হয়(যার সম্ভবনা কম)! প্রথমত, রাজ্যের ডেট–জিএসডিপি (debt GSDP ratio) অনুপাতের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে। ২০১০-১১ সালে রাজ্যের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লক্ষ টাকা। জিএসডিপি’র পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.৬১ লক্ষ কোটি টাকা। তাহলে অনুপাত দাঁড়াল ৪৩ শতাংশ। প্রতি বছর কেন্দ্রকে ২৮,০০০ কোটি টাকা ঋণ শোধ করতে ও নানা উন্নয়নমূলক কাজ করতে গত পাঁচ বছরে রাজ্য আরও প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। কিন্তু রাজ্যের GSDP ২০১৫-১৬ তে প্রায় ৯ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। মোট ঋণ (আগের ঋণসহ) যদি আনুমানিক ৩ লক্ষ কোটি টাকা হয় তবে বর্তমানে ডেট – জি এস ডি পির অনুপাত দাঁড়াবে ৩৩ শতাংশ। পাঁচবছর আগে যা ছিল ৪৩ শতাংশ। এ অবস্থায় রাজ্য অনেক কম সুদে টাকা ধার করতে পারবে। প্রয়োজনে বিদেশী ব্যাঙ্ক থেকেও ধার নিতে পারবে নাম মাত্র সুদে। সেই টাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ শোধ করলেই প্রতি বছর আর সুদের বোঝা বইতে হবে না। আরও একটি লক্ষনীয় পরিবর্তন ঘটেছে সরকারের কর আদায়ের ক্ষেত্রে। বামআমলের শেষ পাঁচ বছরে (২০০৬-৭ থেকে ২০১০-১১) রাজ্যের মোট কর আদায়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৭,৯৩৫ কোটি টাকা। পরবর্তী পাঁচ বছরে (২০১১-১২ থেকে ২০১৫-১৬) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৭৯,৮১৯ কোটি টাকায়। বৃদ্ধির পরিমাণ এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশী। অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে চোখের সামনে এক বিকল্প উন্নয়নের মডেল নির্মাণ হতে দেখছি প্রতিদিন। যা আমার কেতাবী শিক্ষার নাগালের বাইরে। এই উন্নয়নের কুশীলব গ্রাম বাংলার লক্ষ লক্ষ জ্ঞানী কারিগর। যাদের বহুবছরের অর্জিত ও লালিত জ্ঞানকে গত প্রায় তিনশো বছর ধরে আমরা অবজ্ঞা করেছি, অবহেলা করেছি, ধ্বংস করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি বার বার। কখনো সরাসরি কখনো বা মুখোশের আড়ালে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান অর্থব্যবস্থায় যারা কাণ্ডারী, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগপতিরা, তাদের প্রায় সবারই শিকড় এই বাংলায়। বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘদিন ধরে তাদের এক জগদ্দল পাথর দিয়ে চেপে রাখার চেষ্টা করেছে স্রেফ রাজনৈতিক কারণে। নেতারা মনে করতেন স্থানীয় উদ্যোগপতিরা সবল হলে, তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ চাইবেন। বামফ্রন্টকে চ্যালেঞ্জ করবেন। তাই স্থানীয় উদ্যোগপতির পরিবর্তে বাম সরকার ভিনরাজ্যের, এমনকি ভিনদেশীয় উদ্যোগপতিদের স্বাগত জানাত, সেই সব উদ্যোগপতিদের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি আকাঙ্খা থাকবে না বলে। বর্তমান সরকার স্থানীয় উদ্যোগপতিদের উপর প্রায় পাঁচ দশক ধরে চাপিয়ে রাখা জগদ্দল পাথরটা সরিয়ে দিয়েছে। পাথরচাপা সাদা ঘাসগুলো সবে আস্তে আস্তে সবুজ হতে শুরু করেছে। এবার তার বিস্তারের পালা।
ল‍েখক- ডিন, আই বি এস বিজনেস স্কুল, কলকাতা।

Sunday, 3 April 2016

সাহিত্য প্রস্তাব-অমিয় ভূষণ মজুমদার

বাংলার ইতিহাসের একটি চুম্বক- হায়দার মুন

আমরা জানি যে আমরা বাঙ্গালিরা সঙ্কর জাতি , আমাদের আদিবাসীদের মধ্যে রয়েছে মূলত অস্ট্রিক – দ্রাবিড় , আলাপীয় আর্য এবং মঙ্গোল রক্ত। কিন্তু একেবারে যদি মূল আদিবাসীদের কথা বলা হয় তবে তা হোল অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড় । অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সাথে মিল ছিল বলে প্রাচ্য-ভারতের জন গোষ্ঠীর এক অংশকে আদি অস্ট্রাল এবং নৃতাত্ত্বিক পরিভাষায় অস্ট্রিক নামে ডাকা হয়। দক্ষিণ ভারতের জন গোষ্ঠী দ্রাবিড় নামে অভিহিত। মূলত অস্ট্রিক – দ্রাবিড় রা ভূমধ্যসাগরীয় জনগোষ্ঠী র জ্ঞাতি। সেখান থেকেই তারা জলপথ বা উপকূলীয় স্থলপথে ভারতে প্রবেশ করে। এরপর দাক্ষিণাত্যতে আর বাংলায় বসবাস শুরু করে। এখানে তারা এসেছে বিভিন্ন সময়ে । আবার হিমালয় মালভূমি অঞ্চল থেকে এবং লুসাই পর্বত বেয়ে এসেছে মঙ্গোল রা। অস্ট্রিক দ্রাবিড়ের পরে যারা এসেছে তারা আলপাইনি বা আলাপাইনি আরযভাষী ,এরা এসেছিল মূলত সমুদ্রপথে। নিগ্রো বা নিগ্রেটো রা যারা এসেছিল তাদের সংখ্যা নগণ্য। অতএব এই শঙ্করের মাঝেও কোন কোন গোষ্ঠীর মানুষ মনন উৎকর্ষের ফলে প্রাধান্য লাভ করে। দুর্বল অস্ট্রিক – দ্রাবিড় রা অনেক কাল ছিল অরণ্যে। নৃতাত্ত্বিকদের মতে আলাপাইনি আর্যভাষী বহিরাগত গোষ্ঠীই বাংলা – বিহার – উড়িষ্যা তে উন্নত মনন ও হাতিয়ার প্রয়োগে প্রাধান্য লাভ করে। পরবর্তীতে বিবর্তনের ধারায় আদি আস্ট্রিক ও দ্রাবিড়দের দাস ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর যোগানদাতায় পরিণত করে। পরে এই বহিরাগত আরযরাই সমাজে পেশা অনুসারে ব্রাহ্মণ ,বৈদ্য , ও কায়স্থ রূপে পরিচিত হয়। আর অস্ট্রিক – দ্রাবিড় বর্গের মানুষরা নিজেদের মাঝে রক্তের মিশ্রনের পরও অস্পৃশ্য প্রাণী হয়ে থাকল এদের মাঝে যারা আরয দের সেবাদাসে পরিণত হোল তারা হয়ে গেল নাপিত,ধোপা,কর্মকার,মুচি,মেথর,চড়াল,ডোম, অর্থাৎ অস্পৃশ্য। এর মাঝে জৈন, বৌদ্ধ , ইসলাম কোন ধর্মই এদের সমাজ-ভুক্ত করতে পারেনি। কোন ধর্মই সনাতন ধর্মের যার আরেক নাম হিন্দু ধর্ম তাঁর লৌহ বর্ম ভেদ করতে পারেনি। এর মাঝে এই নির্যাতিত মানুষরা সনাতন ধর্ম থেকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে কিন্তু তাদের জাতে গ্রহণ করা হয়নি আবার তারা সনাতন ধর্মে ফিরেছে সে যে কারনেই হোক। এরপর ইসলাম আসল ,দরবেশদের প্রচারের কথায় কাজে মুগ্ধ হয়ে পেশা বদলের উপায় না থাকা সত্ত্বেও উচ্চ বর্ণের হিন্দু – বৌদ্ধের ঘৃণা ,পীড়ন মুক্তির লক্ষ্যে কিছু না জেনে বুঝেই আরবের ধর্ম গ্রহণ করে। ইসলাম প্রচারকারীরা এ অঞ্চলের মানুষে বঞ্চনার কথা বুঝতে পেরে দীক্ষিত পুরুষ মাত্রেরই আরবি শেখ পদবীতে ভূষিত করে। এরপরের ইতিহাস ত সহজ ইতিহাস, এলো তুর্কি, এলো মুঘল তখন শেখ এর চেয়ে আবার খান এর কদর বাড়ল পনের শতক থেকে মুসলমানরা খান উপাধি নিতে থাকে। পরবর্তীতে যারা ধনী হয়ে গেল তাদের মধ্যে যারা শেখ তারা নিজেদের আরব এর বংশ এবং যারা খান তারা তুর্কি মঙ্গলদের বংশ বলে পরিচয় দিতে থাকলো। এ তরিকা আজও আছে। এর মাঝে চরম অস্পৃশ্য রা ইসলাম কবুল করে জোতদার, তালুকদার, শিকদার হয়েছে। আরবি-ফরাসি শিখে কেউ কেউ ব্রাহ্মণদের বিকল্প হিসেবে ,ইমাম,কাজি,দেওয়ান,নায়েব শিক্ষক হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে খুব কম হলেও সেই অস্ট্রিচ দ্রাবিড় এর কিছু অংশ কিছুটা হলেও ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছিল আরযদের সেবাদাস হবার কল্যাণে যা কিনা সনাতন ধর্মের অধীনে ছিল অকল্পনীয় এবং এক্ষেত্রে স্থানীয় দের সংগ্রাম ছিল খুবই কঠিন।
আমাদের সভ্যতাকে মনে করা হয় প্রায় দশ হাজার বছরের পুরনো সেসময় আমরা কতটুকু সভ্য ছিলাম সেটা বড় কথা নয়, কথা হোল আমরা ছিলাম,কেমন ছিলাম সে প্রশ্ন আসলে বলতে হয় সামন্ত যুগেও বাংলা ভাষা ভাষী অঞ্চল কখনো এক ছিল না। এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে কোন একক চেতনা বা জাতীয় চেতনাও ছিল না। তখন এই ভূভাগ বিভক্ত ছিল ছোট ছোট রাজ্যে তাদের কতকগুলোর নাম জানা যায় আবার কতক-গুলো সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। ষোলশ ছেষট্টি সালের আগ পর্যন্ত আজকের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল আসলে একক শাসকেরই অধীনে ছিল না। মুঘলরা ষোলশ ছেষট্টি সালে চট্টগ্রাম জয় করলে বাংলা একক শাসকের অধীনে আসে। কাজেই মুঘল আমলের আগে বিশেষ করে ইংরেজ আমলের আগে উনিশ-শতকের আগে বাংলাদেশ বা বাংলা ভাষী অঞ্চল কখনই এক ছিল না,ঐক্যবদ্ধ ছিল না ।আমাদের সবচেয়ে দুর্ভাগ্য বিগত দুই হাজার বছরের মধ্যে ধরলে এবং অশোক সহ ধরলে তেইশস বছরের মধ্যে আমরা বাঙ্গালী গোত্রের বাঙ্গালী একজন মাত্র স্বদেশী রাজার নাম পাই,তার নাম শশাঙ্ক । তাও আবার ভিন্নমত আছে। শশাঙ্ক মুর্শিদাবাদ – কর্ণসুবর্ণে রাজত্ব করতেন, কেউ কেউ বলেন তিনি আসাম থেকে এসেছিলেন। এই শশাঙ্ক ছাড়া আর কোন নাম পাওয়া যায় না। এরপর অনেক পরে যার নাম পাওয়া যায় তাঁর নাম দিব্যক । দিব্যক, রুদ্রক আর ভীম নামে তিন পুরুষ। এই ত, আর কোন বাঙ্গালী শাসক পাই না। আর হুসেন শাহ্‌র নাম শোনা যায় কিন্তু হুসেন শাহ সৈয়দ হলে বাঙ্গালী হন না , সে যুগে ত প্রশ্নই উঠে না। এছাড়া বাকি থাকে রাজা গণেশ যাকে বাঙ্গালী বলে স্বীকার করলেও করা যায় আবার না করলেও ক্ষতি নেই। কারণ গণেশ যদি ব্রাহ্মণ হন তাহলে বাঙ্গালী হতেই পারেন না। ব্রাহ্মণ রা বহিরাগত। এই গণেশের ছেলে জালালুদ্দিন বা মহেন্দ্র এবং তাঁর ছেলে পুলেরা বার তের বছর রাজত্ব করেন। এ ছাড়া বাঙ্গালী কখনো উনিশশ সাতচল্লিশ এর আগে রাজত্ব করেনি তাও আবার প্রশ্ন সাপেক্ষ উনিশস একাত্তরের আগ পর্যন্ত। আমাদের বুঝতে হবে ইতিহাসের চেতনা দিয়ে যদি আমরা উদ্বুদ্ধ হতে চাই তাহলে আমাদের মানতে হবে আমরা দু হাজার বছর ধরে নির্জিত এক জাতি।আমরা দুই হাজার বছর ধরে নির্জিত হয়েছি বিজাতি,বিভাসি দের দ্বারা । আমাদের আসল সগোত্রীয় জাতি আজও নিরন্ন,নিপীড়িত,বঞ্চিত।আমাদের বুঝতে হবে আমরা আসলে হাড়ি, ডোম,মুচি,মেথর,সাঁওতাল,,খাসিয়া দের ই উত্তরসূরি বা বংশ। যারা বহিরাগতদের অত্যাচারে বনে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল তারাই আজ সাঁওতাল,খাসিয়া,গার নামে অভিহিত যারা আসলে আসল বাঙ্গালী আমাদের আসল পূর্বপুরুষ। অস্ট্রিক – মঙ্গোল দের যে সংস্কৃতি সেটাই বাঙ্গালীর রক্তের সংস্কৃতি যেখান থেকে এসেছে সংখ্যা, যোগ,দেহতত্ত, এগুলো মঙ্গলদের দান আর নারী দেবতা ও জন্মান্তর অস্ট্রিক দের দান। এসব বাঙ্গালীদের মাঝ থেকে মুছে ফেলা যাবে না। বাঙ্গালী বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য , ইসলাম প্রভৃতি ধর্ম গ্রহণ করেছে ঠিকই কিন্তু সংখ্যা,যোগ,তন্ত্রের প্রভাব ছাড়তে পারেনি।
তাহলে দাঁড়ায় যে আমরা যারা আজকের বাঙ্গালী তারা হোল মূলত অস্ট্রিক – মঙ্গলদের বংশধর, এটা এখন নৃতাত্ত্বিক ভাবে প্রমাণিত ,আর যদি তাই হয় তাইলে আমদের শতকরা নব্বই ভাগ বাঙ্গালীর যারা আমাদের বর্তমানের বাংলাদেশের বাঙ্গালী তাদের পুরব পুরুষ ডোম, কামার ,কুমোর, তাঁতি, ধোপা , নাপিত যারা হাযার বছরের নির্যাতিত বাঙ্গালী এবং তথাকথিত অচ্ছুৎ । বাঙ্গালী চিরকাল বিদেশি শাসিত। বাংলাদেশে যেসব ধর্ম সেগুলোও বিদেশ থেকে আগত । আমাদের যতটুকু আছে তা আমরা অনেক কষ্টে ছিনিয়ে নিয়েছি এবং কিছুটা পরিস্থিতি আমাদের দিয়েছে । আরযদের কাছ থেকে অনেক কষ্টে আমরা কিছুটা নিয়েছি তাদের সেবাদাস হবার কল্যাণে আর অনেক পরে ব্রিটিশরা দিয়েছে তাদের স্বার্থে।
উপরের আলোচনা থেকে বাঙ্গালী হিন্দু কে আলাদা করা খুব কঠিন কিছু না। বাঙ্গালী চিরকাল বিজাতি শাসিত বাঙ্গালীর প্রশাসনও ছিল উত্তর ভারতের। বাঙ্গালীর যে গৌরব আমরা করি তাঁর কোনটাই বাঙ্গালীর না। যেসব শিলালিপির কথা বলা হয় তা বাঙ্গালীর না। এগুলো বহিরাগতদের ইতিহাস । যারা বাঙ্গালী সেই আসল জনগোষ্ঠী অর্থাৎ হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল,বাগদি যারা শূদ্র অস্পৃশ্য তাদের কথা বাঙ্গালীর বা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোথাও লেখা হয়নি। বাঙ্গালীর ইতিহাস লিখা হয়েছে অবাঙ্গালির কীর্তি কথা দিয়ে,যারা কিনা বহিরাগত। যারা সত্যিকারের বাঙ্গালী তাদের কিছু অংশ বহিরাগতদের সেবাদাস হয়ে কিছুটা উচ্চবর্ণ হয়েছে, মাথা তুলবার চেষ্টা করেছে। আজকে দাস, কালকে চৌধুরী বা মজুমদার,এরপরে দাস-গুপ্ত, সেন গুপ্ত হয়ে জাতে ওঠার চেষ্টা এখনো আছে। এক সময় এ দেশে শতকরা পঁচানব্বই ভাগ মানুষ বৌদ্ধ ছিল। সেসময় তাদের কোন জাতিভেদ ছিল না। তারপর আবার যখন ব্রাম্মনবাদের পুনরজাগরন হোল আবার নতুন করে বর্ণ বিন্যাস করা হয়েছে যা কিনা কৃত্রিম যার প্রমাণ আছে বল্লালচরিতে,কুলজিতে । আমাদের সঙ্কোচ ত্যাগ করে আমাদের পূর্বপুরুষের পরিচয় জানতে হবে।
আমাদের বুঝতে হবে বাংলাভাষী ভূখণ্ডে সেকালে আঞ্চলিক-ভাবে জীবন গড়ে উঠেছিল যা সর্ব বঙ্গীয় ছিল না এমনকি সামন্ত যুগেও না । ধর্মের ক্ষেত্রে হিন্দু আমলে সারা বাংলায় একক দেবতার পুজো হয়নি। কোথাও মনসার , কোথাও চণ্ডীর , কোথাও শিবের ,কোথাও বিষ্ণুর পূজা হয়েছে। সমাজের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল গ্রামে বাস অধিকারই ছিল না, ছিল না পুরো ভাত রেঁধে খাবার, তারা উচ্ছিষ্ট খাবে এটাই ছিল নিয়ম, যে নিয়ম বেধে দিয়েছিল উচ্চবর্ণের মানুষেরা। এমনকি ১৯৪০ এর আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পায়ে জুতা পড়ার অধিকারও ছিল না।
ভারতে ইসলামের আগমন যেভাবেই হোক মুসলিমদের আগমন তিনভাগে হয়েছে। এটা আট শতাব্দী ধরে চলে। প্রথম পর্যায়ে আরবরা আসে সপ্তম এবং অষ্টম শতাব্দীতে। সিন্ধুতে এসে তারা কয়েকটি যুদ্ধ করে ফিরে যায়। মনে করা হয় মোহাম্মদ বীণ কাসিম প্রথম করাচীতে হানা দিয়েছিল। মনে করা হয় ভারতের প্রথম মসজিদও তৈরি হয় করাচীর বানভর নামক গ্রামে যা এখন পরিত্যক্ত নগরী। দশম এবং একাদশ শতাব্দীতে আসে আফগান এবং ফার্সিরা এবং তারপরে তুর্কি এবং মোঘলরা দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীতে। প্রথম পর্যায়ের আক্রমণ থেকে খুব কম আরব থেকে যায় ভারতে, এবং ফার্সিদের মধ্যেও নাদীর শাহ এর আক্রমণের সুবাধে থেকে যায় অল্প কিছু ফার্সি।, কিন্তু তুর্কি বা মোঘল রা তা নয়, অনেক আফগান এখানে থেকে যায় এবং ভারতকে নিজের দেশ করে নেয়। এখানে লক্ষণীয় যে আক্রমণকারীদের ধর্মবিশ্বাস ইসলাম দিয়ে এদের চিহ্নিত করা হয় , কোন দেশ থেকে এসেছে তা দিয়ে নয়। অথচ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে বলা হয় না খ্রিস্টান আমল। এই যে আরব,আফগান,তুরকি হিসেবে চিহ্নিত না করে মুসলিম বা ইসলাম হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা সে যে কারণেই হোক না কেন এর মাঝেই রয়ে গেছে হিন্দু মুসলিমের বিভেদের মূল বীজ । কিন্তু আরবরা তাদের নিজ দেশে মার খায় মঙ্গলদের হাতে। ১২৫৮ সালের মধ্যে আব্বাসিদ বংশের রাজধানী বাগদাদ ধুলোয় মিশে যায়, তুরকিরা ইসলামের খলিফা পদ দখল করে। মঙ্গলদের অত্যাচারে অনেক ফার্সি ইরান থেকে ভারতে চলে আসে যারা ফার্সি সংস্কারে দীক্ষিত ছিল। এসব আগমনকারীদের জন্য ভারত হয়ে উঠল নিরাপদ ভূমি। একারণেই মধ্যযুগে যেসব ফার্সি লেখক ভারতের ইতিহাস লিখেছেন তারা মুসলিম নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় লিখেছেন এবং ভারতের ইতিহাসের শুরুটাই তারা করেছেন মুসলিম দের সময় থেকে যা ত্রুটিপূর্ণ বলাই বাহুল্য।
মোঘলরা কেন এত সমাদর পেল ভারতে। এজন্যে যে তারা থেকে গেল বিশাল না হলেও অনেকটাই এবং মোঘলরা ধর্ম প্রচারের দিকে খুব একটা আগ্রহ দেখায় নাই। তারা ছিল শাসক আর শাসন করবার জন্য তাদের ধর্ম প্রচারের প্রয়োজন ছিল না । বরং মোঘলরা বর্ণ হিন্দুদের কাছে টেনে নেয় । ধর্মান্তরিত নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়া জনগণ তাদের কাছে পাত্তা পায় নাই।, হোক তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
সাধারণ জনতা থেকে বিচ্ছিন্ন মোঘলরা ভারতে এখনো জনপ্রিয় কারণ তারা মুসলিমদের চেয়ে হিন্দুদের কে বেশী কাছে টেনে নিয়েছিল, বিয়ে-শাদি করেছে বর্ণ হিন্দু নারীদের। তাদের দরবারে সম্মানিত ছিল হিন্দুরা। এমনকি প্রধান সেনাপতিও ছিল মানসিংহ আকবরের। এই জন বিচ্ছিন্ন মোঘলদের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত হয়ে ব্রিটিশদের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার ইতিহাস আমরা কমবেশি জানি। ব্রিটিশদের খুব বেগ পেতে হয়নি ক্ষমতা পেতে। বাংলার নবাব সিরাজ উদ দৌলা এর ব্যতিক্রম না।
ইংরেজদের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হিন্দুরা বা বরন-হিন্দুরা দেরি করে নাই। কারণ মুসলিমদের শাসনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। যদিও মুসলিম শাসনে তারাই ছিল লাভবান বর্ণ হিন্দু হবার কারণে। এখানে উল্লেখ্য নিম্ন বর্ণের হিন্দু এবং মুসলমান সবসময় সবকালেই বঞ্চিত থেকে গেল। হিন্দুরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে শিক্ষা থেকে শুরু করে আধুনিক জীবন এর সবকিছুই শিখতে লাগলো। সিপাহী বিপ্লবের পর ইংরেজরা তাদের কৌশল পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা শুধু হিন্দুদের ওপর নির্ভর থেকে নিশ্চিন্ত থাকতে পারল না। এবার তারা মুসলিমদের দিকে নজর দিল। কারণ হিন্দুদের মাঝে ইতিমধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবল হয়ে উঠেছিল। এর জন্য ব্রিটিশের ডিভাইড এন্ড রুল এর প্রথা চালু হয়ে গেল ভারত বর্ষে । মুসলিমদের কে কিছু সুযোগ সুবিধা বেশী দেবার নিমিত্তে এবং তা ন্যায্য প্রমাণ করার জন্য ১৮৭২ সালে উইলিয়াম হান্টারকে দিয়ে লেখানো হয় “ ইন্ডিয়ান মুসলমান স “ নামক বই। এতে হান্টার দেখালেন মুসলিমরা বঞ্চিত। ব্রিটিশরা মুসলমানদের মাঝে শিক্ষা প্রসারে জোড় দিল। কিছু ছোট খাট চাকুরীও দেয়া হোল। ১৮৯০ থেকে মুসলিমদের মাঝে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকলেও মুসলিম নেতারা মক্তব মাদ্রাসার শিক্ষা দাবী করতে থাকে যা ছিল খুবই নিচু মানের। তা সত্ত্বেও সরকার বিশ শতকের প্রথম ২০/৩০ বছর মুসলমানদের সামনের দিকে ঠেলে নিতে চেষ্টা করে। মনে রাখতে হবে এই মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল বাঙ্গালী মুসলমান যার সিংহ ভাগই ছিল অস্পৃশ্য নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মত যারা আমাদের আসল পূর্বপুরুষ। যাইহোক ১৯২০ এ বঙ্গদেশে শিক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয় মুসলমানদের থেকে। বর্ণ হিন্দুদের মত বর্ণ মুসলমানও গড়ে উঠেছিল একিভাবে যা আলাদা করে আলোচনার প্রয়োজন নেই। এর বড় প্রমাণ আবুল কাশেম ফজলুল হক , যিনি শেরে বাংলা নামেও পরিচিত। ১৯২২ সালে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় হক সাহেব এর বিরোধিতা করেছিলেন ।তবেও এটাও সত্যি বাংলাকে অনেক সাধারণ মুসলমানও হিন্দুর ভাষাই মনে করত। অবিভক্ত বাংলায় ১৯০১ সালে হিন্দুদের সাধারণ শিক্ষার হাড় ২১.৮% ও ইংরেজি শিক্ষার হাড় ৯.৭% সেখানে মুসলমানদের ছিল যথাক্রমে সাধারণ শিক্ষায় ৯.৭% এবং ইংরেজি শিক্ষায় ০.৮৫%। উচ্চশিক্ষায় অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ।
হিন্দুদের মাঝে জাতীয়তাবাদী চেতনা অনেক আগেই দানা বাঁধতে শুরু করেছিল সেই যখন ১৭৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানারজি ‘ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশন” নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন যা ছিল মূলত হিন্দুদের। পরে ১৮৮৫ সালে গঠিত হয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস যা সত্যিকারের রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কংগ্রেসের নেতারা সবাই বা বেশিরভাগ ছিলেন হিন্দু। এখানে বলা যেতে পারে যে মুসলিমদের মাঝে এমন কেউ আসলে ছিলেন না যে নেতা হতে পারেন, কারণ রাজনৈতিক সচেতন মুসলমান ই ছিলেন খুব কম । বাংলা ভাষী মুসলিমরা যখন লেখাপড়ায় এগিয়ে আসতে থাকলো তাদের নিজের পরিচয় নিয়ে তারা সংশয়ে পরে গেল কারণ বহিরাগত মুসলিমরা এ দেশে এসে বিয়ে শাদি করে স্থায়ী হয়েছিলেন বাধ্য হয়ে কারণ তখনকার দিনে দুর্গম পথ ধরে তাদের পক্ষে নারীদের সাথে করে আনা ছিল অসম্ভব এটা ইসলামিক শাসকরাও পারেন নাই। এর পরেও এই মুসলিম জনগোষ্ঠী যারা কিছুটা সাধারণ শ্রেণীর অর্থাৎ সুফি ,সাধক ,ধর্ম প্রচারক , ব্যবসায়ী এরা নিজেদের মাঝে ছোট জনগোষ্ঠী গড়ে নিলেন সাধারণ সেই কামার,কুমার,তাতি,ডোম এদের কাছেও মূলত অচ্ছুৎ ই রয়ে যায়। কাজেই শিক্ষার জন্য এগিয়ে আসা বাঙ্গালীদের সামনে যারা দৃষ্টান্ত হিসেবে উদয় হোল তারা উর্দুভাষী। আর যারা এই উর্দুভাষী তারা আসলে আর কিছুই না বর্ণবাদই মুসলিম । এই বর্ণ বাদী মুসলিমরা বাংলাকে কাফেরদের ভাষা হিসেবেই মনে করতেন। বাংলা ভাষার প্রতি বিরোধিতা সত্ত্বেও বিশ শতকের গড়ার দিকে শিক্ষিত মুসলমানদের অনেকে বাংলা শেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন , কারণ মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যতীত ব্যাপক শিক্ষার হাড় বাড়ানো সম্ভব নয়।
বাঙ্গালী হিন্দুদের জাতীয়তাবাদী শক্তি দেখে ব্রিটিশ বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটিশ পশ্চিম বঙ্গের সাথে বিহার আর উড়িষ্যাকে জুরে দিয়ে নাম দিল বেঙ্গল আর পূর্ববাংলা আর আসাম নিয়ে গঠিত হয় পূর্ববঙ্গ প্রদেশ যার রাজধানী হয় ঢাকা। বেঙ্গলের হিন্দুর সংখ্যা ছিল মাত্র শতকরা বত্রিশ ভাগ আর পূর্ববঙ্গে মুসলিম ছিল শতকরা ৫৮ ভাগ। ফলে দু অংশেই হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যায় । এটা হয় ১৯০৫ সালে। স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুরা এর বিরোধিতা করে। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন শুরু হয়ে যায়, যা ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের ইচ্ছাকে উস্কে দেয়। প্রাণ হারান ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী। খুব অল্প সংখ্যক বাঙ্গালী বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন । বেশিরভাগই সমর্থন করেন। কারণ বঙ্গভঙ্গের কারণে ঢাকা রাজধানী হিসেবে মর্যাদা পাওয়ায় মুসলমানরা বা বাঙ্গালী মুসলিমরা কিছু সুবিধা পায় যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর এর মাধ্যমেই ১৯০৬ সালে অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গের ঠিক পরের বছর বঙ্গভঙ্গের প্রধান সমর্থক নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় “মুসলিম লীগ” প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু এরমাঝেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন এতটাই জোড় পায় যে তা রদ হয়ে যায় ১৯১২ সালে। বাঙ্গালীর একসাথে থাকার আকুতি এখানে ছিল কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যারা মুসলিম তারাও যা আবার নিম্নবর্ণের হিন্দু তারাও তা অর্থাৎ অচ্ছুৎ । এসব ভঙ্গে তাদের কি যায় আসে?। তারপরেও বঙ্গভঙ্গ রোধ হলে মুসলিমরা কস্ত পায় ,তাদের সান্ত্বনা দেবার জন্যই অনেক পরে হলেও ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করে সরকার।
এর মাঝে ভারত বর্ষে হিন্দু- মুসলিমের যে মুখোমুখি সংঘাতময় অবস্থান তা নিরসনের জন্য যে ব্যক্তিটি হাল ধরলেন তাঁর নাম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ । মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জন্ম গ্রহণ করেন ২৫ শে ডিসেম্বর ১৮৭৬ সালে। প্রথমে তাঁর নাম রাখা হয় মোহাম্মদ আলী জেনাভাই। জিন্নাহ ব্যারিস্টারি পড়া শুরুর আগে তাঁর নাম বদলে রাখেন মহম্মদ আলী জিন্নাহ। ব্যারিস্টারি পাশ করে জিন্নাহ ইংল্যান্ড থেকে ১৮৯৬ সালে বোম্বে বা বর্তমান মুম্বাই ফিরে এলেন । করাচীতে যাননি , যাওয়ার প্রয়োজন ও ছিল না । জিন্না কংগ্রেসে তাঁর রাজনীতি শুরু করলেও পরে একই সাথে মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং অবাক করার মত হলেও সত্যি যে একই সাথে তিনি কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের সদস্য থেকে যান। ভারতের মুসলমান এবং হিন্দুদের মাঝে ঐক্য সাধনের পদক্ষেপ জিন্নাই নেন লউখন সন্ধির বা প্যাক্ট এর মাধ্যমে যেখানে প্রথমবারের মত মুসলমানদের হিন্দুরা মেনে নেয় রাজনীতির দাবিদার হিসেবে। সরোজিনী নাই-ডু জিন্নাহকে হিন্দু – মুসলিমের সেতুবন্ধনের দূত হিসেবেও উল্লেখ করেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কংগ্রেসের সাথে ব্রিটিশের চুক্তি হয় কংগ্রেস ব্রিটিশকে যুদ্ধে সহায়তা দেবে এবং তাঁর বিনিময়ে ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা দিয়ে যাবে। গান্ধী নিজে সার্জেন্ট হয়ে ব্রিটিশের পক্ষে সৈন্য সংগ্রহ করেন । কিন্তু এর মাঝে ভারতের মুসলিমরা খেলাফত আন্দোলন শুরু করেন যা ছিল ইসলাম জাহানের একক খলিফার অধীনে মুসলিম সাম্রাজ্য যার খলিফা হবেন তুরস্কের খলিফা। এই খেলাফত আন্দোলন ভেস্তে যায় যখন যুদ্ধ শেষে কামাল আতা-তুরক ক্ষমতা নেন তুরস্কে। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ছাড়া বাকি সব মুসলিম নেতা মুসলিম লিগে ফিরে যান, মাওলানা কংগ্রেস যোগ দেন। কিন্তু এর মধ্যে যা হোল তা হচ্ছে ভারতের মুসলিমরা মুসলিম রাষ্ট্র চায়, এটি কংগ্রেসের বদ্ধমূল ধারনা হয়ে যায়। আসে ১৯২৮ সালের নেহ রু রিপোর্ট যেখানে জিন্নাহর লউখন প্যাক্টের মুসলিমদের জন্য মেনে নেওয়া বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ দাবী পাশ কাটান হয় বাদ দেয়া হয়। সূচনা হয় হিন্দু মুসলিম দন্ধের নতুন এবং চূড়ান্ত লড়াই। জিন্নাহ যেমন বিশ্বাস করলেন অখণ্ড ভারতে আর মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা সম্ভব নয় তেমনিভাবে কংগ্রেস বিশ্বাস করলো মুসলিমরা ভারতে ইসলামিক শাসন কায়েম করতে চায়। এখানে দন্ধ আসলে জিন্নাহ বনাম, কংগ্রেস কারণ জিন্নাহ তখন একাই মুসলিম লীগের কাণ্ডারি বা একক অপ্রতিদন্ধি নেতা। হিন্দু-মুসলিমের অনেক মিলনের চেষ্টাকে চূড়ান্ত ভাবে নস্যাৎ করে দেয় জিন্নাহর ডাকা ১৯৪৬ এর ১৬ই আগস্টের “ডাইরেক্ট একশন” যা স্মরণ কালের ভয়াবহ দাঙ্গার সূত্রপাত করে । এই হিন্দু- মুসলিম দাঙ্গায় শুধু কলকাতাতেই প্রথম দিনে ৩০০ শ র বেশী মারা যায় হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০। এই দাংগা থেমে থাকেনি।পরবর্তীতে কত মানুষ কত-ধরনের দাঙ্গায় প্রাণ দিয়েছে তাঁর হিসেব অন্য। উল্লেখ্য দাঙ্গা শুরুর আগের দিনও নেহ রু এবং জিন্নাহর মাঝে আলোচনা হয়েছিল কিন্তু কি আলাপ হয়েছিল জানা যায়নি ,কেউ মুখ খোলেননি। হিন্দু – মুসলিমের এই অবিশ্বাসের রাজনীতির ছিল বর্ণ হিন্দু এবং বর্ণ মুসলিমদের ক্ষমতার লড়াই,যার বলি হয়েছিল নিম্ন বর্ণের হিন্দু এবং মুসলিম রা ।
ধর্মের মাধ্যমে শোষণ আর নিপীড়নের যে ইতিহাস শুরু হয়েছিল ত্যার শুরু বাঙ্গালীর ইতিহাসের গরা থেকেই । বাঙ্গালী থেকে গিয়েছে নীচে। নিচু জাত হিসেবে। রাম রহীমকে কাছে টেনে নিলেও সেন আর খানের ক্ষমতা লড়াই রাম রহীমের নারীকে ছিন্ন করেছে। ১৯৪৭ এ যে দুটি দেশের জন্ম হয়েছে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ই আগস্টে ভারত সেখানে রহিম এবং রামের অবস্থান এখনো একই যা ছিল দশ হাজার বছর পূর্বে।
এমনকি বর্তমান বাংলাদেশেও অবস্থা বদলায় নাই। ইসমাইলি সম্প্রদায়ের মুসলিম জিন্নাহ স্বাধীন পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু বাঙ্গালীর পুরব পাকিস্তানে প্রথমবারের মত সফরে এসেই বলে বসলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। পূর্বপাকিস্তানের বাঙ্গালীরা মেনে নিলো না। এরপরের ইতিহাস আমরা জানি। হোসেন শহীদ সোরহোয়ারদি কে করা হয়েছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কিন্তু তিনি ছিলেন উর্দুভাষী একই অবস্থা খাজা নাজিমুদ্দিনের খাজা সাহেব পূর্বপাকিস্তানের মানুষ হলেও ছিলেন উর্দুভাষী। আরেক নেতা আবুল হাশিম
ছিলেন উর্দুভাষী। বাংলাভাষী ফজলুল হক উর্দুভাষীদের সুরেই কথা বলেছেন খাজা নাজিমুদ্দিন কে খাটি বাঙ্গালী বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন।
প্রকৃত বাঙ্গালী নেতার আবির্ভাব হয় অনেক পরে। ১৯২০ সালে যার জন্ম শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিব এর রক্তে কিছুটা বহিরাগতদের রক্ত থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু তাঁর প্রভাব এতই কম ছিল যে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে নেমে আসেন । বাঙ্গালী সেই হাজার বছরের বাঙ্গালীর মুক্তির দায়িত্ব যিনি একাই কাঁধে তুলে নেন। এর মাঝে কিছু বাঙ্গালী নেতা ছিলেন তাদের অন্যতম মাওলানা ভাসানি, কিন্তু ভাসানি ছিলেন লক্ষ্যহীন মানুষ। ১৯৪৯ এ পাকিস্তান কে অয়ালাইকুম আসসালাম জানালেও কাজের কাজ কিছু হয় নাই। পিকিং পন্থি মাওলনা লুঙ্গি পরে চীন সফর করলেও দাড়ি টুপি পরতেন এবং ধর্মভীরু ছিলেন। মাওলানার গোঁজামিল মার্কা রাজনীতিতে কাজের কাজ কিছু হয়নি। যদিও মাওলানার দেশ প্রেম এবং সংগ্রামী জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা সবার ই আছে।
প্রকৃত বাঙ্গালীর মুক্তির কাণ্ডারি হয়ে আসেন শেখ মুজিব। মুজিবের দেয়া ৬ দফার মাধ্যমে বাঙ্গালীর মুক্তির আন্দোলন শুরু । ৬ দফায় ছিল ১) লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র গঠন ২) কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র ৩) প্রদেশের নিজস্ব মুদ্রা থাকবে ৪) কর আরোপ এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের ৫) দেশের দুই অংশের বৈদেশিক আয়ের দুটি আলাদা হিসেব থাকবে ৬) পুরব পাকিস্তানের নিজস্ব আঞ্চলিক বা আধা সামরিক বাহিনী থাকবে। এই ছয় দফা পাকিস্তানের কোন অংশের কোন নেতারই সমর্থন লাভে বার্থ হয়। মুজিব এককভাবে এই ৬ দফার ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং দেশদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। ৬৯ এর গন অভ্যুথ্হানের মাধ্যমে মুক্তিলাভ করেন । ১৯৭০ এর নির্বাচনে মুজিবের দল আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ লাভ করলেও পশ্চিম অংশের নেতা ভুট্টা দেশের দুই অংশে দুই সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন যা ছিল দেশ ভাঙ্গার নামান্তর মানুষ এর বিরোধিতা শুরু করলে কেন্দ্রীও পাকিস্তানি সরকার মুজিবের হাতে ক্ষমতা না দেয়ার যে ষড়যন্ত্র করে তার বিরুদ্ধে মুজিব রুখে দাঁড়ান এবং পূর্বপাকিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করে বাংলাদেশ নামকরণ করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে মুজিবের এই আপোষহীন সংগ্রামের কারণ আমাদের বুঝতে হবে। মুজিব ৬ দফার সাথে বেইমানী করলে বাংলাদেশের জন্ম হত না। বেইমানী করাটাই ছিল স্বাভাবিক কারণ তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন যা সোরহোয়ারদি হয়েছিলেন,তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বলেছিলেন,তার এ পদ লাভের কারনে পূর্বপাকিস্তানের শতকরা ৯৮ ভাগ দাবী পূরণ হয়ে গেছে,কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং গৃহবন্দি হন। মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চিমারা আমাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কখনই দেবে না,তারা পুরনো খেলাই খেলবে অর্থাৎ ক্ষমতার সামান্য ভাগ দেবে , মুজিব বুঝেছিলেন শাসক সুবিধার খুদ কুড় দিলেও সম্মান দেবে না। আগের সব নেতারা তথাকথিত নিম্ন- বর্ণ থেকে উঠে এসে শাসকের খুদ কুড়তেই সন্তস্ট থেকেছেন।মুজিব এর ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন।আর মুজিবের সমালোচনা? সে আরেকদিনের জন্য থাকল।

বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে দু চার কথা - বাংলার জননী সংস্কৃত নয়- পার্থ বসু

ভুল ভারতের ভুল আসামে ( আমি বাংলায় আসাম বলব। অসমীয়ারা পরপর দুটি আ উচ্চারণ করে না সেটা তাদের ব্যাপার, বদের ধাড়ি বাজারি পত্রিকার ফতোয়া মেনে অসম বলব না) বরাক উপত্যকার এক টুকরো ঈশান বাংলার শহর শিলচর। ভারতে বাংলাভাষার জন্য এই শহরে ১৯৬১ র ১৯ শে মে শহীদ হয়েছিলেন ১১ জন ভাষা সৈনিক। অহিংস সত্যাগ্রহীদের উপর গুলি চালায় পুলিশ। বিশ্বের মাতৃভাষা আন্দোলনে প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য এই মাটির দুহিতা। দ্বিতীয় মহিলা যিনি শহীদ হয়েছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার স্বাধিকার অর্জনের জন্য তাঁর নাম সুদেষ্ণা সিংহ। এই মাটির মেয়ে।
এই তীর্থে আমি কর্মসূত্রে কাটিয়েছিলাম দু বছর। মর্মসূত্রে আমি এই মাটির আত্মীয়।
শিলচরের দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গে নিয়মিত স্তম্ভ লেখা শুরু করি তাও বছর গড়াল।প্রতি রবিবার। কলামের নাম ' ঘটিগরম '। খুব রুচিশীল এবং আধুনিক শৈলীর কাগজ। ই এডিশন আছে।www.dainiksamayikprasanga.co.in. আগ্রহী বন্ধুরা উঁকি দিতে পারেন।
গতকাল অমিতাভ দেব চৌধুরী, কাগজের বিভাগীয় সম্পাদক এবং খ্যাতিমান কবি ফোনে জানতে চাইলেন এবারের কিস্তি তৈরি করেছি কিনা। পুরোন কোন লেখাও যদি থাকে----।
সংস্কৃত ভাষা নিয়ে যে বিতর্ক আমার সময়রেখায় জমে উঠেছে সেই সব সংলাপ চূর্ণ একজোট করে একরকম টুকে পাঠালাম। এবারের স্তম্ভটি তাই আমার একার অবদান নয়। এই বিতর্কে যারা অংশ নিয়েছেন সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা জানালাম।
লেখাটি পড়ুন

ভাষা বিতর্ক, ফোরাম ফেসবুক / পার্থ বসু
সংঘ পরিবার আবার ধুয়ো তুলেছেন – সংস্কৃত সব ভারতীয় ভাষার জননী। তাঁদের অনুগত চ্যানেলে এলাহি প্রচার। বন্ধুদের অনেকের সাথেই কথা বলতে গিয়ে দেখেছি তাঁরা অনেকেই তাত্ত্বিক বিতর্কের ধারে কাছে যেতে উৎসাহী নন ।
অনেকেই বিষয়টি 'আমরা ওরা'র নিরিখে এইভাবে ভাবেন-- বেশ তো ! ওদের আরবি, আমাদের সংস্কৃত। ওদের মাদ্রাসা, আমাদের টোল। ইজরায়েল হিব্রুকে ফিরিয়েছে। আমরা সংস্কৃতের পুনরুত্থান করব।
অর্থাৎ একটি সুস্থ ভাষা বিতর্ক শুরুতেই বিভেদ রাজনীতির পাঁকে যাকে বলে ঘেঁটে ঘ।
“সংস্কৃত ভারতের সব ভাষার জননী আমরাও স্কুলে শিখেছি।এটাও নিছক প্রচার। এ বিষয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছি আগেই। শ্রদ্ধেয় রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যও লিখেছেন। নানান ভারতীয় ভাষা সংস্কার করে সংস্কৃত। জন্মলগ্নেই মৃতপ্রায়। এ ভাষা কখনও মানুষের কথ্য ভাষা ছিল না।ODBL এ ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় কি বলেছেন শুনুন-- Vol 1,page 52-- একটি সুবর্ণ প্রতিমা যতই সুন্দর হোক প্রাণহীন বলেই তা কোন সন্তান প্রসবে অক্ষম। স্বীকার করি সংস্কৃতে ভারতীয় মেধা ও মনীষার স্বাক্ষর রয়েছে। ভাষাটি ছিল বর্ণ হিন্দুর কুক্ষিগত। শূদ্রের পাঠের অধিকার ছিল না। মেয়েদের পাঠের অধিকার ছিল না।অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্যের ভাগবত পাঠে ঘোর আপত্তি জানিয়েছিলেন পুরীর শঙ্করাচার্য। আর বরেণ্য মুসলমান বাঙালীদের সংস্কৃত শিখতে কি হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল সে লজ্জার ইতিহাসে নাই বা গেলাম।"
গত বছর, ১লা এপ্রিল ২০১৫ ফেসবুকে লিখেছিলাম। পুকুরের শান্ত জলে ঢিল ফেলার মত। আশাতীত ভাবে বন্ধুরা বিতর্কে অংশ নিলেন। এক বছর বাদে স্মৃতিচারণে আবার লিখলাম। এবার বিতর্ক আরও দানা বাঁধল। এই বন্ধুদের খুব কমজনকেই ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। এঁদের মধ্যে খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক,কবি, পত্রিকা সম্পাদক, উৎসাহী পাঠক এমনকি এখনও কলেজ ছাত্র সকলেই আছেন। বিতর্ক নানা বয়ানে জমে উঠেছে। বিশ্ব জোড়া পাঠশালায় সবার আমি ছাত্র। ঘটিগরমে আসুন পাঠক তার কিছুটা ভাগ করে নি। নাটকীয় সংলাপচূর্ণের কিছু। কে কি বলছেন শোনাই।
তপন কর
এখন, এই একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশ থেকে মুসলমান ছাত্র কলকাতায় সংস্কৃত পড়তে আসছে কেন, সেটাও জানতে চাই ।
অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
সংস্কৃত ভাষা সব ভাষার জননী কি না সে বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছি আমার "লিঙ্গপুরাণ" বইটিতে | তাই নতুন করে এখানে মন্তব্য করলাম না |
শুভ্র কুমার বসু
ডঃ ক্ষুদিরাম দাসও তো দেখিয়ে গেছেন বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারের মাত্র ২৬% সংস্কৃতজাত - আমরা যেমনটা ভাবি তার চেয়ে অনেক কম।
রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য স্যান্নাল
আমি বহুদিন আগে থেকেই এই কথাগুলো বলে বা লিখে আসছি । তথ্য ও প্রমাণ দিলেও বহু মানুষ এই নিয়ে জায়গায় জায়গায় " খিল্লি: করে এসেছে । তার মধ্যে আবার বহু " শিক্ষিত" মানুষও আছে ।
সংস্কৃতকে আমি হেয় করছি না, তবে এটা যে এলিটদের ভাষা, সেটা বারবার বলেছি ।
এই নিয়ে একটি এফ এম চ্যানেলে বলেওছি।
রতন বসু মজুমদার
একশো শতাংশ একমত । হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্থানের প্রবক্তারা স্বাধীনতার জন্ম লগ্ন থেকেই এই অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এখন তো হিন্দিকে রাজভাষাও বলা হচ্ছে । আমরা মেরুদন্ড বাঁধি দিয়ে বসেআছি তাই প্রতিবাদ করতেও ভয় পাই ।
কৌস্তভ করণ
তাতে করে সংস্কৃত ভাষার জননী হিসেবে স্বীকৃতি বাধা হয় কিকরে, আমার অল্প বুদ্ধির মাথায় ঢুকছে না ! একটা কথা আমরা বোধহয় অনেক সময়ই ভুলে যাই, সমালোচনার একটা সীমা থাকা উচিত ; আর উত্তমর্ণের কাছে ঋণ স্বীকার নিজেকেই উন্নত করে ! প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রইলাম !
আমি
সুনীতি বাবু সংস্কৃতর মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নি।সংস্কৃত পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম মানভাষা।পাণিনি যে ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন আগের অন্তত আরও বারোটি ব্যাকরণ সংস্কার করে তার তুলনা ল্যাটিন বা গ্রীকের মত ধ্রুপদী ভাষাতেও নেই।
কিন্তু পাণিনি এই ভাষাটিকে মেধা ও মনীষার ভাষায় আটকে রাখলেন।সাধারণ মানুষ তার নাগাল পায় নি।
সংস্কৃত তাই লৌকিক ভাষা নয়, কথ্য ভাষাও ছিল না কখনও।
সংস্কার করে গঠিত যে ভাষা তাই সংস্কৃত।নামেই বোঝা যায় এটি কোন উৎস ভাষা নয়।তাই জননীও নয় কোন ভাষার।
সংস্কৃতই বরং ঋণী অন্য ভাষার কাছে।যেমন লিপি।সংস্কৃত ভাষার কোন নিজস্ব লিপি নেই।মধ্যযুগেও সংস্কৃত ভাষা সারা ভারতে নানা প্রাদেশিক লিপিতে লেখা হত।জয়দেব গীতগোবিন্দ লিখেছিলেন বাংলা লিপিতে।সংস্কৃতের জন্য নাগরী লিপি গৃহীত হয় অনতিঅতীতে।নাম দেওয়া হয় দেবনাগরী।
এক বন্ধু উত্তমর্ণের কাছে ঋণ স্বীকারের কথা তুলেছেন।
বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারের একটি শতকরা হিসাব দিয়েছেন ভাষাবিদ ক্ষুদিরাম দাস--২৬ %.
ব্যাকরণ সাঁওতালীর কাছাকাছি।ছন্দেও।
স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও বাংলা ভাষার বচন ও ক্রিয়াপদে নিজস্বতার দিকে আমাদের সচেতন করেন।
সংস্কৃত ভাষার সম্পদ যা কিছু বাঙালী নিয়েছে তা একরকম অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া।
সংস্কৃত ভাষা বাংলা ভাষার মা নয় তো ক্ষতি কি? সংস্কৃত ভাষা সমগ্র বাঙালীর অহংকার।ভাষাটি পূর্ব ভারতে নিজস্ব লিপি ও স্বকীয়তায় চর্চিত হত।নাম ছিল গৌড়ীয় রীতি।
হাসান ইলিয়াস
সংস্কৃত বাংলাভাষার জননী কিনা এই নিয়ে পার্থসারথি বসুর একটি লেখা পড়লাম ফেসবুকে। অনেকেই মনে করবেন, এই ধরণের লেখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ঘুমটা এতটা গভীর যে বিছানা থেকে না ফেলে দিলে ভাঙবে না। অর্থাৎ কিছু বিশ্বাস আমাদের ওপর পানিপড়ার মতো ফুঁকে দেওয়া হয়েছে। তাই এইধরনের লেখার খুবই প্রয়োজন আজ। ওনার লেখা এবং কমেন্ট থেকে অনেক তথ্য পেলাম।
যাইহোক, সংস্কৃত একটি অত্যান্ত সমৃদ্ধশালী ভাষা। কিন্তু বাংলাসহ অন্যান্য ভারতীয় ভাষার জননী নয়। সংস্কৃত থেকে বাংলার জন্ম হয়নি। কলেজে উঠে ভাষাতত্ত্ব পড়ার আগে এটা আমিও জানতাম না।
প্রসঙ্গত যে, ২০১৪ সালে ভারতে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর একটি খবরের চ্যানেল সংস্কৃতকে পুনরায় পুরো ভারতে ফিরিয়ে আনার পক্ষে খুব হম্বিতম্বি করছিল। সেই খবরের চ্যানেলের বক্তব্য, ইসরাইল যেভাবে প্রাচীন ভাষা হিব্রুকে ফিরিয়ে এনেছে তেমনই আমাদেরও উচিত সংস্কৃতকে ফিরিয়ে আনা।
বিস্ময়কর মানব
এক বিশেষ গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে সমস্ত ভাষার উৎস কিন্তু আরবি ভাষা থেকে।
হাসান ইলিয়াস
হঠাৎ আরবীর প্রসঙ্গ কেন হে? ওসব আরবী-টারবী ছাড়ো। পারলে যুক্তিপূর্ণ মতামত দাও।
বিস্ময়কর মানব
তুমি সত্যিটাও অস্বীকার করছো. .এবং অযৌক্তিক কথা বলছো
হাসান ইলিয়াস ঠিক আছে, তোমাকে আহবান জানাচ্ছি তুমি সংস্কৃতকে বাংলাভাষার জননী প্রমাণ করো। আর না পারলে নিজের নাক কাটিয়ো না দয়া করে।
বিস্ময়কর মানব
আরে ধূর আমি এখানে আরবি প্রসঙ্গে কথা বললাম।
আবু রায়হান সুমন
'সংস্কৃত বাংলা ভাষার জননী' এটা প্রমাণিত সত্য নয়। কিন্তু আমার মনেও ভ্রান্ত ধারণা ছিল, সংস্কৃত কে বাংলা ভাষার জননী হিসেবে মানতাম।। কলেজ এ পীযুষ স্যার এর ভাষাতত্ত্ব ক্লাসে আমার ভুল ভাঙ্গে।
সুজন ভট্টাচার্য
বিস্ময়কর মানব
এই বিশেষ গবেষণাটির সম্বন্ধে একটু জানাতে পারবেন? আমরা যারা মূর্খ, তারা তো জানি সেমেটিক ভাষার মধ্যে হিব্রু আরো প্রাচীন। আর ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর সাথে আরবির কোন সাযুজ্য নেই। কোনটা ঠিক?
বিস্ময়কর মানব
ভালো করে গবেষণা করে দেখুন তাহলে দেখবেন প্রচীন থেকে প্রাচীনতম ভাষা কিন্তু আরবি ভাষা
লোপামুদ্রা বল সরকার
বিস্ময়কর মানব প্লীজ , এই তথ্যের সোর্স কি তা বলুন ।
বিস্ময়কর মানব
কোরান এবং ইসলামিক কোনও গ্রন্থসামগ্রী..দেখুন পড়ুন তাহলে সব বুঝতে পারবেন. .দরকার পড়লে ডঃজাকের সাহেবের সাহায্য নিতে পারেন।
হাসান ইলিয়াস
বিস্ময়কর মানব আশ্চর্য জীব। আমি যেহেতু বলেছি সংস্কৃত বাংলার জননী নয়, তাই আমাকে একহাত নেওয়ার জন্য শ্লেষের সঙ্গে আরবীর প্রসঙ্গ এনেছে। বিস্ময়কর মানব হয়তো আমাকে 'আরব' ভাবে, বাঙালি নয়। ওর সঙ্গে কেউ জড়াতে যাবেন না। উনি একজন বিরক্তিকর মানব। কোথায় কী বলতে হয় তাও জানেনা।
হাসান ইলিয়াস
যাইহোক, বিস্ময়কর মানব, তুমি নিশ্চয়ই জেনে সমৃদ্ধ হলে যে সংস্কৃত বাংলাভাষার জননী নয়। এব্যাপারে তোমার সঙ্ঘ পরিবারের বক্তব্যটা জানিয়ো।
সুজন ভট্টাচার্য
কি যন্ত্রণা বিস্ময়কর মানব আমি তো আপনার দেওয়া তথ্যটি বিস্তারিত জানতে চাইলাম। আপনি উলটে আমাকে গবেষণা করতে বলছেন। কেমন ডাক্তার মশাই আপনি, রুগীকেই বলেন তার রোগের ওষুধ খুঁজে বের করতে! ভালো করে গবেষণার কথা থাক। আপনার জন্য জানিয়ে যাই ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে আরবি-হিব্রু -আরমেইক সহ অন্যান্য সেমেটিক ভাষাগুলি আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই গোষ্ঠীর যে ভাষাটির সবথেকে প্রাচীন পরিচিতি পাওয়া যায় সেটি হল পূর্ব সেমেটিক আক্কাদিয় ভাষা। এই ভাষার সবথেকে প্রাচীন লিখিত রূপ পাওয়া যায় ঊর-এর মৃৎপাত্রে যা নাকি ঊর-এর রাজা মেসিকিয়াং নুনা-র প্রতি তার রাণী গান-সামানের নিবেদন। গিলগামেষের মহাকাব্য নিয়ে কিছু জানেন কি? তখন আরবি ভাষা কোথায়?
কৃশানু বসু
বাংলাভাষার উৎপত্তি নিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর একটি বই আছে।নামটি মনে করতে পারছি না।খুব প্রয়োজনীয় বই।পারলে লাইব্রেরিতে খোঁজ নিও।
মশলা দিলাম। পাঠক একটু মিশিয়ে নিন।
WWW.DAINIKSAMAYIKPRASANGA.CO.IN