Tuesday, 27 October 2015

অরুণ সোমের সঙ্গে জাহেদ সরওয়ারের গপসপ

ষাটের দশকে সোভিয়েত রাশিয়া যে সৃজন বিষয়ক কর্মযজ্ঞে মেতেছিল তাতে সামিল হতে অনুবাদকের চাকরি নিয়ে গিয়েছিলেন অরুণ সোম। প্রায় একদশক নিরন্তর অনুবাদ করেছেন, রুশ থেকে বাংলায়। এসময় অরুণ সোম প্রায় ৪০টির ও বেশি বই অনুবাদ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর তিনি রুশী স্ত্রী ও দুই কন্যা নিয়ে চলে আসেন কলিকাতায়। কলিকাতায় বসে তিনি এখনও একের পর এক অনুবাদ করছেন। ২৪.৫.২০১১ তারিখে কলিকাতায় অরুণ সোমের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে আলাপ করি।
উল্লেখ্য স্কুলে পড়ার সময় চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট এলাকায় অরুণ সোম অনূদিত গোগলের রচনাসপ্তক পড়ে প্রথম তাঁর সম্পর্কে আগ্রহী হই। পরে ‘নির্মাণ’ লিটলম্যাগের সম্পাদক রেজাউল করিম সুমনের কাছ থেকে অরুণদার ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাঁর সঙ্গে কলিকাতায় প্রথম দেখা করি এবং সংলাপের সম্মতি আদায় করি। দ্বিতীয় দেখায় তাঁর সঙ্গে গপসপ করি।
গড়িয়াপার্কে সবুজদলের মাঠঘেষা ছায়াঘেরা দোতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন অরুণ সোম। ক্যামেরা কাম রেকর্ডারের দায়িত্বরত মোবাইল ফোনটিকে টেবিলে রাখতে দেখেই “ইন্টারভিউ!” বলে অরুণদার স্ত্রী লুদমিলা ভেতরের দিকে ছুটে পালালে আমাদের সংলাপ শুরু হয়ে যায়–যে সংলাপে অরুণদা কথা বলেছেন সোভিয়েত রাজনীতি, সাহিত্য, অনুবাদ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে আর সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে অরুণদার স্ত্রী সরবরাহ করেছেন হাতে বানানো সব্জি-দেওয়া রুশ বিস্কুট, আচার, লাল ও সবুজ চা আর অরুণ সোমের তৈরি অসাধারণ ওয়াইন।–জাহেদ সরওয়ার
জা স: কেন আপনি রুশ সাহিত্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। রুশ শিখেছিলেন কোথায়?
অ সো: আমার রুশ শেখা কলকাতাতেই। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, সে সময় রুশ শেখার বিষয়ে আগ্রহী হই। রুশ শেখার ব্যাপারটা খানিক রাজনৈতিকও। এ ছাড়াও আমাদের ছাত্রাবস্থায় রুশ সাহিত্য বাংলা অনুবাদে কিছু আমরা পড়েছিলাম। প্রথম যে রুশ সাহিত্যের সাথে পরিচয় হয়–মাক্সিম গোর্কীর মা ও আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসসমূহ। মা’টা কলকাতাতেই অনুবাদ হয়েছিলো সে সময়। অনুবাদ করেছিলেন পুস্পময়ী বসু। যদিও ইংরেজি থেকে করা। তবুও আমার মনে হয় এই পর্যন্ত মা’র যত অনুবাদ বেরিয়েছে তার মধ্যে এই অনুবাদটি শ্রেষ্ঠ। আর যে বইটা আমার খুব ভাল লেগেছিল–গোর্কীর আমার ছেলেবেলা। ওটা মনে হয় বিষ্ণু চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদ ছিল। যাই হোক গোর্কীকে বলা যায় আমার রুশ সাহিত্যের প্রবেশিকা।
জা স: অনুবাদকের চাকরি নিয়ে অনুবাদ করা আর সৃজনশীল অনুবাদের মধ্যে কোনো তফাৎ আছে বলে মনে করেন? এর আলোকে বলতে পারি, যেহেতু অনুবাদকের চাকরি নিয়ে আপনারা সোভিয়েত গিয়েছিলেন; যদিও রুশ সাহিত্যপ্রীতি আছে বলেই সেটা সম্ভব হয়েছিলো। আবার এখনো আপনি নিরন্তর অনুবাদ করছেন যদিও এখানকারটা আপনার চাকরি না।
অ সো: পার্থক্যটা পরিবেশ ও পরিস্থিতির। সৃজনশীল সাহিত্যের প্রায় অনুবাদকেরা একটা ভাললাগা থেকে অনুবাদ করেন, আমার ক্ষেত্রে ব্যপারটা অন্যরকম। যেহেতু আমাদের শিক্ষাটা ছিল বাংলা মাধ্যম। ইংরেজি ছিল যদিও, তবুও বলবো ইংরেজিটা আসলে সেভাবে জানা নয়। যার মাধ্যমে সাহিত্যের স্বাদ নেয়া যায়। যা সে সময় অনুবাদ হতো তাকে ‘স্টোরি রিটোল্ড’ বলা যায়। কিন্তু তবুও ওটা কিছু হয়নি বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কারণ ওটা যাই হোক না কেন তা আমাদের সাহিত্যের আরও গভীরে প্রবেশের জন্য প্রবেশপথের মত কাজ করেছে। আমরা রবিনসন ক্রুসো বা রবিনহুড বাংলায় পড়েছি আবার ছোট একটা ইংরেজি সংস্করণে পড়েছি। কিন্তু আমাদের এক বন্ধু সের দরে বিক্রিত কাগজের ভেতর মূল রবিনসন ক্রুসোটা পেয়ে যায়। বইটার সাইজ এবং নেড়ে চেড়ে দেখে অবাক হই তাহলে আমরা কী পড়েছি। এত দেখি সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।
যাইহোক আমার মনে হতে থাকে যে এই সমস্ত হেলাফেলা অনুবাদ না করে মূল জিনিসটা সাইজ অবিকৃত রেখে বাংলায় অনুবাদ হওয়া উচিত। যেহেতু সামগ্রিকভাবে রুশ সাহিত্যটার প্রতিই আমার আগ্রহ। রুশ শেখার পর আমি তুর্গেনেভ ও তলস্তয়ের কয়েকটা গল্প অনুবাদ করি। প্রাথমিকভাবে স্কুল কলেজে পড়াতাম সে সময়। আমি মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে একটা স্কলারশিপও পেয়ে যাই। সুতরাং আমাকে শুধু অনুবাদকের চাকরি নিয়ে গিয়েছি বলা যাবে না। চাকরি নিয়ে অনুবাদ শুরু করার পর আমি খানিকটা হতাশই হয়ে পড়েছিলাম। কারণ আমরা স্ব স্ব ভাষায় অনুবাদ করছি, তার ওপর আবার ওদের এডিটর আছে। যারা সামান্য বাংলা জানে। অনুবাদের পর তাদের সঙ্গে বসতে হতো। তারা বিভিন্ন প্রশ্ন করতো। হয়তো বলতো বাংলাটা এ রকম করেছো কিন্তু রুশিতে এই রকম আছে জাতীয় প্রশ্ন। কিন্তু হবহু অবিকৃত রেখেতো আর অনুবাদ করা যাবে না। যাই হোক তারা অভিধান দেখে যেভাবে করতে বলতো আসলে তাতো করা সম্ভব না। তাহলে মানেটাই যাবে বদলে। কিন্তু ওই যে খোদার উপরে খোদগারি! অনেক অনুবাদকই যা করতো, তা হলো এদের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে সময় নষ্ট করার চাইতে হয়তো বলতো–ঠিক আছে, তোমারটাই ঠিক আছে বলে কেটে পড়তো। কিন্তু এই যে ছাড় দেওয়া, এই ছাড় দেওয়ার কারণে বহু অনুবাদের ক্ষতি হয়েছে। এই জন্য পরবর্তিতে অনেকের কাছে শুনতে হয়েছে। মস্কো থেকে তো অনেক ভাল ভাল বই বেরোয় কিন্তু অনুবাদগুলো যেন কী রকম। আসলে এটা অনুবাদকের দোষ না। কথা হচ্ছে, আমাদের ছিল ফোড়নের কাজ। যত পৃষ্ঠা অনুবাদ করবে সেই অনুযায়ী পয়সা। তো এতক্ষণ ধরে কে ওদের সঙ্গে বসে প্যাঁচাল পাড়বে!
এমনকি ননী ভৌমিকের অনেক অনুবাদ দেখেও লোকে বলতো এটা কি ননী ভৌমিকের করা! হতেই পারে না। কিন্তু সেটা তো আর ননী ভৌমিকের দোষ না।
কিন্তু আমার ক্ষেত্রে একটু অন্যরকম ব্যাপার ঘটেছিলো। আমার যে এডিটর ছিল সে আবার বয়সে ছোট ছিল আমার। প্রশান্ত দন করবার সময় তার সঙ্গে আমার বোঝাপড়া হয়েছিল এবং সে আমাকে একদিন ডেকে বলেছিলো আমি ভেবে দেখলাম আসলে বাংলাটা আমি তোমার মতো তো আর জানি না। তোমার আরও স্বাধীনতা পাওয়া দরকার। ব্যাপারটা ভালই হয়েছিলো আমার জন্য। যাই হোক কলকাতায় আসার পর যেগুলো অনুবাদ করেছি সেগুলোতে স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করেছি।
জা স: একেকটা বই অনুবাদ করতে কতদিন সময় লাগতো। অনুবাদের প্রক্রিয়াটা কী রকম ছিল। আর এ পর্যন্ত কয়টা বই অনুবাদ করেছেন।
অ সো: বইয়ের ব্যাপারে একটা সময় বেধে দিতো, তার মধ্যে অনুবাদ করে দিতে হতো। আর কতগুলো ছিল জার্নালের কাজ। সোভিয়েত নারী, সোভিয়েত বিজ্ঞান প্রভৃতি। ওগুলো চার পাঁচদিনের মধ্যে দিতে হতো। বইয়ের কাজেও আয়তন অনুযায়ী সময় বেধে দেয়া থাকতো। আমাদের তো দ্রুত করবার তাগিদ ছিল কারণ ফোড়নের কাজ। যত পৃষ্ঠা অনুবাদ, সে অনুযায়ী পয়সা।
একসঙ্গে অনেক অনুবাদ করতাম। জার্নাল, সাহিত্য, ছোটদের বই। প্রশান্ত দন চারখণ্ড করতে আমার দেড় বছর লেগেছে। ছোট বড় মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশটা বই অনুবাদ করেছি।
জা স: ‘কোনো সিস্টেমের মধ্যে সৃজনশীলতা সম্ভব না’। রবীন্দ্রনাথসহ হালের মিলান কুন্দেরা ও আরো অনেকের অভিযোগ সোভিয়েতকালীন সাহিত্য সম্পর্কে। যেখান থেকে বেরিয়ে যেতে হয় ইভান বুনিন, ব্রদস্কি, সলোঝিনিৎসিন, আখমাতোভাসহ অনেককে আবার দেশের ভেতরেই আত্মনির্বাসিত থাকতে হয় বরিস পাস্তারনাককে। এ অভিযোগ কীভাবে নিতে চান।
অ সো: প্রশ্নটা একটু জটিল। কিন্তু আমার মনে হয় সিস্টেম তো একটা ছিলই। সব সময় সবদেশই কিছু সিস্টেমের ভেতর দিয়ে যায়, না হলে অবস্থানকে ধরে রাখা যায় না। সোভিয়েতও একটা সিস্টেম। সে সিস্টেমে কিছু বিধিনিষেধ তো ছিলই। যেহেতু সোভিয়েত আদর্শ ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। কিন্তু তাই বলে সবাই যে তা মানত তাতো না। যেমন গোর্কীকে তকমা মারা হয় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার লেখক, আসলে কি তাই। এটা গোর্কীর ওপর চাপিয়ে দেয়া, গোর্কীর সব লেখাতো সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতায় লেখা নয়। গোর্কীর ছোটগল্পগুলো পড়ো। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন জারের আমলে। একমাত্র গোর্কীর মা, যা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতায় লেখা। এমনকি যাকে বলা হয় বিপ্লবের কবি সেই মায়কোভস্কিইতো পার্টিভুক্ত ছিলেন না। পাস্তারনাকের ব্যাপারটাই ধরো। ব্যাপারটাকে রাজনৈতিকায়ন করা হয়েছে। তার ডক্টর জিভাগো আমি পড়েছি। ভাল লেগেছে কিন্তু সে অর্থে ক্লাসিক নয় যে অর্থে তলস্তয় ক্লাসিক। পাস্তারনাকের খ্যাতি মূলত অনুবাদক হিসাবে, তিনি সেক্সপিয়ারের সমস্ত রচনা রুশে অনুবাদ করেছিলেন। এটা একেবারেই পশ্চিমি প্রচারণা। কেন শোলোখভ কি সোভিয়েত ক্লাসিক না। আন্দ্রেয়েভ আলেক্সেই তলস্তয়। রুশীয় শিকড়ের সঙ্গে যারা যুক্ত নয় তারাই মূলত বাইরে ছিল।
জা স: ইভান বুনিনের ভিলিজ সহ নানা লেখায় আমরা দেখেছি কী অসাধারণ ঐতিহ্য সচেতনতা এবং রাশিয়ার সাধারণকে তিনি কীভাবে দেখতেন, অনেক কাছাকাছি মনে হয় তাকে রুশ আত্মার।
অ সো: বুনিনের ব্যাপারটা আলাদা। বুনিনের বিশাল জমিদারি ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। বুনিন হয়তো এই পরিবর্তন থেকে দূরে থাকার জন্য রাশিয়ার বাইরে ছিলেন। কিন্তু বুনিনের বই রাদুগা থেকে বের হয়েছে। সোভিয়েত আমলে তার সব বই বেরিয়েছে রাশিয়ায়। ব্রদস্কির ব্যাপারটা ধরলে বলা যায় ব্রদস্কি কি খুব বড় কবি?
জা স: কিন্তু কবিতা লেখার অপরাধে তাকে আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সম্ভবত তখন ব্রদস্কি কবিতার সার্ভভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।
অ সো: দেখ সোভিয়েত আমলে আসলে সিস্টেমটাই এরকম ছিল যে কেউ বেকার থাকতে পারবে না। রাষ্ট্র সবার জন্য বাসস্থান ও খাদ্য যেমন বরাদ্দ রেখেছে তেমনি কর্মও বরাদ্দ রেখেছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো আপনি কি করেন। বলে যে কবি। কিন্তু কবি তো কোনো জীবিকা না আপনি কী করে খান। আপনার টাকা পয়সা কোত্থেকে পান। শুধু কবি বললে তো হবে না।
জা স: এর পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো কারা কবি হিসাবে আপনাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। জবাবে ব্রদস্কি বলেছিলো, কে আমাকে মানবজাতির মধ্যে স্থান দিয়েছে?
অ সো: যাই হোক সোভিয়েত সিস্টেমের মধ্যে এটা যায় না। সোভিয়েত চেয়েছে সুনির্দিষ্ট উৎপাদনমূলক কর্ম। যাতে অংশ নেবে প্রত্যেকে। এর মানে এই নয় যে সোভিয়েত পর্বে কোনো সৎ সাহিত্যের সৃষ্টি হয় নি। যেমন ধরো আন্দ্রেয়েভ। তিনি গোর্কীর হাতে গড়া ছিলেন কিন্তু তিনিতো সোভিয়েত সমাজবাস্তবতার লেখক নন। এ ছাড়াও সোভিয়েত পর্বে রাশিয়া ছাড়াও সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়নে গণসাহিত্যেও জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। পিরিমকুল কাদিরভ ভাসিলি ইয়ান চেঙ্গিজ আইৎমাতভ রাসুল হামজাতভ সহ আরো অনেকে।
জা স: আমার কাছে বিস্ময়, হয়তো অনেক পাঠকের কাছেও। শালোকভের এপিক উপন্যাস চার খন্ডে ‘প্রশান্ত দন’। দস্তইয়েভস্কির ‘অপরাধ ও শাস্তি’। সম্প্রতি শেষ করেছেন আরেক এপিক তলস্তয়ের ‘ যুদ্ধ ও শান্তি’ দস্তইয়েভস্কির ‘কারামাজভ ভাইয়েরা’। এর মধ্যে কেবল প্রশান্ত দনটা রাদুগা থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো কিন্তু পরের বৃহৎ বইগুলো করার জন্য আপনি চুক্তিবদ্ধ নন। তবুও কোনো দায়বোধ থেকেই কি পরের বইগুলো অনুবাদ করেছেন?
অ সো: না, আমরা কি বই অনুবাদ করবো তা আমাদের হাতে ছিল না। তা সম্পূর্ণ ডিপার্টমেন্ট থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হতো। আর যখন কলকাতায় আসি, আকস্মিকভাবে যোগাযোগ ঘটে সাহিত্য আকাদেমির সঙ্গে। তারাই আমার কাছে প্রস্তাব দেয় রুশ ক্লাসিকগুলো, যে গুলো ইতিমধ্যে অনুবাদ হয়নি সেসব অনুবাদ করতে। তখন আমি নিজের থেকেই বলেছিলাম দস্তইয়েভস্কির কথা। অপরাধ ও শাস্তির পরে যখন আবার অনুবাদের কথা উঠলো, তখন আমি তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তির কথা বলি। তখন ওনারা বললো যে এটারতো অনেক অনুবাদ বেরিয়েছে। তখন আমি বললাম এগুলো একটাও মূলানুগ, যথাযথ বা সম্পূর্ণ নয়। তদুপরি সব ইংরেজি থেকে করা। আমি করবো মুল রুশ থেকে।
জা স: কারামাজভ ভাইয়েরা অনুবাদ হচ্ছে এটা শুনেছিলাম বেশ কিছুদিন হলো। যুদ্ধ ও শান্তি অনুবাদের আগেই কি কারামাজভ ধরেছিলেন।
অ সো: না না, পর পর দস্তইয়েভস্কি অনুবাদ করিনি এই জন্য যে তারা হয়তো বলবে সবই দস্তইয়েভস্কি করবেন কেন।যুদ্ধ ও শান্তি শেষ হবার পর ওরা আমাকে বললো এবার কি করবেন তখন আমি বললাম কারামাজভ ভাইয়েরা। তখন তারা বললো আবার দস্তইয়েভস্কি?
তখন আমি বললাম আবার বললে কি হবে দস্তইয়েভস্কিতো দস্তইয়েভস্কি, তাই না। এরপর কারামাজভ করি। এরপর হাত দেই ইডিয়টে। ইডিয়টের বেলায় কোনো প্রশ্ন উঠেনি কারণ তারা এতদিনে আমার পছন্দ সম্পর্কে জেনে গেছে। এখানে আমার অপার স্বাধীনতা কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো কোনো সম্পাদক নেই। আমি আমার মনের মতো কাজ করতে পারছি।
জা স: আরেকটি সম্পূরক প্রশ্ন, আপনার সময়ে কারা কারা ছিল রাশিয়ায় অনুবাদক হিসাবে।
অ সো: আমি যখন যাই তখন বাংলাদেশের হায়াৎ মামুদ ছিল। ননী ভৌমিক তো ছিলই, আরেকজন অনেক সিনিয়র অনুবাদক ছিল বিঞ্চু মুখোপাধ্যায়। তিনি অবশ্য রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বইগুলো অনুবাদ করতেন। রাধামোহন ভট্টাচার্য ছিলেন, ধীরেন রায় ছিলেন।
জা স: দস্তইয়েভস্কি নাকি বলেছিলেন আধুনিক রুশ সাহিত্যের জন্ম গোগলের ‘ওভারকোটের পকেটে’। সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে প্রায়ই লেখকের গল্পে, উপন্যাসে দস্তইয়েভস্কির চরিত্রের দেখা মেলে, সেটা বোর্হেস-কামু-কাফকা-কুন্দেরা-ইলেনেক-হেমিংওয়ে-স্টেইনব্যাক-ফকনার গ্রীণ কার্তেজ লাগের্কভিস্ট বাক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস–প্রায় সবার লেখায় দস্তইয়েভস্কির দেখা মেলে। দস্তইয়েভস্কির এই বিশাল কালজয়ী প্রভাবের দিকে তাকিয়ে এটাও বলা যায় দস্তইয়েভস্কি পরবর্তী বিশ্বসাহিত্যের জন্ম দস্তইয়েভস্কির অপরাধ ও শাস্তিতে। এটা এই কারণে যে দস্তইয়েভস্কির পর বিশ্ব উপন্যাসের চরিত্রগুলো বদলাতে থাকে। এমনকি তলস্তয়েরও চরিত্রগুলোর মধ্যে যতই ভাঙ্গগড়া থাকুক পিটার কিংবা সুফিয়া বা নেখলুয়েদভ বা কারেনিনা বা কনস্তানতিন লেভিন সবাই কিন্তু ধনতন্ত্রের প্রতিনিধি, হয়তো তলস্তয় নিজেও তাই ছিলেন বলেই চরিত্রগুলো বাধ্য হয়েছে। যদিও তাদের প্রত্যেকের আত্মজিজ্ঞাসাই মৌলিক।
অ সো: দস্তইয়েভস্কি গোগলের ওভারকোট সম্পর্কে যা বলেছিলেন আসলে তার কোনো লিখিত রূপ নেই। জনৈক ফরাসী সাহিত্যিককে তিনি নাকি এ কথা বলেছিলেন। নাকি। কিন্তু তাহলেও ঘটনাটা সত্য। দস্তইয়েভস্কির মন্তব্যটা ঠিক। তাহলে আমরা এটা বলতে পারি যে দস্তইয়েভস্কিরও গুরু আছে। গোগলের কাছে অনেক নিয়েছেন দস্তইয়েভস্কি। সেটা মনস্তাত্ত্বিক বা আর্থ সামাজিক। এই যে তুমি বললে বিশ্বসাহিত্যে দস্তইয়েভস্কির প্রভাব সম্পর্কে সেটা এই জন্য যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দস্তইয়েভস্কি সবসময় বঞ্চিত মানুষের পক্ষে। আর লেখকদের নীতি সবসময় ধনতান্ত্রিক যে অমানবিক প্রক্রিয়া তার বিরুদ্ধে কারণ তারাতো ন্যায়ের পক্ষেই কথা বলতে চায়, যদিও সব লেখকরাই তা নয়। আর ন্যায়তো সবসময় প্রলেতারিয়েতের পক্ষে সে কারণে তা দস্তইয়েভস্কির মানসের কাছাকাছি।
জা স: কখন শুনলেন আপনাদের কাজ শেষ। শুনে কী অনুভূতি হয়েছিলো।
অ সো: না চাকরি নেই বা আমাদের কাজ শেষ এ কথা হঠাৎ একদিনে বলা হয়নি। অর্থনৈতিক একটা বদ্ধতা তৈরি হয়েছিল তখন। ১৯৮৫ সালে যখন গর্বাচেভ এলেন। তিনি এসে ১ম বছর নানান কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন অর্থনৈতিক মুক্তির। ২য় বছর লোকজন এর ওপর খুব বিরক্ত হয়ে পড়ে। সবাই বলাবলি শুরু করলো একে দিয়ে কিছু হবে টবে না। গর্বাচেভ যা বলা শুরু করেছিলো–বিভিন্ন স্টেট থেকে অনুদান বা নানান সেবা সংস্থাগুলো গুটিয়ে নেয়া হবে। সবকিছুকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে হবে। সবকিছুকে লাভজনক খাতে পরিণত করলে তাহলে রাদুগা থাকবে কেন, প্রগতি থাকবে কেন? কারণ এই প্রকাশনা সংস্থাগুলোতো অনেকটা সেবা প্রতিষ্ঠান। এটাতো লাভজনক নয়। যদিও গর্বাচেভ মুখে বলেননি। কিন্তু তার কথাবার্তা আচরণে বুঝা গেল যে একটা পুঁজিতান্ত্রিক গণতন্ত্রায়নের পথে তিনি এগুচ্ছেন। ওরা অনেকেই বলল এই প্রকাশনাগুলোকে তারা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। আমি বললাম অসম্ভব, যে সস্তায় ওরা বইগুলো দিচ্ছে তার যথাযথ মূল্য রাখতে হলে এবং তা রুপি বা টাকায় কনভার্ট করতে গেলে একেকটা বইয়ের অনেক দাম পড়ে যাবে। তারপর আমার ধারণা হল যে রাদুগা আর প্রগতি থাকবে না। আমার মেয়েরা রুশ স্কুলে পড়তো। অনেক ভাল ছিল রুশ স্কুলিং ব্যবস্থা। আমি তাদের ওখান থেকে এনে ইন্ডিয়ান এম্বাসির ছেলেমেয়েদের জন্য যে স্কুল তাতে ভর্তি করে দিলাম। কারণ বাচ্চাদের তো হিন্দি জানতে হবে, ইংরেজি জানতে হবে, না হলে তো তারা বাঁচতে পারবেনা। তার মানে আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম। আমি ৮৫ সালে না হলেও বছর তিনেকের মধ্যে বুঝতে পারলাম এসব থাকবে না। শেষে তো তাই হলো। ৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলো। এরপর বুঝলাম এটা একেবারেই শেষ।
জা স: এরপর কি সবাই মানে, অনুবাদকরা সবাই একসঙ্গে রাশিয়া ছাড়লেন।
অ সো: না, সবাই একসঙ্গে আসেনি। ননী ভৌমিক তো ওখানেই, উনি তখন রিটায়ার্ড। দ্বিজেন দা তো পরে এলো, ওনার ছেলে ওখানে আছে। আমি দেখলাম যে আমিতো কোনো ব্যবসা করতে পারবো না। বেশিরভাগই তো অন্য বৃত্তি নিয়ে থেকে গেলেন। না, মূলত আমি যে আইডিওলোজি, আদর্শ নিয়ে গিয়েছিলাম সেটাই যখন নেই তখন আর আমার মন সায় দিচ্ছিল না ওখানে থাকার ব্যাপারে।
জা স: অনুবাদকদের অনুবাদ করতে কোন কোন ব্যাপারগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয় বলে অভিজ্ঞতার আলোকে মনে করেন।
অ সো: অনুবাদে আসলে অনেকগুলো ব্যাপারেই সতর্ক থাকতে হয়। দুইটি ভাষারই স্পন্দন বুঝতে হবে। আর শাব্দিক অনুবাদতো একেবারেই সম্ভব না, কারণ একেকটা ভাষার প্রকাশভঙ্গি একেকরকম। যেমন আমরা বলি ‘ধাপ করে পড়লো’। এটাকি ধাপ করে পড়ল নাকি পড়ে ধাপ করে শব্দ হলো। কিন্তু রুশ ভাষায় শাব্দিক অনুবাদ করলে এটা হবে ‘পড়ল এবং ধাপ করে শব্দ হলো’। গোগলের ওভারকোটেই আছে প্রায় দেড় পৃষ্ঠার একটা বাক্য। এখন আমি চেষ্টা করেছি জিনিসটা যেন অবিকৃত থাকে। এটাকে যদি ভেঙ্গে ভেঙ্গে করি তাহলে দেখা যাবে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও অনুবাদ করতে করতে বুঝা যায় আসলে কোন কোন বিষয়ে অনুবাদককে সতর্ক থাকতে হয়।
জা স: ব্যাপারটা সম্পর্কে আমি সঠিক কোনো তথ্য জানি না, তাই জানতে চাই। সোভিয়েত ভাঙ্গার পর রাদুগা বা প্রগতির যে অজস্র বই ছিল গোডাউনে। গোডাউন খালি করতে বইগুলো নাকি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিলো?
অ সো: না, এই তথ্য আমি জানি না। বই রাখার জায়গা না থাকলে পুড়িয়ে ফেললেও ফেলতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় কোনো একটা আর্কাইভেতো রাখার কথা। যেহেতু বইগুলো রাশিয়ায় কোনো কাজে আসবে না। আর যদি রাখার জায়গাও না থাকে নিশ্চই বইগুলোর কোনো একটা বিহিত তো হয়েছেই। কিন্তু বইগুলোর ভাগ্যে কি ঘটেছে তা আমি জানি না।
জা স: সোভিয়েত পর্বে কাদের গুরুত্বপূর্ণ লেখক মনে করেন।
অ সো: যদিও গোর্কীর কিছুটা জারের আমলে তবুও গোর্কীকে ধরা যায়। আন্দ্রেয়েভ, ইয়েভতেশঙ্কু, ভজনেসনস্কি, শোলোখভ, মায়াকভস্কি, আলেক্সেই তলস্তয়সহ শিশু সাহিত্যে প্রচুর লেখক আছে, যাদের নামও হয়তো এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে শিশুসাহিত্যে সোভিয়েত পর্বে যে কাজ হয়েছে তা অন্য কোনো সময় হয়নি।
জা স: বলতে গেলে সাহিত্যের সেবা করেই একটা জীবন কাটালেন। জীবন কি অর্থময় মনে হয়।
অ সো: জীবনতো এমনিতেও কেটে যেতো। ধরো আমি স্কুল মাস্টারি করতাম, সেটায় লেগে থাকলেও চলে যেতো। কিন্তু এখন এই যে ধরো পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে খুঁজে খুঁজে তোমরা উপকৃত হবার, ভাল লাগার কথা জানাচ্ছো–তাতে মনে হয় জীবন একেবারে নিরর্থক যায়নি।
—–
অরুণ সোমের অনুমতিক্রমে তাঁর কৃত রুশ থেকে বাংলা করা অনুবাদ বইয়ের তালিকা দেয়া হল।
গল্প উপন্যাস
১. চেঙ্গিজ খান-ভাসিলি ইয়ান, প্রগতি প্রকাশন (১৯৮৭)
২. গিরগিজার ছোটগল্প, প্রগতি প্রকাশন (১৯৮১)
৩. পাহাড় ও স্তেপের আখ্যান-চেঙ্গিজ আইৎমাতভ, প্রগতি (১৯৮৯)
৪. আমার জীবন- সের্গেই কনিয়নক, প্রগতি প্রকাশন (১৯৮০)
৫. গারিনের মারণরশ্মি- আলেক্সেই তলস্তয়, রাদুগা (১৯৮৮)
৬. জীবিত ও মৃত – কনস্তানতিন সিমনভ, রাদুগা (১৯৮৭)
৭. নিকলাই গোগল রচনা সপ্তক, রাদুগা(১৯৮৬)
৮. তিনজনা- মাক্সিম গর্কি, প্রগতি (১৯৮০)
৯. পিতা ও পুত্র-তুর্গেনেভ, রাদুগা(১৯৮৭)
১০. প্রশান্ত দন(১-৪খন্ড)- মিখাইল শালোখভ, রাদুগা -১৯৯০
১১. অপরাধ ও শাস্তি- ফিওদর দস্তইয়েভস্কি, সাহিত্য আকাদেমি (২০০০-২০০৫)
১২. যুদ্ধ ও শাস্তি- লেভ তলস্তয়, সাহিত্য আকাদেমি-যন্ত্রস্থ
১৩. কারামাজভ ভাইয়েরা- ফিওদও দস্তইয়েভস্কি, সাহিত্য আকাদেমি যন্ত্রস্থ
১৪. ইডিয়ট- ফিওদর দস্তইয়েভস্কি (অনুবাদ শেষ পর্যায়ে)
সমাজবিদ্যা
১৫. কার্ল মার্ক্স জীবনী- স্তেপানভা, প্রগতি
১৬. সমাজবিদ্যা, প্রগতি
১৭. লোকে কেন শহরে যায়- মইসেনকু ও মুকুমেল, প্রগতি ১৯৮২
১৮. শিক্ষা আমার ব্রত- সুখমলিনিস্কি, প্রগতি ১৯৮২
১৯. রিখার্ড জরগে- কলেসনিকভ ও কলেসকিভা, প্রগতি ১৯৮২
২০. পীত দানবের পুরি- মাক্সিম গোর্কি, রাদুগা ১৯৮৭
শিশু ও কিশোর সাহিত্য
২১. টেলিস্কোপ কী বলে- পাভেল ক্লুসানসেট, রাদুগা ১৯৮৬
২২. দাদুর চশমা- গেওর্গি ইউরমিন, রাদুগা
২৩. জাহাজ ভাসে সাগরজলে- সভিয়াতস্লাভ সাখারনভ, রাদুগা ১৯৮৫
২৪. ছবিতে গ্রহ নক্ষত্র-ভরিস লেভিন ও লিদিয়া রাদলভ, রাদুগা ১৯৭৮
২৫. ছবিতে সেকালের জন্তু জানোয়ার-ইরিস ইয়াভলেভা, রাদুগা
২৬. আনাড়ির কান্ডকারখানা- নিকলাই নোসভ ১-১৭, রাদুগা ১৯৮৪-১৯৯০
২৭. আলতাজবা- সের্গেই আকসাকভ, রাদুগা ১৯৮৬
২৮. গল্প ও রূপকথা- কনস্তান্তিন উসিনস্কি, রাদুগা
২৯. পাখনায় গান গায়- ভাসিলি সোকমলিনস্কি
৩০. রাঙাপাল- আলেক্সান্দও গ্রীন, রাদুগা
৩১. পৃথিবী কি গোল- আনাতোলি এমিলিন
৩২. শিকারিবাজ- লতিফ মাহমুদুভ
৩৩. উস্কুখুস্কু চড়াই- কনস্তান্তিন পাউস্তুপস্কি
৩৪. মহাবিশ্বের কথা- ফেলিক্স ক্সিভিন
৩৫. রুশ ইতিহাসের কথা ও কাহিনী- সের্গেই আলেক্সেয়েভ
৩৬. তলিয়া ক্লুখভিনের এ্যডভেঞ্জার- নিকলাই নোসভ
৩৭. সার্কাসের ছেলে ও অন্যান্য গল্প-(কুপ্রিন, দস্তইয়েভস্কি, তলস্তয়ের গল্প)
৩৮. মানুষ কী করে বড় হলো-ইলিন ও সেগাল
৩৯. ওরাও কথা বলে- ইউরি দমিত্রিয়েভ
৪০. কালোখাতা ও সামব্রানিয়া- লেভ কাস্সিল
৪১. নাম ছিল তার ইভান- ভ্লাদিমির ভাসলভ
৪২. ধলা কুকুর ও শ্যামলা কান- গাব্রিয়েল ক্রয়েপালস্কি
৪৩. কোন সে দেশের কোন সাগরের পাওে (রুশি লেখকের লেখা রূপকথা)
৪৪. সাগরতীরে- নিকলাই দ্যুভোপ
৪৫. দুই ইয়ারের যতকাণ্ড-সিয়েভলদ নেস্তাইকো
৪৬. চিড়িক পিড়িক চড়ুই- মাক্সিম গোর্কি

Saturday, 24 October 2015

লোক গানের নাইয়া আব্বাসউদ্দিন

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ইন্টারনেটের কানাগলি

অক্টোবর ২৩, ২০১৫
Dr. Md. Zafar Iqbalপ্রায় বিশ বছর আগে আমি যখন প্রথমবার দেশে ফিরে এসেছিলাম, তখন যে বিষয়গুলো নিয়ে ধাক্কা খেয়েছিলাম তার একটি ছিল, টেলিফোন। আমেরিকায় সবার বাসায় টেলিফোন এবং সেই টেলিফোন নিখুঁতভাবে কাজ করে। আমাদের দেশে টেলিফোন বলতে গেলে কোথাও নেই। আর যদিও-বা থাকে, সেগুলো কখনও ঠিকভাবে কাজ করে না। তারপরও যার বাসায় টেলিফোন আছে, তাদের অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। তবে তার একটা যন্ত্রণাও আছে, আশেপাশের সব বাসা থেকে লোকজন টেলিফোন করতে চলে আসে। যারা একটু ছোটলোক ধরনের মানুষ, তারা টেলিফোনের ডায়ালের অংশটুকুতে তালা মেরে রাখত– ফোন রিসিভ করা যেত কিন্তু ফোন করা যেত না।
শুধু যে টেলিফোন ছিল না তা নয়, মনে হয় টেলিফোনের তারও ছিল না। কারণ একই টেলিফোনের তার দিয়ে একাধিক মানুষ কথা বলত এবং তার নাম ছিল ‘ক্রস কানেকশান’। প্রায়ই টেলিফোন করতে গিয়ে আবিস্কার করতাম, ইতোমধ্যে সেই টেলিফোনে অন্য কেউ কথা বলছে। তখন অনুরোধ করা হত, ‘ভাই, আপনারা টেলিফোনটা একটু রাখেন, আমরা একটু কথা বলি’। অবধারিতভাবে অন্য দুইজন বলত, ‘আপনারা রাখেন, আমরা কথা বলি’। ঝগড়া-ঝাঁটি, মান-অভিমান সবই হত।
শুধু যে বাসায় টেলিফোন ছিল না তা নয়, পাবলিক টেলিফোনও বলতে গেলে ছিল না। আমার মনে আছে, আমাদের ক্যাম্পাসে শুধু একটা একাডেমিক বিল্ডিংয়ের সামনে একটা কার্ড ফোনের বুথ ছিল। টাকা দিয়ে কার্ড কিনে সেই কার্ড ঢুকিয়ে ফোন করতে হত। প্রায় সময়েই ফোনের কানেকশন হত না, কিন্তু টেলিফোন বুথ নির্দয়ভাবে কার্ড থেকে টাকা কেটে নিত। দুই পক্ষই দুই পাশ থেকে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলে চিৎকার করছি, কেউ কারও কথা শুনছি না। কিন্তু এই ফাঁকে ঠিকই কার্ড থেকে পুরো টাকা উধাও হয়ে গেছে!
এখন সেই সময়কার কথা মনে হলে নিজেরাই আপন মনে হাসি। আমার মনে হয়, এখন প্রায় বাসাতেই যতজন মানুষ তার থেকে বেশি টেলিফোন। এক সময় টেলিফোন দিয়ে আমরা শুধু কথা বলতাম। এখন যতই দিন যাচ্ছে টেলিফোনে কথা বলা কমে অন্য কাজকর্ম বেড়ে যাচ্ছে। আমরা টেলিফোনে এসএমএস পাঠাই ইংরেজিতে বাংলা লিখে। সবার এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে, আমি রীতিমতো আতঙ্কে থাকি যে কোনো এক বই মেলায় আমি দেখব কেউ একজন ইংরেজিতে বাংলা লিখে একটা বই বের করে ফেলেছে। জনতাকে অবশ্য সে জন্যে দোষ দেওয়া যায় না। আজকাল দেখছি সরকারও ইংরেজিতে বাংলা লিখে নানা ধরনের বিজ্ঞপ্তি পাঠাচ্ছে!
আমার মনে হয়, টেলিফোনে এসএমএস পাঠানোর পর পরই যে কাজটা করা হয় সেটি হচ্ছে, ছবি তোলা। কয়েকজন মানুষ একত্র হয়ে গল্প-গুজব করছে, চা-নাস্তা খাচ্ছে, এই পরিচিত সামাজিক দৃশ্যের মাঝে অবধারিতভাবে এখন নূতন একটি দৃশ্য যোগ হয়েছে; সেটি হচ্ছে, একজন তার মোবাইল বের করে ছবি তুলছে। এক সময় মানুষ যত্ন করে ছবি তুলত; এখন ‘সেলফি’ নামক ছবি তোলার এই বিচিত্র পদ্ধতি আবিস্কৃত হওয়ার পর যত্ন করে ছবি তোলার বিষয়টাই উঠে গেছে।
[‘সেলফি’ ছবি তোলার যে একটা সামাজিক মান-মর্যাদার বিষয় আছে, আমি সেটা জানতাম না। একজন কমবয়সী ছেলে আমার সঙ্গে সেলফি তুলতে চাইতেই কাছে দাঁড়ানো একজন বড় মানুষ এই ‘বেয়াদবি’ করার জন্যে তাকে রীতিমতো ধমক দিয়ে বসেছিলেন।]
কথা বলা এবং ছবি তোলা ছাড়াও এই টেলিফোনে আরও অসংখ্য কাজ করা যায়; আমার মনে হয় না আমি তার তালিকা লিখে শেষ করতে পারব। শুধু তাই নয়, আমি যে কয়টি লিখতে পারব, আমার ধারণা পাঠকরা তার থেকে অনেক বেশি লিখতে পারবেন।
টেলিফোনে যে কয়টি কাজ করা যায় তাতেই সন্তষ্ট থাকারও প্রয়োজন নেই। আমি আমার ছাত্রদের দিয়ে আমার জন্যে পরীক্ষা নেওয়ার একটা ‘অ্যাপ’ তৈরি করিয়ে নিয়েছি। এমসিকিউ ধরনের পরীক্ষা নেওয়ার পর ছাত্রছাত্রীরা উত্তরটা আমাকে এসএমএস করে পাঠায়। আমার টেলিফোন উত্তরটা যাচাই বাছাই করে ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষায় কত পেয়েছে সঙ্গে সঙ্গে সেটাও তাদেরকে জানিয়ে দেয়। এখন আমার পরীক্ষা নিতে ক্লান্তি নেই। আমার ধারণা, যে কোনোদিন আমার ছাত্রছাত্রীরা আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসবে!
তবে টেলিফোনে আজকাল যে কাজটা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে সেটি সম্ভবত ইন্টারনেটে বিচরণ। আজকের লেখাটি এই বিষয় নিয়ে এবং এতক্ষণ আসলে এই কথা বলার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছি।
২.
মূল বক্তব্যে যাবার আগে সবাইকে একটি বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া যাক; সেটি হচ্ছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির মাঝে পার্থক্য। পরমাণুর কেন্দ্রে যে নিউক্লিয়াস থাকে তার মাঝে বিশাল একটা শক্তি জমা থাকতে পারে, এই তথ্য হচ্ছে জ্ঞান কিংবা বিজ্ঞান। এই শক্তি ব্যবহার করে চোখের নিমিষে লক্ষ লক্ষ মানুষ মেরে ফেলার জন্যে যে নিউক্লিয়ার বোমা তৈরি হয়, সেটা হচ্ছে প্রযুক্তি। কাজেই জ্ঞান-বিজ্ঞান খুবই চমৎকার বিষয়। এর মাঝে কোনো সমস্যা নেই।
আমরা কিন্তু কখনও প্রযুক্তির ব্যাপারে এ রকম ঢালাওভাবে সার্টিফিকেট দিতে পারব না। ভালো প্রযুক্তি যে রকম আছে, ঠিক সে রকম অপ্রয়োজনীয়ম এমনকি খারাপ প্রযুক্তিও আছে। কাজেই নূতন একটা প্রযুক্তি দেখলেই সেটা নিয়ে গদগদ হয়ে যাওয়ার অভ্যাস আমাদের ছাড়তে হবে। যে কোনো নূতন একটা প্রযুক্তি দেখলেই রীতিমতো ভুরু কুঁচকে সেটাকে যাচাই-বাছাই করে নেওয়া মোটেও প্রাচীনপন্থীর কাজ নয়, রীতিমতো বুদ্ধিমানের কাজ।
এর সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হচ্ছে কম্পিউটার। আমাদের সবচেয়ে সস্তা মোবাইল টেলিফোনেও একটা কম্পিউটার আছে। আবার যে মহাকাশযানটি সেই প্লুটোর কাছে হাজির হয়ে তার ছবি তুলে পাঠাচ্ছে, তার ভেতরেও একটা কম্পিউটার আছে। এই অসাধারণ একটি প্রযুক্তি আসলে আমাদের পুরো সভ্যতাটাই নূতন করে সাজিয়ে দিয়েছে। কোনো মানুষ যদি ঠিক করে যে, সে কম্পিউটার ব্যবহার না করেই তার জীবনটা কাটিয়ে দেবে, আমার ধারণা তার জীবন আক্ষরিক অর্থে আটকে যাবে।
অথচ আমি একজন মাকে জানি যিনি কম্পিউটার দেখলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কারণ তার সন্তান কোনো বিশ্রাম না নিয়ে টানা কয়েক দিন, একসঙ্গে কম্পিউটার ব্যবহার করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা গেছে। এটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং নিষ্ঠুর একটি উদাহরণ। আমরা জানি সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ নিরাপদে কম্পিউটার ব্যবহার করে সব রকম কাজকর্ম করে যাচ্ছে এবং সে জন্যেই এই উদাহরণটি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কারণ এটি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে, খুবই নিরীহ এবং নিরাপদ একটা প্রযুক্তি নিয়ে বাড়াবাড়ি করেও ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলা যায়। এ রকম উদাহরণ অনেক আছে।
আমাদের দেশ যেহেতু প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা একটি দেশ, তাই আমরা যে কোনো নূতন প্রযুক্তি দেখলেই একেবারে গদগদ হয়ে যাই। সে কারণে দেশে যখন নূতন কম্পিউটার এসেছে, আমরা সেটা আমাদের নূতন প্রজন্মের হাতে তুলে দেবার জন্যে খুবই ব্যস্ত ছিলাম।
কম্পিউটারের নামটা দেখেই বোঝা যায় এর জন্ম হয়েছিল ‘কম্পিউট’ বা হিসেব করার জন্যে। কিন্তু এই যন্ত্রটি এতই বিচিত্র যে, এটি দিয়ে কী কাজ করা যাবে সেটি সীমিত হতে পারে শুধুমাত্র মানুষের সৃজনশীলতা দিয়ে। সৃজনশীলতা যে সব সময় সঠিক রাস্তায় যায়, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কাজেই আমরা আবিস্কার করেছি, এই দেশে নূতন প্রজন্মের কাছে কম্পিউটারের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হয়ে গেছে ‘কম্পিউটার গেম’। প্রযুক্তির প্রতি আমাদের এতই অন্ধবিশ্বাস যে, বাবা-মা যখন দেখেছেন, তাদের ছেলেমেয়েরা সব কাজকর্ম ফেলে দিন-রাত কম্পিউটারের মনিটরে মুখ গুঁজে পড়ে আছে, তখন তারা দুশ্চিন্তিত না হয়ে আহলাদিত হয়ে উঠতে শুরু করেছেন। আমি অন্তত একটি শিশুর বাবা-মায়ের কথা জানি, যারা তাদের শিশুটিকে কম্পিউটারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পুরোপুরি একটি অসামাজিক জীব হয়ে বড় হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অহংকার করেন।
কম্পিউটার এসে আমাদের অনেক শিশুর জীবনকে মোটামুটি জটিল করে তুলেছিল। ইন্টারনেট আসার পর তার সঙ্গে একটা নূতন মাত্রা যোগ হল।
ইন্টারনেট সম্ভবত আমাদের এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি। আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়, আমি কত বড় সৌভাগ্যবান যে, নিজের চোখে এই প্রযুক্তিটি জন্ম নিতে এবং বিকশিত হতে দেখেছি। আমরা সবাই জানি, এক সময় এই দেশের কিছু কর্তা ব্যক্তি আমাদের দেশে যেন ইন্টারনেট আসতে না পারে তার জন্যে চেষ্টা করেছিলেন। দেশের তথ্য পাচার হয়ে যাবার ভয়ে তারা সাবমেরিন ফাইবারের যোগাযোগ নিতে রাজি হননি!
এই চরিত্রগুলোর নাম এবং পরিচয় জানার আমার খুব কৌতূহল হয়। আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যম তো কত কিছু নিয়েই কত রকম ফিচার করে থাকে। দেশকে পিছিয়ে নেওয়ার কাজে সবচেয়ে অগ্রগামী এই মানুষদের নাম-পরিচয় জানিয়ে একবার একটা ফিচার কেন করে না কেউ?
একটা দেশ প্রযুক্তিতে কতটুকু এগিয়ে আছে তার পরিমাপ করার জন্যে নানা রকম জরিপ নেওয়া হয়। এর একটা পরিমাপ হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং খুবই স্বাভাবিক কারণে আমাদের এই সংখ্যাটি অন্যান্য দেশের তুলনায় ছিল খুবই কম। ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্যে একটা কম্পিউটার বা ল্যাপটপের দরকার হত। এই দেশের আর কতজন মানুষের কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপ কেনার ক্ষমতা আছে? শুধু তাই নয়, কম্পিউটার বা ল্যাপটপের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যাপার আছে। সব কিছু শেষ হবার পর আমাদের সেই মিলিয়ন ডলার প্রশ্নটি করতে হয়, ইন্টারনেট ব্যবহার করে কী করা হবে?
মোটামুটি একই সময়ে হঠাৎ করে সবগুলো সমস্যার সমাধান হয়ে গেল! ইন্টারনেট করার জন্যে কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপের দরকার নেই, খুবই স্বল্পমূল্যের স্মার্ট ফোন দিয়েই সেটা করা সম্ভব। ইন্টারনেট সংযোগেরও দরকার নেই; অনেক জায়গাতেই ওয়াইফাই আছে। যদি না থাকে মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে ‘মেগাবাইট’ কেনা যায়। আর ইন্টারনেট দিয়ে কী করা হবে সেই প্রশ্নটি করা হলে সবাই আমাকে ‘বেকুব’ বলে ধরে নেবে। এটি কি এখন কোনো প্রশ্ন হতে পারে? অবশ্যই ইন্টারনেট দিয়ে ফেসবুক করা হবে। জরিপ নিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর শতকরা আশি ভাগ ফেসবুক করে থাকে। ইন্টারনেট এবং ফেসবুক এখন এই দেশে প্রায় সমার্থক শব্দ।
তাই হঠাৎ করে বাংলাদেশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে সাড়ে চার কোটি হয়ে গেছে জানার পরও আমি কেন জানি উল্লাসিত হতে পারছি না। বরং নার্ভাস অনুভব করতে শুরু করেছি। তার কারণ, এর বড় একটা সংখ্যা আসলে কমবয়সী কিশোর-কিশোরী, এমনকি শিশু।
আমি আগেই পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে, আমি ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক নেটওয়ার্কের বিশেষজ্ঞ নই। আমি কখনও কোনো ফেসবুক একাউন্ট খুলিনি। কিন্তু নানা ধরনের মানুষেরা আমার নামে ভুয়া ফেসবুক একাউন্ট তৈরি করে এতই ঝামেলা করতে শুরু করেছিল যে, আমার ছাত্র এবং তরুণ সহকর্মীরা আমার জন্যে একটা ‘অফিসিয়াল’ ফেসবুক একাউন্ট তৈরি করে রেখেছে। এর ভেতরে কী ঘটে না ঘটে আমি দেখি না। তাই ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক নেটওয়ার্কের ভেতর কী ঘটে আমি সেটা জানি না।
কিন্তু অবশ্যই আমি সেটা অনুমান করতে পারি। আমি একবার একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সভায় মঞ্চে বসে আছি। আমার পাশে ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ বসেছেন। হঠাৎ করে তিনি আমাকে বললেন: ‘‘একটা সেলফি তুলি?’’
আমি মাথা নাড়লাম এবং সেই চলমান সভার মাঝখানে তিনি আমার সঙ্গে একটা সেলফি তুলে ফেললেন। আজকাল সেলফি তোলার পর সেটা শেষ হয়ে যায় না। সেটাকে ফেসবুকে দিতে হয় এবং সেই সভায় মাঝখানেই তিনি সেটা ফেসবুকে দিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আবার আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে ফিস ফিস করে বললেন: “এর মাঝে উনত্রিশটা লাইক পড়ে গেছে।”
বলা বাহুল্য, আমি চমৎকৃত হলাম লাইকের সংখ্যা দিয়ে নয়, একজন বয়স্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ মানুষের এই ছেলেমানুষী আনন্দটি দেখে। যদি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বয়স্ক মানুষ লাইকের সংখ্যা দেখে এ রকম বিমলানন্দ পেতে পারেন, তাহলে আমাদের ছোট ছোট কিশোর-কিশোরী বা শিশুরা কী দোষ করেছে? তারা কেন ফেসবুকে লাইকের জন্যে লালায়িত হবে না? কাজেই খুবই সঙ্গত কারণে আমাদের দেশের কিশোর-কিশোরী এবং শিশুরা এই ‘লাইক’ কালচারে ঢুকে গেছে। অন্য সব কারণ ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র অবিশ্বাস্য পরিমাণ সময় নষ্টের কারণে অসংখ্য অভিভাবক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে শুরু করেছেন।
আমাদের দেশে সাড়ে চার কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তার মাঝে কতজন অপরিণত বয়সের ছেলেমেয়ে, আমরা কি সেটা জানি? এই কমবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্যে ইন্টারনেটের জগৎটি কি একটা আলো-ঝলমলে আনন্দের জগৎ নাকি প্রতি পদক্ষেপে লুকিয়ে থাকা গ্লানিময় অন্ধকার নিষিদ্ধ জগৎ? একজন শিক্ষক তার ক্লাসের ছেলেমেয়েদের ইন্টারনেটের অপকারিতা বোঝানোর জন্যে গুগলে একটা বাংলা শব্দ লিখে সার্চ দিয়েছিলেন। এই শব্দটির মতো পুত-পবিত্র, নির্দোষ এবং নিরীহ শব্দ বাংলা ভাষায় দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু সেই শব্দের সূত্র ধরে ক্লাসের বাচ্চা ছেলেমেয়েদের সামনে মাল্টিমিডিয়াতে বাংলা পর্নোগ্রাফির কুৎসিত জগৎ বন্যার পানির মতো নেমে এসেছিল।
আমি নিজে ইন্টারনেটে পত্রিকা পড়তে পড়তে আশেপাশে ক্লিক করে কিছু বোঝার আগেই হিংস্র মানুষের ঘৃণা-ছড়ানো ভয়ংকর সাইটে ঢুকে পড়েছি। বাকস্বাধীনতার নামে এ ধরনের অমানবিক হিংস্র ওয়েবসাইট যে থাকতে পারে আমি সেটা জানতাম না। যদি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা নিজেদের অজান্তেই এ রকম ভয়ংকর ওয়েবসাইটে ঢুকে যেতে পারেন, তাহলে কেউ যখন সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করে, তখন সে কোথায় গিয়ে হাজির হবে সেটি কি চিন্তা করা অসম্ভব?
বিষয়টি যথেষ্ট গুরুতর। খুব কম বয়সে একটা বাচ্চা যদি শিখে যায় যে, নিজের ছবি কিংবা নিজের কর্মকাণ্ডের বর্ণনাতে অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত মানুষের লাইক পাওয়া হচ্ছে জীবনের একমাত্র আনন্দের বিষয়, সে তাহলে পুরোপুরি একটা ভুল মানুষ হয়ে বড় হবে। আমরা শিশুদের শৈশব অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছি। এখন তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের একটা জগৎ, এর চাইতে বড় দায়িত্বহীন কাজ কী হতে পারে?
আমি কোনো সমাধান দেওয়ার জন্যে এই লেখাটি লিখতে বসিনি। খবরের কাগজে একটা কলাম লিখে আমি এর সমাধান দিতে পারব আমি সেটা মনেও করি না। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা বাড়ানোর আগ্রহে আমরা যে আমাদের দেশে অসংখ্য বাচ্চাদের সময়ের আগেই একটা বিপজ্জনক জায়গায় ঠেলে দিয়েছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমি মাথায় থাবা দিয়ে ‘হায় হায়’ করে মাতম করতেও রাজি নই। ইন্টারনেট একটা অবিশ্বাস্য শক্তিশালী প্রযুক্তি, এটাকে দায়িত্ব নিয়ে ব্যবহার করে ম্যাজিক করে ফেলা সম্ভব। আমি তাই সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই পুরো বিষয়টাকে নিয়ে নূতন করে ভাবার সময় হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার সময় হয়েছে। দেশের বড় বড় হর্তা-কর্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হয়েছে। জ্ঞানী-গুণী মানুষদের চিন্তা করার সময় হয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো কীভাবে এই সমস্যার সমাধান বের করেছে সেগুলো খুঁজে দেখার সময় হয়েছে।
আমরা শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে চাই। তাদেরকে প্রাপ্তবয়স্কদের একটা জগৎ উপহার দিতে চাই না। ইন্টারনেটের কানা গলিতে তাদের হারিয়ে ফেলতে চাই না।


মুহম্মদ জাফর ইকবাল:
 লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Tuesday, 20 October 2015

লালন ও আব্বাসউদ্দিনকে স্মরণ 

 0
ফকির লালন শাহ ও মরমি শিল্পী আব্বাসউদ্দিনকে স্মরণ করেছে বাংলাদেশ লোকসংগীত পরিষদ। লালন সাঁইজির ২৪১তম জন্মবার্ষিকী ও আব্বাসউদ্দিনের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন। দ্রুত দাদরা তালে লালনের ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি’ কাহারবা তালে আব্বাসউদ্দিনের ‘নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে’ এই দুটি গানের সমবেত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে স্মরণানুষ্ঠানের সূচনা ঘটে। এরপর লালন ও আব্বাসউদ্দিনের গানের একক পরিবেশনায় অংশ নেন- সোমা সরকার, আবদুুল আজিজ, ফাইরুজ নাওয়ার কাঁকন, অনঙ্গ মোহন রাজবংশী, নাসরীন হায়াত, তাবাসসুম রিয়া, হরিমঙ্গল দাশ, নাসরিন ফেরদৌস চমন, সেলিনা আলম, সাবিনা ইয়াসমিন, রিয়াদ হাসান, মফিজুর রহমান বিরহী, লুৎফুন নাহার মনিরা ও ড. আবুল কালাম আজাদ। ‘যেখানে সাঁই বারামখানা, মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, গুরু পদে নিষ্ঠা মন যার হবে, আমার ঘরখানায় কে, তিন পাগলে হলো মেলা, ও মন গুরু ভজলে সাঁইজির অমিয় বাণীর কথা ও সুরের এমন গানে মিলনায়তন হয়ে ওঠে লালনময়। মুহুর্মুহু করতালি ও আনন্দ-উল্লাসে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানায় মিলনায়তন পরিপূর্ণ লালনভক্তরা। পিনপতন নীরবতায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো সাঁইয়ের সুরে অবগাহন করে সাঁইজির প্রেমে হারিয়ে যান লালনভক্তরা। অন্যদিকে মরমি শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের মরমি গানের পরিবেশনায় সুরের অনুরণন  তৈরি হয় লোকসংগীতপিয়াসীদের হৃদয়ের তন্ত্রীতে। লালনের পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে পরিবেশিত হয় মরমি শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের ‘আমার হাড় কালা করলিরে, আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলি, ওরে ও পরানের মাঝি, ঐ না রূপে নয়ন দিয়ে, থাকতে পার ঘাটাতে, ও যার আপন খবর, ফাঁন্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে, নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে ইত্যাদি গান। প্রতিটি পরিবেশনার পরই মিলনায়তন প্রকম্পিত করতালিতে শিল্পীদের আন্তরিকতা মিশ্রিত অভিনন্দন জানায় আব্বাসউদ্দিনের ভক্তানুরাগীরা। এর আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তৃতা করেন লালন স¤্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন ও নজরুল গবেষক সংগীত শিল্পী ড. নাশিদ কামাল। শিল্পকলায় মঞ্চস্থ কণ্ঠশীলনের ‘যা নেই ভারতে’ : শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল থিয়েটার হলে গতকাল সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘যা নেই ভারতে’। মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে বর্তমান সময়কে ধারণ করে কন্ঠশীলনের ভিন্নধর্মী নাটকটি মনোজ মিত্র রচিত। এই নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন মীর বরকত। মহাভারত আশ্রয় করে রচিত হলেও ‘যা নেই ভারতে’ নাটকে নাট্যকার গোটা ঘটনাপ্রবাহকে একটু অন্যরকমভাবে বর্ণনা করতে চেয়েছেন। কুরুবংশের রানি তথা হস্তিনাপুরীর রাজবাড়ির বধূদের কেউ স্বেচ্ছায় মাল্যদান করেনি। ভীষ্ম যুদ্ধ করে তার ভাই বিচিত্রবীর্যের হাতে তুলে দেন দুই নারী অম্বিকা ও অম্বালিকাকে। কারণ তিনি বিবাহ করবেন না। কিন্তু ভাই তরুণ বয়সে মারা যান। দেখা দেয় অস্তিত্বের সঙ্কট বংশরক্ষায়। ভীষ্ম অম্বিকাকে অনুরোধ করেন পুত্রসন্তান ধারণ করতে। অম্বিকার আকাক্সক্ষা তিনি ভীষ্মের সন্তানের মা হতে চান। ভীষ্মের বক্তব্য তিনি প্রতিজ্ঞাভ্রষ্ট হবেন না। নারীকে সেই পুরুষের ইচ্ছার কাছে নতজানু হতে হয়। পুরুষের আদেশে, তার বিছানায় যাকে পাঠানো হবে তাকেই গ্রহণ করতে হবে। ব্যাসদেবের সঙ্গে অম্বিকার বলপূর্বক মিলন হয়। সে মিলনে ব্যাসদেবের প্রতি না তাকানোয় জন্ম হয় অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের। অম্বালিকার সঙ্গে মিলনে জন্ম নেন পা-ু। দাসীর গর্ভে জন্মান বিদুর। ব্যাসদেব এদের সবার পিতা। গল্প এগিয়েছে এমনভাবেই মহাভারতের মূল কাহিনির শরীর ছুঁয়ে। নাটকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আবদুর রাজ্জাক, একেএম শহীদুল্লাহ কায়সার, সোহেল রানা, সালাম খোকন, অনন্যা গোস্বামী, জেএম মারুফ সিদ্দিকী, নিবিড় রহমান, কামরুল হাসান, রাজিয়া সুলতানা মুক্তা, তনুশ্রী গোস্বামী, নাজনীন আক্তার শীলা, তাসাউফ-ই-বাকি বিল্লাহ রিবিন, সুমন কুমার দে, তৃপ্তি রানী ম-ল, ফারিয়া আক্তার সোমা, শামীম রিমু, মাহমুদুল হাসান, শাহানা রহমান, মেহেরুন্নেছা অনীক, শরীফ আবদুল ওয়াহাব, রুহুন ওয়াসাতা, অমিতাভ রায়, অনুপমা আলম, প্লাবন রব্বানী, আফরিন খান, মিজানুর রহমান চৌধুরী মিশন, রুবেল প্রমুখ।  

Sunday, 18 October 2015

শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং অবিভক্ত বাংলাদেশ
-এমাজউদ্দীন আহমদ
অন্নদাশঙ্কর রায় পশ্চিমবঙ্গের একজন খ্যাতনামা লেখক ও বুদ্ধিজীবী। অখণ্ড ভারতের অন্যতম প্রবক্তা, ধর্মনিরপেক্ষতার এবং বাঙালি সত্তার প্রচারক। সেই বাঙালি সত্তার প্রচারককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘বাঙালিদের এই রাষ্ট্রে (বাংলাদেশে) পশ্চিমবঙ্গ কেন যোগ দেয় না? তা হলে তো ২০ কোটি বাঙালি এক হয়ে যুক্তবঙ্গ রচনা করত। সেটা কি আপনারা চান না? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘যুক্তবঙ্গ যদি ভারতের বাইরে হয়, তবে পশ্চিমবঙ্গ তাতে রাজি হবে না, কারণ আপনারা যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, আমরাও তেমনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়েছি। পরে সংবিধান রচনা করি। সে সংবিধানে বিচ্ছিন্নতা নিষেধ।’ এরপরও তিনি বলেছেন, ‘তা ছাড়া বাংলাদেশ এখন মুসলিম বাংলা। বিশ্ব মুসলিম সম্মিলনীর (Organisation of Islamic Conference-OIC) সদস্য’ তার সাথে যোগদান অসম্ভব; তিনি অবশ্য বলেননি, ভারতের ভেতর হলে পশ্চিমবঙ্গ কী করবে। বাংলাদেশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে নিশ্চয় অন্নদাশঙ্কর রায়ের কোনো আপত্তি থাকবে না, তা ধরে নেয়া যায়, যেমন নেই লালকৃষ্ণ আদভানিদের, নেই আরএসএস এবং শিবসেনা পরিবারের নেতৃবৃন্দের।
এ দেশের হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত কিছু বুদ্ধিজীবীর সুখ-সুষুপ্তিও অবশ্য এ ধরনের। কথাগুলো বলছি এ জন্য যে, অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতো খ্যাতনামা লেখকের চিন্তা-ভাবনায় দেখা যায় একধরনের পীড়াদায়ক সঙ্কীর্ণতা। ‘মুসলিম বাংলার’ জনগণের ইতিহাস যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেই সীমিত। এর বাইরে কোথাও ইতিহাসের কোনো পর্যায়ে, এদের কার্যক্রমের যেন কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। স্বাধীনতা অর্জনের পরে তারা বাংলাদেশকে নাকি ‘মুসলিম বাংলায়’ পরিণত করেছেন। বাংলাদেশকে ওআইসির সদস্য বানিয়েছেন। কিন্তু ভারত? ভারত, তাদের ভাবনায়, রূপান্তরিত হয়েছে এক বিশ্বজনীন এককে, যেখানে ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সঙ্ঘ পরিবারের সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ, মৌলবাদী গোষ্ঠী। তা-ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে। যা হোক, এসব কথা বলছি এ জন্য যে, ভারত বিভাগের সার্বিক গতিসূত্রের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে যদি অন্নদাশঙ্করের মতো রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ১৯৪৭ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো রাজনৈতিক নেতা বাংলাকে অবিভক্ত রাখার জন্য কী কী প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন, তা একবার স্মরণে আনতেন। এসব কথা অবশ্য তারা স্মরণ করবেন না, কেননা তা হলে তারা নিজেদের সঙ্কীর্ণতা, ভেদবুদ্ধি ও ধর্মান্ধতার গাঢ় অন্ধকারে নিজেদের অস্পষ্ট চেহারা দেখে ভয়ে আঁতকে উঠতে পারেন। বাংলাদেশকে ‘মুসলিম বাংলা’ বলে হেয় করবেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গকে ‘হিন্দুবঙ্গ’ বলতে তারা নারাজ।
অবিভক্ত বাংলার জননন্দিত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের ২৭ এপ্রিল এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘বাংলাকে যদি বৃহৎ বা মহৎ হতে হয়, তা হলে তাকে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে হবে। তার নিজস্ব সম্পদ, নিজস্ব আর্থিক সঙ্গতির ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদের পীড়ন থেকে মুক্ত হতে হবে।’ (If Bengal is to be great, it can only be so if it stands on its own legs... It must be a master of its own resources and riches and its own destiny... It must cease to be exploited by others)। এরও মাসখানেক আগে, ১৯৪৭ সালের ১৭ মার্চে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বলেছিলেন, ‘বাংলা বাঙালিদের এবং বাংলা অবিভাজ্য’ ("Bengal belongs to Bengalees and Bengal is indivisible". Star of India, 18 March 1947.")
বাংলা অবিভক্ত থাকলে একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যে বিশ্বসভায় মহত্তর অবস্থানে অধিষ্ঠিত হবে, সে সম্পর্কে ২৭ এপ্রিল বিবৃতিতে সোহরাওয়ার্দী বলেন, ‘সত্যিই এটি (স্বাধীন বাংলাদেশ) একটা মহারাষ্ট্ররূপে আবির্ভূত হবে এবং ভারতবর্ষে সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ ও অগ্রগতিসম্পন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এ রাষ্ট্রে জনগণের জীবনমান হবে উন্নততর এবং জাতি হিসেবে তা অর্জন করবে সর্বোচ্চ স্থান। প্রাচুর্যে ভরা এই ভূমিতে কৃষির উন্নতি হবে সর্বাধিক। শিল্প-বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে সন্তোষজনক। কালে এই রাষ্ট্রটি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও প্রবৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।’ (It will be a great great country indeed, the richest and the most prosperous in India, capable of giving to its people a high standard of living, where a great people will be able to rise to the fullest height of their stature, a land that will truly be plentiful. It will be rich in agriculture, rich in industry and commerce and in course of time will be one of the most powerful and progressive states in the world."।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শুধু বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তার আবাস, কলকাতার ৪০ নং থিয়েটার রোডে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস দলের নেতৃবৃন্দের এক বৈঠকে সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়া রচনার জন্য যৌথ কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই কমিটির সদস্য ছিলেন মুসলিম লীগ থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিজে, খাজা নাজিমুদ্দীন, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, কুষ্টিয়ার ডা: এ এম মালিক, ঢাকার ফজলুর রহমান এবং লীগ সম্পাদক আবুল হাশিম। কংগ্রেস ও হিন্দু সম্প্রদায় থেকে এই কমিটিতে সদস্য মনোনীত হন শরৎচন্দ্র বসু, কিরণ শঙ্কর রায়, নলিনী রঞ্জন সরকার এবং সত্য রঞ্জন বকশী (আবুল হাশিম, In Retrospect, 1998, পৃষ্ঠা ১৬৫)। শুধু সোহরাওয়ার্দী কেন, খাজা নাজিমুদ্দীনও বলেন, ‘এটি আমার সুচিন্তিত অভিমত যে, মুসলিম হোক অথবা অমুসলিম হোক, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা জনগণের স্বার্থে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা এবং বাংলার বিভক্তি বাঙালিদের স্বার্থে হবে বিষবৎ’ ("It is my considered opinion that an independent sovereign Bengal is in the best interest of its people whether Muslims or non-Muslims and I am equally certain that partition of the province is fatal to the interest of Bengalees." Ibid)।
যৌথ কমিটি ১৯৪৭ সালের ১৯ মে খসড়া সংবিধান রচনার কাজ সমাপ্ত করলে ২০ মে কলকাতার ১ নম্বর উডবার্ন পার্কে শরৎ বসুর বাড়িতে সেই খসড়া সংবিধানে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার যে রূপরেখা অঙ্কিত হয় তা ছিল নি¤œরূপ :
১. বাংলা হবে এক স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীন বাংলা ভারতের অন্যান্য অংশের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণ করবে। ২. সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীন বাংলার আইন পরিষদ গঠিত হবে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে, যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচিত সদস্য সমন্বয়ে। হিন্দু ও মুসলিম সদস্যদের সংখ্যা নির্ধারিত হবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে। তফসিলি সম্প্রদায়ের আসনসংখ্যাও নির্ধারিত হবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে। ৩. রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন বাংলা ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক স্বীকৃত হলে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে যাবে এবং প্রধানমন্ত্রী ছাড়া সমানসংখ্যক মুসলমান ও হিন্দু (তফসিলি সম্প্রদায়সহ) মন্ত্রী সমবায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন মুসলমান। ৪. নতুন সংবিধান অনুযায়ী আইন পরিষদ এবং মন্ত্রিপরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বিভাগসহ সব কর্মে হিন্দু ও মুসলমানেরা সমান হারে নিয়োগ লাভ করবেন। ৫. সংবিধান রচনার লক্ষ্যে ৩০ সদস্যবিশিষ্ট একটি গণপরিষদ গঠিত হবে। সদস্যদের মধ্যে ১৬ জন হবেন মুসলমান এবং ১৪ জন হিন্দু। প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভা কর্তৃক তারা নির্বাচিত হবেন। ৬. ১৯৪৮ সালের জুন বা তার আগে ব্রিটিশ রাজ স্বাধীন বাংলা সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্রের এই পরিকল্পনার মধ্যমণি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাকে অকৃত্রিম সহায়তা দান করেন শরৎ বসু এবং আবুল হাশিম। এসব তথ্য অন্নদাশঙ্কর রায় জানেন। জানেন আজো অবিভক্ত বাংলা গঠনের সুখ-সুষুপ্তির গোপন স্পৃহা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে যাদের প্রতিক্ষণ তাড়া করে ফিরছে, তারাও। যেসব যুক্তির ভিত্তিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও শরৎ বসু, তার আদর্শিক ভিত্তি সম্পর্কে আবুল হাশিম নিজেই বলেছেন, ‘বাংলার হিন্দু ও মুসলমানেরা তাদের স্বতন্ত্র সত্তা বজায় রেখে যৌথ উদোগে প্রকৃতি এবং ভূমিজ পরিবেশের সাথে পূর্ণ সঙ্গতি রক্ষা করে যে অপূর্ব সাধারণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন মানবিক উৎকর্ষের বিবর্তনে বিশ্বের যেকোনো জাতির অবদানের নিরিখে তা শ্রেষ্ঠতর।’ ('Hindus and Muslims of Bengal preserving their respective entities, had by their joint efforts, in perfect harmony with the nature and climatic influence of their soil developed a wonderful common culture and tradition which compare favourably with the contribution of any nation of the world in the evolution of man.'- Abul Hashim. In Restrospect 160)।
কিন্তু মানবকল্যাণ হিন্দু-মুসলমানদের যৌথ অবদান শ্রেষ্ঠতর হলে কী হবে, অখণ্ড ভারতের প্রবক্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এর কারণও ছিল। সর্বভারতীয় কংগ্রেসের ‘লৌহমানব’ রূপে খ্যাত বল্লভভাই প্যাটেল অবিভক্ত বাংলার পরিকল্পনাকে চিহ্নিত করেছিলেন একটা ‘ধূর্ত কৌশল’ রূপে। ১৯৪৭ সালের ২৩ মে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলার অমুসলিম জনসমষ্টিকে বাঁচানোর জন্য বাংলার বিভক্তিকরণ অপরিহার্য।’ (Bengal has got to be partitioned if the non-Muslim population is to survive')। ১৯৪৭ সালের ২৭ মে News Chornicle পত্রিকার প্রতিনিধি নরম্যান ক্লিফকে (Norman Cliff) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু বলেছিলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলার (অখণ্ড বঙ্গদেশের) স্বাধীনতার অর্থ হলো, বাংলায় মুসলিম লীগের আধিপত্য।’ তিনি আরো বলেন যে, স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা ভারতে বিভাজনমুখী ‘বলকান প্রক্রিয়ার সূচনা করবে’ (invite Balkanisation of India) এবং ‘বহু উলস্টার তৈরি করবে’ (Create many Ulsters')। স্বাধীন বাংলা পরিকল্পনা সম্পর্কে গান্ধীর প্রতিক্রিয়া ছিল আরো অদ্ভূত। আবুল হাশিম যখন এই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিকের ব্যাখ্যা দিয়ে মহাত্মার সমর্থন আদায়ের জন্য সোদপুর আশ্রমে যান, তখন তিনি আবুল হাশিম সাহেবকে প্রশ্ন করেছিলেন, সমগ্র বাংলায় যদি সাধারণ সংস্কৃতি বিদ্যমান থেকে থাকে, যা রবীন্দ্রনাথে প্রতিফলিত ও মূর্ত, তা হলে সেই সংস্কৃতি শুধু বাংলায় কেন, তা তো সমগ্র ভারতে রয়েছে। কেননা এর মূল উপনিষদে নিহিত। এই প্রেক্ষাপটে স্বাধীন বাংলা কি স্বেচ্ছায় ভারতের সাথে মিলিত হবে? (In Restrospect, p167)। বাংলার সংস্কৃতি যে শুধু উপনিষদভিত্তিক নয়, তা মহাত্মাকে কে বোঝাবে?
মুসলিম লীগের সদস্য হয়ে এবং মুসলিম লীগের দাবি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিকল্প হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার পরিকল্পনাকারী, সোহরাওয়ার্দী যে মহল থেকে ভয়ের আশঙ্কা করেছিলেন সেই মহল অর্থাৎ মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিন্তু এই পরিকল্পনায় সাগ্রহে সায় দিয়েছিলেন। তার নিজের কথায়, ‘আমি আনন্দিত হবো। কলকাতা ছাড়া বাংলার আর কী মূল্য রয়েছে? তারা বরং সম্মিলিত থাকুক। স্বাধীন হোক। আমি নিশ্চিত, তারা আমাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবেন।’ ('I should be delighted. What is the use of Bengal without Calcutta? They had much better remained united and independent. I am sure that they would be on friendly terms with us.' The Transfer of power. XP451, 26 April 1947)। কিন্তু জিন্নাহ চাইলে হবে কী, বর্তমানে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দলের অন্যতম প্রধান গুরু এবং হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১৯৪৭ সালের ২ মে ভারতের গভর্নর জেনারেলকে লেখা এক পত্রে বলেন, ‘যেকোনো অবস্থায় আমরা ভারতের অবশিষ্ট অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারি না এবং যে বিষয়ে (অখণ্ড বাংলা) কোনো বিবেচনায় আমরা কোনোরূপ সমঝোতার জন্য প্রস্তুত নই।’ ('We do not in any case want to be cut off from the rest of India and we are not prepared to make any compromise on this issue on any consideration whatsoever.' Ibid, p 555-6)। তাই তিনি হিন্দুদের স্বতন্ত্র ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, জীবনব্যবস্থা ও আচার রক্ষার জন্য স্বাধীন বাংলার বিরুদ্ধে অদম্য এক আন্দোলন গড়ে তুললেন এবং বাংলায় হিন্দুদের আবাসভূমির দাবিতে (Homeland for the Hindus) পশ্চিমবঙ্গ প্রতিষ্ঠার স্লোগান তোলেন।
হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা ছাড়াও ওইসব নেতার চিন্তায় ছিল পূর্ব বাংলা এবং পূর্ব বাংলার মানুষ সম্পর্কে একধরনের তাচ্ছিল্যভাব। মুখার্জির কথায়, ‘বাংলা যদি পাকিস্তান হয়ে যায়, বাংলার হিন্দুরা তখন স্থায়ীভাবে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। যেভাবে হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু সমাজের ওপর আক্রমণ চলেছে, তা বিচার করলে তখন বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতির সমাপ্তি ঘটবে। কিছু নিম্নবর্ণের হিন্দুর ইসলাম গ্রহণের ফলে সৃষ্ট, মুসলমানদের খুশি করতে গিয়ে প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতির বলি দেয়া হবে।

Saturday, 17 October 2015


শমীন্দ্র ঘোষ › বিস্তারিত পোস্টঃ

বাঙালি স্বপূর্বপুরুষের খুনি-দুর্গাপূজক

১৬ ই অক্টোবর, ২০১৫ ভোর ৪:২৪

দুর্গাপূজা বাঙালির প্রধান উত্‍সব ও সামাজিক উত্‍সব -- প্রচারটা চলছে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও বহু শিক্ষিত বাঙালির দ্বারা। রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণে এবং পৃষ্ঠপোষক কর্পোরেট ফাণ্ডিং-এর কল্যাণে এখন এটা হুজুকে মাত্রাছাড়া!
আবেগপ্রবণরা, ধান্দাবাজরা হুজুকে মাতুক। আমরা বরং সত্যটা জেনে নেই,
আসুন--
বাঙালির প্রায় অর্ধাংশ অ-হিন্দু। পশ্চিমবঙ্গেও সব বাঙালি হিন্দু নয়। তাই দুর্গাপূজাও সব বাঙালির নয়। বরং হিন্দুদের বা হিন্দুবাঙালির পূজা। তাই নয় কি?
দুর্গাপূজাটাকে সামাজিক বলে প্রচার চালাচ্ছে উগ্রহিন্দুবাদী ও রাজনৈতিক দলও। এখন অনেক মুসলমানও বাধ্য হয়ে এই পূজাতে অংশ নেয়। যেন 'টকের ভয়ে পালিয়ে গিয়ে তেঁতুলতলায় বাস'! তবু তারা এভাবেই ইসলামবিরোধী।
বঙ্গসমাজে আছে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, উপজাতিধর্ম সরণা, ইহুদি, পার্শী প্রভৃতি ধর্মের মানুষ। এদের সিংহভাগই বাংলাভাষী এবং সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিই। এরাও অংশ নিতে বাধ্য হয়। বাংলার জনসমাজ শুধু হিন্দুদের দ্বারা গঠিত নয়। তাই, এই পূজা সার্বিক সামাজিকও নয়। তাই নয় কি?
এরপরও বাঙালি নাস্তিক-ধর্মহীন-যুক্তিবাদী-মানবতাবাদীরা আছে বঙ্গভূমে। তাই, দুর্গাপূজা বাঙালির এবং সামাজিক পূজা ও উত্‍সব কিছুতেই হতে পারে না। বরং তা শুধুমাত্র হিন্দুদের পূজা।

ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে হয় অনেক সময়। এখন শিবানীর গীত গাইতে হবে দুর্গা ভানতে। তাই, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস গবেষণায় প্রাপ্ত নতুন তথ্য জানাচ্ছি।
প্রগ্বৈদিক ধর্ম দেবীপ্রধান। নারীকে সৃজনীশক্তির আধার ভেবে উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসে পূজা শুরু।
বৈদিকধর্মে নারী পূজিতা নয়। এরা পুরুষ দেবতার সঙ্গীনী। ঋগ্বেদে দুর্গা নেই। দুর্গা পৌরাণিক। বৈদিক ও প্রাগ্বৈদিক ধর্মসংশ্লেষে হিন্দুধর্মের উত্‍পত্তির চরম পর্যায়ে দুর্গার আমদানি করে বৈদিকরা। সংশ্লেষের শুরু প্রাগ্বৈদিক বিষ্ণুকে ঋগ্বেদে অন্তর্ভূক্ত করে বৈদিক ছাপ দিয়ে। নামটা বৃষ্ণি থেকে বিষ্ণু। এরপর শিবকে বৈদিক রুদ্রর সঙ্গে সমীকরণ করে। রুদ্রও ঋগ্বেদে নবীন, শেষের দিকের।
চরম পর্যায়ে প্রাগ্বৈদিক দেবীদের বৈদিকরা স্বীকৃতি দিতে থাকে নাম রূপ কর্ম ইত্যাদি নিজেদের ছক মতো পরিবর্তন সমীকরণ করে করে। ততদিনে ঋগ্বেদের ইন্দ্র, মিত্র, অগ্নি, বরুণ, বায়ু, পর্জন্য প্রভৃতি পুরুষ দেবতারা পিছু হটেছে। এই অভাব পূরণে এল প্রাগ্বৈদিক দেবীরা। কারণ, জয় করতে হবে অজেয় অগম্যভূমি নারীপূজক পূর্বভারতকে। দ্বারবঙ্গ থেকে কিরাতভূমি হলো বঙ্গভূমি। চলছে বৈদিক তথা হিন্দুভক্ত গুপ্তযুগের শাসন। তখন এঅঞ্চলে সমাজের সঙ্গে ধর্ম সম্পৃক্ত, জ্যোতিষে আক্রান্ত। ব্যক্তি সমাজবদ্ধ, ধর্মভীরু। আর্থসমাজ দুর্বল হচ্ছে। গোদের উপর বিষফোঁড়া প্রবল নাস্তিক্যবাদ। তখনই দুর্গা ও তার সঙ্গে সমীকরণ করে বহুদেবী এল পুরাণে; বাসন্তী, চণ্ডী, পার্বতী, গৌরী, মহালক্ষ্মী, কালী, বিন্ধ্যবাসিনী, পার্বতী ইত্যাদি। আরও পরে মনসা, শীতলা, পর্ণশবরী, চণ্ডিকা, বাশুলী ইত্যাদি এলো মঙ্গলকাব্য যুগে। এই চণ্ডীর সঙ্গে দুর্গাকে সমীকরণ করা হয়েছিল পুরাণে।
মঙ্গলকাব্য যুগ একদিকে বৈদিক ও প্রাগ্বৈদিক সংশ্লেষের শেষ পর্যায়; যেখানে হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। এবং হিন্দু-মুসলিম সংশ্লেষ শুরুর পর্যায়; যা যুক্তসাধনা। এখানে এল ওলাবিবি, বনবিবি, কালুপীর, ধর্মগাজন, সত্যপীর ইত্যাদি। এই সত্যপীর শেষে হলো সত্যনারায়ণ। এভাবে ধর্মীয় সংশ্লেষের চরম পর্যায়টি হয় বঙ্গভূমেই।
তখনও বঙ্গভূমি প্রাগ্বৈদিক ধর্ম ও নাস্তিক্যে সম্বৃদ্ধ। মূলস্রোত নাস্তিক্যবাদ। বঙ্গের সাংস্কৃতিক মান ও ভাষাজ্ঞান দক্ষিণ এশিয়ায় সুউন্নত ও সম্বৃদ্ধ। হিন্দুকুশ পেরনোর পরে দীর্ঘ প্রায় ১৫০০বছরে বৈদিকরা এই বঙ্গে দাঁত ফোঁটাতে পারেনি। বরং বঙ্গসংস্কৃতিকে একশ্রেণির বৈদিক শ্রদ্ধা করত। তারা তীর্থদর্শনে আসত ও ফিরে গিয়ে পুনোষ্টোম যজ্ঞ করে শুদ্ধ হতো। বাকি বৈদিকরা বঙ্গের শক্তিকে সমীহ করত ও ঘৃণাও করত। বৈদিক সাহিত্যে এর উদাহরণ প্রচুর।
বৈদিক-হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলোতে পরস্পর বিরোধিতা চরম।

অভিধানমতে, দুর্(দুঃখ) গম্(গমন করা, জানা)+অ(কর্মবাচ্যে/কারকে)= দুর্গ+আ= দুর্গা(স্ত্রীলিঙ্গ)। যাঁকে দুঃখে জানা যায়। যিনি দুর্গ অর্থাত্‍ সঙ্কট থেকে ত্রাণ করেন।
তন্ত্রে দ্=দৈত্যনাশ-সূচক, উ=বিঘ্ননাশ-সূচক, র্=রোগনাশ-সূচক,গ্=পাপঘ্নবাচক, আ=ভয়বাচক ও শত্রুনাশ-বাচক।
পুরাণমতে দুর্গ নামক অসুর বিনাশকারী হলেন দুর্গা। মহাশক্তি মহামায়া দুর্গা।

নৃতাত্ত্বিক আলপীয়রাই অসুরজাতি। এরাই বাঙালির অন্যতম পূর্বপুরুষ। অসুর ছাড়াও বঙ্গভূমে এসে এরা শিব-শিবাণী, ষাঁড়-মহিষ পূজাও করত। যদিও দেব-দেবতা অসুর প্রভৃতি ঐশ্বরীক সবই কল্পনা। ঋগ্বেদে এদের অসুর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের ভাষাও মাগধি-প্রাকৃত-অস্ট্রিকের সঙ্গে সংশ্লেষিত হয়ে বর্তমান বাংলায় আছে। বাঙালির ভাষাকে সেইসময়ে "অসুরজাতির ভাষা" হিসেবে চিহ্নিত করেছিল বৈদিকরা। বাঙালির বাহন ষাঁড়, মহিষ, বলদ প্রধান। ষাঁড়-মহিষ নিয়ে উপজাতিদের মধ্যে এখনও বহুল প্রচলিত বাঁধনা পরব। বাঙালির আদি দেবতা শিবের বাহন ষাঁড়। অসুরজাতির প্রতীক হিসেবে মহিষাসুরকে, অর্থাত্‍ 'মহিষ পালক অসুরজাতি'কে বধের গল্প দিয়ে বৈদিক বেশ্যা "আনা"কে দুর্গা নামে বাঙালির মধ্যে প্রচার করা হয়। উদ্দেশ্য বৈদিক তথা হিন্দুত্বে বশ্যতা স্বীকার করানো। প্রাগ্বৈদিক-বৈদিক ধর্ম ও সামাজিক আচার সংশ্লেষের চূড়ান্ত পর্যায়। এরপর হিন্দুব্রাহ্মণরা প্রচার শুরু করে। প্রাথমিক সময়ে অসুর হিসেবে উপজাতিদের চিহ্নিত করে ও দুর্গাকে দুর্গতিনাশক হিসেবে বোঝানো হয় বাকি বাঙালিকে। পরে রাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় রমরম করে চলতে থাকে বঙ্গে। দুর্গাদালানেই এপূজা হতো। বাঙালি মুখস্থ করে নেয়, দুর্গতিনাশক মাতৃত্বের প্রতীক দেবী দুর্গা ও অসুর হলো অনুন্নত, কদর্য, ঘৃণ্য জীব; যেমনটা ভাবত বৈদিকরা।
কথিত আছে মৈমনসিংহের জনৈক স্থানীয় জমিদার কংসনারায়ণ রায়চৌধুরী এই পূজার প্রচলন করেন। কিন্তু এটা সঠিক নয়।
এই পূজা বঙ্গে দশ-এগারো শতকে হত, এর প্রাচীন প্রমাণ আছে। চৌদ্দশতকে আন্দুলে ও পনেরো শতকে রংপুরে দুর্গাপূজা হয়। কলকাতায় শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭-তে এপূজার প্রবর্তক। বারোয়ারির শুরু হুগলীর গুপ্তিপাড়ায় ১৭৬১ বা ১৭৯০-তে।

দ্বিতীয়বারের বাংলা ভাগ। পার্থ চট্টোপাধ্যায়

ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বাতিল করা সত্ত্বেও, কোনো পক্ষই বাংলার অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের জন্য তেমন তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতেও এর সম্ভাবনা নেই। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় অনেক সময় অত্যন্ত আকস্মিক ও স্বল্পকালীন উদ্যোগ দ্বারা উদ্ভূত ঘটনা পরবর্তীতে সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক কল্পনার পরিগঠনের স্থায়ী সুরত তৈরি করে দিতে পারে। আমি ইতিমধ্যে দেখিয়েছি পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশ উভয়স্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতি দ্বিতীয়বারের বাংলাভাগের বাস্তবতাকে কঠোরভাবে অস্বীকার করে; তথাপি ধর্মীয় পরিচয় ব্যতিরেকে নতুন জাতীয়তাবাদী কল্পনার সম্ভাবনা দেশভাগের পরিণাম দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, তার বাইরে যেতে পারেনি।
স্বদেশি সময়কার জাতি
১৯০৫ সালের প্রথম বাংলা ভাগের সাথে ১৯৪৭-এর দ্বিতীয়বারের বাংলা ভাগের তুলনার জরুরত আছে।
প্রথমবারের বাংলা ভাগ (পশ্চিমে বাংলা এবং পূর্ব দিকে পূর্ব বাংলা ও আসাম) একান্তই উপর মহলের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফসল। সে সময়ে বঙ্গভঙ্গের জন্য কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন হয়নি, যেরকম আমরা এখনকার সাংস্কৃতিক জনমিতির নিরিখে প্রদেশভাগের দাবিকারী জাতীয়তাবাদী তৎপরতায় দেখে থাকি। উল্টা, বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের উছিলায় ভারতে সম্ভবত প্রথম গণভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (স্বদেশি আন্দোলন) সংঘটিত হয়। বাংলার মানুষ সাংস্কৃতিকভাবে এক ও অবিচ্ছেদ্য এর বরাতে তারা বঙ্গভঙ্গ রদের দাবি জানায় এবং ১৯১১ সাল নাগাদ সফলও হয়। বঙ্গভঙ্গের কারণ হিশেবে প্রশাসনিক সুবিধার কথা বলা হয়: ১৮৯০০০ বর্গমাইল এলাকা ও ৭৯ মিলিয়ন জনসংখ্যাবিশিষ্ট অবিভক্ত বাংলাকে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল অসাধ্য। কিন্তু সুমিত সরকার তার ক্ল্যাসিক গবেষণায় দেখিয়েছেন প্রশাসনিক বিবেচনার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনাও এক্ষেত্রে সমান ভূমিকা রাখে।১ এর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত কারণ হচ্ছে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে সঞ্চারণশীল জাতীয়তাবাদী অনুভূতির বিকাশকে দমানো। ঔপনিবেশিক গভর্নর উপলব্ধি করেছিলেন প্রদেশের বিভক্তি পুরো বাংলা প্রশাসনের ওপর এদের আন্দোলনের আছর কমাবে, এই আন্দোলনের চারিত্র সেসময়ে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক না হলেও অবন্ধুসুলভ ছিল।
এথনোগ্রাফার এবং প্রশাসক এইচ.এইচ. রিসলি তার বহুল উদ্ধৃত দুটি বাক্যে বলেছিলেন: ‘অবিভক্ত বাংলা এক ধরনের শক্তি বা হুমকিস্বরূপ। বিভক্ত বাংলা অনেক দিক থেকেই চাপে থাকবে… আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বিভক্ত করা এবং আমাদের শাসনকাজের বিরোধী প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা।২
অন্যভাবে বললে, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের রাজনৈতিক মতলব ছিল দমনমূলক : হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী প্রতিপক্ষকে বাধাগ্রস্ত করা। ভাইসরয় কার্জন তাদের মতলব সোজা-সাপটা ভাবেই উল্লেখ করেছিলেন :
‘যারা নিজেদেরকে বাঙালি জাতি মনে করে এবং স্বপ্ন দেখে যখন ইংরেজরা চলে যাবে আর বাঙালি বাবুরা কলকাতার গভর্মেন্ট হাউসে অধিষ্ঠিত হবে, তখন তারা বাংলাভাগের যেকোনো উদ্যোগকে সেই স্বপ্ন পূরণের প্রধান অন্তরায় মনে করবে। আমরা যদি দুর্বল হয়ে তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিই তাহলে কোনোদিনই বাংলাকে ভাগ করা যাবে না এবং ভারতের পূর্বদিকের শক্তি আরো দৃঢ় ও মজবুত হবে এবং আমাদের সমস্যার নিরন্তর উৎস হবে।’৩
ঔপনিবেশিক কৌশলের অন্যদিকের কথা উল্লেখ করতেও তিনি ভোলেননি : বঙ্গভঙ্গ ‘পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রদান করবে যার স্বাদ তারা বিগত মুসলমান শাসনামলের পর থেকে পায়নি।’৪
সুতরাং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ যদি প্রাথমিকভাবে ঔপনিবেশিক ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল’ কৌশলে সহায়তা করে, তাহলে আমরা দেখব সেই কৌশল এলাকা এবং সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে এরই মধ্যে হাজির ছিল। সেসময়ে আসলেই একটি জাতি ছিল নাকি দুইটি এটা ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। বরং এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল একক জাতির কল্পনা রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। আর এই রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিতর ভাষাভিত্তিক ও ধর্মভিত্তিক দুটি জাতি তৈরির চেতনাকে উসকে দেয়ার পর্যাপ্ত রসদ ছিল।
মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই প্রথম বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। বঙ্গভঙ্গ কর্তৃক সৃষ্ট স্থিত অবস্থাকে অস্থির করে তোলার ক্ষেত্রে, স্বদেশি আন্দোলনের যে সাফল্য (এ আন্দোলনের প্রধান নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির ভাষায়) বাংলায় সেটিই জাতীয়তাবাদী কল্পনার ক্ষেত্রে প্রধান স্ফূরণ ঘটায় এবং পরবর্তী দশকগুলোর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মতাদর্শিক ও সাংগঠনিক রূপরেখা প্রদান করে। এটিই প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা যখন ভারতের জাতীয়তাবাদী কল্পনা এলাকাভিত্তিক বিভাজনের রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। নানান ধর্মীয় জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও বাংলা এক ও অবিচ্ছেদ্য এই চেতনা একটি জাতির ‘স্বাভাবিক ইতিহাসের’ (natural history) ধারণাকে মজবুত ভিত্তি প্রদান করে যেখানে এক জাতির ভিতরেই বিভিন্ন এলাকা ও সংস্কৃতির সহাবস্থান সম্ভব। এই স্বাভাবিক-ঐতিহাসিক থিম ভারত রাষ্ট্রকাঠামোর ভিতর বাংলার অন্তর্ভুক্তিকে সহজ করে দেয়। কারণ বাংলার সংস্কৃতিকে ভারতীয় জাতির বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ঐক্যের ‘স্বাভাবিক’ অংশ হিশেবেই গণ্য করা হয়।
তবে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সাফল্য কদাচিৎই এই একক ও সর্বব্যাপ্ত জাতির ধারণায় যে ফাটল আছে তা লুকিয়ে রাখতে পেরেছে। এ সময়ে বাংলার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নেতৃত্ব পুরোপুরিভাবে উচ্চবর্ণ হিন্দুর হাতে ছিল। আরো তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, এই জাতি ছিল সুস্পষ্টভাবেই ‘হিন্দু’, কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে তারা এই জাতীয়তাবাদী কল্পনাকে বা জাতির এই ধারণাকে জনমানসে স্বাভাবিক হিশেবে চাপিয়ে দিতে কামিয়াব হয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, হিন্দুকেন্দ্রিক জাতির এই ধারণা মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল বা জাতির চৌহদ্দি থেকে মুসলমানদের বাদ দিয়েছিল। এটাও উল্লেখ করবার মতো যে, বঙ্গভঙ্গের পক্ষে সামান্য রাজনৈতিক প্রচারণা দেখা গেলেও স্বদেশি আন্দোলনকারীরা জাতীয়তাবোধ জাগরণের জন্য ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্যে’র মাহাত্ম্য প্রচার করে বেড়ায়। যেমন: বিপিনচন্দ্র পাল একটি ‘মিশ্র দেশাত্মবোধ’ ও ফেডারেল ইন্ডিয়ার ধারণা প্রদান করেন যেটি গঠিত হবে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় অর্থাৎ হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, আদিবাসী নিয়ে।৫ এই ধারণা গণ জাতীয়তাবাদী পর্যায় জারি থাকে এবং ১৯২০ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের ‘হিন্দু-মুসলমান চুক্তি’তে চমৎকারভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে হিন্দুয়ানি ভাবধারায় গঠিত জাতির ‘স্বাভাবিক ইতিহাসের’ ধারণার পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমানের ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ ‘ঐক্যের ধারণা’ও তখন বিকশিত হচ্ছিল। এই দুটি ধারণা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ পায় একেবারে প্রথমদিককার জাতীয়তাবাদী এক রচনায়, যেখানে আমরা স্বাভাবিক সম্পর্কের উপমার চূড়ান্ত প্রয়োগ দেখতে পাই ‘ভারতভূমি যদিও হিন্দু জাতীয়দিগেরই যথার্থ মাতৃভূমি, যদিও হিন্দুরাই ইহার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তথাপি মুসলমানেরাও আর ইহার পর নহেন, ইনি উহাদিগকেও আপন বক্ষে ধারণ করিয়া বহুকাল প্রতিপালন করিয়া আসিতেছেন। অতএব মুসলমানেরাও ইহার পালিত সন্তান।
‘এক মাতারই একটি গর্ভজাত ও অপরটি স্তন্যপালিত দুইটি সন্তানে কি ভ্রাতৃত্ব সম্বন্ধ হয় না? অবশ্যই হয়Ñসকল শাস্ত্র মতেই হয়। অতএব ভারতবর্ষ নিবাসী হিন্দু এবং মুসলমানদিগের মধ্যে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব সম্বন্ধ জন্মিয়াছে…’৬
সংক্ষেপে, স্বদেশি আন্দোলনের সময় বাংলায় যে কল্পিত জাতির প্রভাবশালী সুরত তৈরি হয় তার একদিকে ছিল আর্য-হিন্দু ধারার স্বাভাবিক ইতিহাসআশ্রিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং পাশাপাশি ছিল ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক একাত্মতা ও হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের গীত। তখন এই সমন্বয় সম্ভবপর হয়েছিল কারণ ভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বাংলা অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বাংলায় সংখ্যালঘু হিন্দুরা তখনও পর্যন্ত কোনো মসিবত আকারে হাজির হয়নি। বাঙালি জাতীয়তাবাদী এলিটরা (মূলত উচ্চবর্ণ হিন্দু, ভূস্বামী এবং শহুরে পেশাজীবী শ্রেণির সমষ্টি) নিজেদেরকে অবস্থান তখনও পর্যন্ত অনায়াসেই কল্পিত জাতির নেতৃত্বস্থানেই দেখেছেন।
দুটি পরিবর্তন এই পরিস্থিতিকে ওলট-পালট করে দেয়। পয়লা, বিশের দশক থেকে ভারত জুড়ে উত্থানের ফলে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সম্পূর্ণ নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হয় যেখানে বাংলার জাতীয়তাবাদী নেতাদের অবস্থান প্রান্তিক অথবা কখনো কখনো সর্বভারতীয় কংগ্রেসের বিপরীতমুখী হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়, বাংলায় মুসলমানদের আত্মপরিচয়ের রাজনীতি কৃষিভিত্তিক পাটাতন খুঁজে পায়। ফলে কৃষিভিত্তিক শ্রেণিসম্পর্কের প্রশ্নকে মোকাবেলা করতে না পারায় হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃত্ববোধের পুরানো গীত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় পরিবর্তনটা দিয়েই আগে শুরু করা যাক, যেহেতু দ্বিতীয়বারের বাংলা ভাগের ‘কাঠামোগত’ ব্যাখ্যার এটি একটি জরুরি অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়।
দেশভাগের ইতিহাস
পূর্ববাংলার কৃষকশ্রেণি প্রধানত মুসলমান এবং অধিকাংশ জমিদারই ছিল হিন্দু এই বাস্তবতা অনেক ঐতিহাসিক বিশেষত মার্কসীয় ঐতিহাসিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত শর্ত হিশেবে বিবেচিত হয়েছে কারণ এর ফলে শ্রেণি সংঘাতকে ধর্মীয় সংঘাত হিশেবে আখ্যায়িত করা সম্ভব হয়েছে এবং ইংরেজরা একে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনকে ব্যবহার করে। বাংলাদেশি র‌্যাডিকাল ঐতিহাসিক বদরুদ্দীন উমর যেমন বলেছেন এখানে ইংরেজ শাসকরা কিছু সংঘাতহীন দ্বন্দ্বকে সংঘাতপূর্ণ দ্বন্দ্বে পরিণত করে আর সে কারণেই দেশভাগ সম্ভব হয়েছিল।৭ সুগত বসু এই যুক্তির সবচাইতে সতর্ক গবেষণালব্ধ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।৮ তিনি লক্ষ করেছেন পূর্ব বাংলার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোতে প্রায় সমবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কৃষকশ্রেণি বিরাজমান ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক দশক পর্যন্ত এই কৃষকশ্রেণির সাথে হিন্দু জমিদার, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের ‘পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক’ ছিল, যারা এখানকার মুদ্রানির্ভর কৃষি অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় ঋণ সরবরাহ করতো। তবে ত্রিশের দশকের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্দার ফলে গ্রাম্যঋণের এই জাল ধ্বংস হয়ে ‘শ্রেণিক্ষমতার ভারসাম্য কৃষকদের পক্ষে ঝুঁকে যায়’। উপস্বত্বজীবী এবং ব্যবসায়ী শ্রেণিÑ ‘তাদের কার্যকারিতা হারায়। যখন এই রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জটি সম্ভাবনার বিস্তৃত ময়দানে চলে আসে তখন সুবিধাপ্রাপ্ত ধর্মপন্থীরা ধর্মীয় পরিচয়ের শক্তিকে নিরাপদ মতাদর্শরূপে ব্যবহার করে। পূর্ববাংলার বিশাল ক্ষুদ্র কৃষক সম্প্রদায় যারা একই অর্থনৈতিক শর্তের নিচে বসবাস করতো, ধর্ম তাদেরকে ‘সম্প্রদায়’-এর ধারণা প্রদান করে; ফলে বাংলার ইতিহাসের এক জটিল সন্ধিক্ষণে ধর্ম ‘জাতীয় বন্ধনের’ বুনিয়াদরূপে আবির্ভূত হয়, পরবর্তীতে এটি রাজনৈতিকভাবে আরো মজবুত হয় এবং শেষতক মুসলমানদের স্বতন্ত্র মাতৃভূমির দাবি জানায়। কিছু হিন্দু ও মুসলমান নেতারা মুসলমান কৃষকশ্রেণিকে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী ও সমাজবাদী ব্যানারে আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। মুসলমান কৃষকশ্রেণি তাদেরকে দমিয়ে রাখা দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক ব্যবস্থাকে বহু আগেই নীরবে প্রত্যাখ্যান করে; তারা ধর্মীয় আবেদনে সাড়া দেয় এবং ইতিমধ্যেই ঘটে যাওয়া সামাজিক সম্পর্কের ভাঙনকে একটি শক্তিশালী মতাদর্শিক বৈধতা দেয় যা এতদিন পরে এখন এসে কাগজে কলমে কবুল করে নেয়া হচ্ছে।’৯
ত্রিশের দশকে পূর্ববাংলায় যে শ্রেণিদ্বন্দ্বের উম্মেষ ঘটে, তা ছিল কৃষিভিত্তিক। ‘এই দ্বন্দ্বকে রাজনীতিকরা তাদের নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য তাদের মতো ব্যাখ্যা ও ব্যবহার করে। এই রাজনীতিকরা উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কাজ করার পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকাতেও তৎপরতা চালায়। সরকারের পুনঃপুন সাংবিধানিক সংস্কারকে ব্যবহার করে এবং একটি অবশ্যম্ভাবী অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বকে ধর্মের মুখোশে আড়াল করে।’১০
ধর্ম শ্রেণিদ্বন্দ্বকে আড়াল করে এরকম বাহাস না করলেও সুরঞ্জন দাশ দেখিয়েছেন দুইবার বাংলা ভাগের মধ্যবর্তী সময়ে হিন্দু-মুসলমান বৈরিতার ধরন বিস্তর পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে গেছে।১১ হিন্দু-মুসলমানরা প্রথমদিকে অপেক্ষাকৃত কম সংগঠিত ছিল, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি ও আইনপ্রণেতাদের সাথেও খুব একটা যুক্ত ছিল না। তবে শ্রেণিসচেতনতা সৃষ্টির পর সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের পরবর্তী পর্বে দুটি ধারা লক্ষ করা যায়। একদিকে শ্রেণি ও সম্প্রদায়গত পরিচয় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, অপরদিকে, এলিট ও গণমানুষের সাম্প্রদায়িকতাও একবিন্দুতে এসে মিশে। ফলে, পুরো জনগোষ্ঠী দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়, প্রত্যেক পক্ষই তাদের নিজেদের এলিট দ্বারা পরিচালিত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও সেই সাম্প্রদায়িক ভেদরেখা ছড়িয়ে দিতে সফল হয়।
হিন্দু জনগোষ্ঠীর অবস্থা কী ছিল? জয়া চ্যাটার্জি সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন কৃষিভিত্তিক দ্বন্দ্ব এবং পূর্ব বাংলার কৃষকসম্প্রদায়গত সচেতনতার ওপর জোর দেয়ার কারণে মনে হতে পারে ‘বাংলার সাম্প্রদায়িকতা হল স্রেফ মুসলমানদের মামলা। মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার সমান্তরালে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটেনি বা ঘটলেও তা এমন সীমিত ও ছোট গণ্ডির মধ্যে ছিল যে, পাকিস্তান হাসিলে এটি কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি।’১২ এরপর তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন কিভাবে ত্রিশের দশক থেকে হিন্দু সম্প্রদায়গত পরিচয় গড়ে ওঠে, প্রথমদিকে শিক্ষিত ও স্বচ্ছল জমিদার এবং পেশাজীবী শ্রেণির সাথে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির সখ্যতার মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে নিম্নবর্ণ হিন্দুদেরকে একই সম্প্রদায়ের ছাতার নিচে এনে ‘সংস্কৃতায়িত’ আকাঙক্ষাকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়; আর এদের প্রধান রাজনৈতিক মতলব ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের শাসনকে প্রত্যাখান করা।১৩
‘তথ্য-সাবুত থেকে বলা যায় যে, বাঙালিরা তাদের প্রাদেশিক রাজনীতিতে নীরব দর্শক ছিল না অথবা পুরোপুরি পরিস্থিতির শিকারও হয়নি যে জোরজবরদস্তি করে তাদের ‘মাতৃভূমি’কে ভাগ করা হয়েছে। বরঞ্চ বাংলার বিপুলসংখ্যক হিন্দু কংগ্রেসের প্রাদেশিক শাখা ও হিন্দু মহাসভার সাহায্যে বাংলাভাগ ও ভারতের অভ্যন্তরে একটি পৃথক হিন্দু প্রদেশ গঠনের জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালায়।’১৪
এই দুটো অবস্থানকে পাশাপাশি রাখলে, বাংলায় মুসলমান ও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস এ কথাই মনে করিয়ে দেয়Ñএকটি জনগোষ্ঠী শ্রেণি ও সামাজিক স্তরবিন্যাসকে ভেদ করে সম্পূর্ণ দুইভাগে বিভক্ত ছিল; একভাগ সমগ্র প্রদেশ শাসনের রাজনৈতিক হকের ওপর জোরারোপ করে যেহেতু তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় সম্প্রদায়, অন্যভাগ সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য একটি পৃথক ‘মাতৃভূমি’ সৃষ্টির (অথবা ধরে রাখা) উদ্দেশ্যে প্রদেশের রাজনৈতিক বিভক্তির ওপর জোর দেয়। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার ‘ঐতিহাসিক অনিবার্যতা’ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে খোদ ইতিহাসবিদ্যাও মনে হয় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
আমার কাছে একটা জিনিস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় : যখন আমরা ইতিহাসের কোনো একটা ‘ঘটনা’ নিয়ে ভাবি, যেমন ধরা যাক বাংলার ভাগ (অথবা ভারতের), তখন আমরা সেই ঘটনার পেছনে জড়িয়ে থাকা নানা উৎসমুখকে খোলাসা করার কোশেশ করি। এর প্রত্যেকটি উৎস থেকে আবার নানা কিসিমের আখ্যান তৈরি করা যেতে পারে। যেমন: একটি জাতির দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক নির্মাণের গাল-গল্প থেকে শুরু করে মাত্র কয়েক মাসের তৎপরতার ফলে বিভক্ত প্রদেশের গল্প। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নানামুখি ইতিহাসের ভিতর একটি আখ্যান মূল ও প্রভাবশালী পরিচয়ে পরিণত হয়, যেমন সাতচল্লিশের ঘটনা জটিল ভঙ্গিম ইতিহাসকে ‘দেশভাগের কাহিনি’ হিশেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু এগুলো প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা ইতিহাস যার ভিতর নানা কিসিমের উপাদান, যেমন ধর্ম বা জাতীয়তাবাদ আছে। এদের তাৎপর্য একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
এখানে আমি ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদ এই দুটি বিষয়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখে দ্বিতীয়বারের বাংলা ভাগের বেশ কিছু আখ্যানকে বিশ্লেষণ করব। জনপ্রিয় বিশ্বাস এবং চর্চার অবস্থান থেকে দেখলে, বাংলায় ইসলামের প্রসার, মুসলিম কৃষকসম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে বিভিন্ন ইসলামিক-অনৈসলামিক চর্চার সহাবস্থান এবং ইসলামকে ‘বিশুদ্ধ’ করার পুনঃপুন প্রচেষ্টার এক লম্বা কাহিনির কথা আমরা বলতে পারি।১৫ অন্য আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমরা ১৯ শতকের শেষ দিকে একটি নয়া এলিট মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উন্মেষের কথা বলতে পারি যার এক অংশ উত্তর ভারতের উর্দুভাষী আশরাফ সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে, আরেক অংশ একটি স্বতন্ত্র বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি তৈরির কোশেশ করে।১৬ অন্য আরেক অবস্থান থেকে দেখলে, যেটা আমি ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি ১৯ শতকের শেষদিকের ইতিহাসআশ্রিত দেশকেন্দ্রিক ধারণার প্রাণভোমরা ছিল আর্য/হিন্দু সভ্যতা। এই জাতীয়তাবাদী নির্মাণ উচ্চবর্ণ হিন্দুদের আধুনিকায়িত আধিপত্যের দ্বারা পুরো বাংলা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে, স্বদেশি আন্দোলনের নাটকীয়তায় তার হদিশ মেলে। এ কারণে ভারতীয় ও বাঙালি এই দুই পরিচয়ের মধ্যে অথবা প্রকৃত হিন্দু এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের যে গীত তার ভিতর সে সময়ে খুব সামান্যই গরমিল লক্ষ করা যায়। খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে চিত্তরঞ্জন দাশের কংগ্রেসের দ্বারা পরিচালিত জাতীয়তাবাদী এই প্রচেষ্টা সবচেয়ে বড় সাফল্য পায়। শহর ও গ্রাম উভয়স্থানেই মানুষের ক্ষোভ যখন তুঙ্গে, ২০ দশকের প্রথম দিকে বাংলার জাতীয়তাবাদ গর্বের সাথে হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃত্বের উপনিবেশবিরোধী ব্যানার প্রদর্শন করে।
২০ দশকের শেষ দিকে ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্য’ যখন ভেঙে যায় এবং উচ্চবর্ণ হিন্দুদের জমি-জমা সংক্রান্ত স্বার্থ হেফাজত করতে গিয়ে কংগ্রেস যখন নিজের অবস্থানকে সংকীর্ণ করে ফেলে, তখন দীর্ঘদিনের যে মতাদর্শিক নির্মাণ তা ‘জাতীয়তাবাদ’ থেকে ‘সাম্প্রদায়িকতা’য় রূপান্তরিত হয়Ñএরকম ভাবলে বিষয়টি অতিরিক্ত সরলীকরণ হয়ে যায়।১৭ এই পরিবর্তনের কেচ্ছা বুঝতে হলে আমাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে আবদ্ধ অল্পসংখ্যক মানুষের স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণের দিকে নজর ফেরাতে হবে। নির্দিষ্ট আলাপ ও আলোচনা, বক্তব্য ও ঘোষণা এবং কিছু বিশেষ মানুষ ও তাদের আলাপচারিতা ছাড়া এই ইতিহাস বয়ান করা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র এধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার প্রাসঙ্গিকতার ফলেই দেশবিভাগের মতো ঘটনায় সবসময়ই ‘গোপন ইতিহাস’ এবং ‘না বলা কাহিনী’র সম্ভাবনা থেকে যায়।
আরো নির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৩৫ সালের সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলায় সরকারি ক্ষমতা বণ্টন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় সম্ভবত একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে আইনসভা থেকে প্রাদেশিক মন্ত্রীসভা গঠন করা হতো তাতে ৪৮ ভাগ আসন মুসলমানদের জন্য (মোট জনগোষ্ঠীর ৫৪ ভাগ ছিল তারা), ১২ ভাগ ছিল ‘দলিত শ্রেণির’ জন্য (তপশিলি শ্রেণি যারা পুরো জনগোষ্ঠীর ১৮ ভাগ) এবং ২০ ভাগ সংরক্ষিত ছিল হিন্দু প্রার্থীদের জন্য (দলিত শ্রেণি বাদে হিন্দুরা ছিল ২৬ ভাগ)। বিস্ময়করভাবে, ১০ ভাগ আসন বরাদ্দ ছিল ইয়োরোপীয়দের জন্য অথচ তারা মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ০.০৪ ভাগ; তা সত্ত্বেও তারা সম্প্রদায়গতভাবে গঠিত হাউসে গুরুত্ববহ ভারসাম্য তৈরির ক্ষমতা রাখতো। বাংলায় ‘প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের’ এই বিন্যাস ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল’ সম্বন্ধে জাতীয়তাবাদীদের অভিযোগের একটি জ্বলজ্যান্ত নজির।
ত্রিশ এবং চল্লিশ দশকে বাংলার প্রাদেশিক রাজনীতিতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে এ কথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে জনমত ব্রিটিশবিরোধী চেতনা থেকে ক্রমশ সরে আসছিল এ কথা সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, হিন্দু জাতীয়তাবাদীদেরকে বাতিল করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং স্থানীয় ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র মুসলমানদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছিল এই অভিযোগ তাদের ব্রিটিশবিরোধী অনুভূতিকে আরো মজবুতই করেছিল। আবার হিন্দু-মুসলমান সংঘাতের নতুন পরিস্থিতিতে ১৯ শতকের শেষ থেকে নির্মিত জাতীয়তাবাদী মানসের অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো অদলবদলের জরুরত ছিল একথাও সত্য নয়। পূর্বে (স্বদেশি সময়ে) যদি এটা হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃত্বের শ্লোগান থেকেই জন্ম নিত তবে এখন এটা মুসলমান-স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও সহজেই করতে পারত। ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নকে ঘিরে যে বিশাল কৌশলগত রাজনৈতিক সম্ভাবনার জন্ম হতে পারে তাকে যদি আমরা আমলে না নেই তাহলে আমরা ভারতে জাতীয়তাবাদী কল্পনা যেভাবে আবির্ভূত হয়েছিল তার আধিপত্যবাদী শক্তিকে অনুধাবনে ব্যর্থ হবÑএই সম্ভাবনা বিস্তারের এক দিকে রয়েছে হিন্দু আধিপত্যের চূড়ান্ত পর্যায়, মাঝখানে আন্তঃসম্প্রদায়গত ভ্রাতৃত্বকরণ এবং অন্যদিকে ধর্ম ও রাজনীতিকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলা।
বাংলার মুসলমান রাজনীতির ক্ষেত্রে এমনটা ছিল না, অন্তত আমরা যে দুই দশক নিয়ে কথা বলছি। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে বাংলার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতির সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো একটা দিক হচ্ছে হিন্দু সংখ্যালঘুদের প্রতি তাদের আধিপত্যহীন উচ্চাভিলাষ। বাংলার মুসলমান রাজনীতিকে পুরো ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যালঘুর রাজনীতির সাথে মিলিয়ে দেখা ছাড়া এ ঘটনার অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব না। একটা ন্যূনতম সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক তৎপরতাও দেখা যাবে না যাকে বাঙালি সমাজে মুসলমান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংখ্যালঘু হিন্দুদের সম্মতি আদায়ের আধিপত্যকামী প্রচেষ্টা হিশেবে পাঠ করা যায়। সম্ভবত এই অনুপস্থিতি ছিল ওই আন্দোলনের নিম্নবর্গীয়তার অপরিহার্য লক্ষণ। হয়ত এটাও বলা যেতে পারে তখন আধিপত্যকামী প্রচেষ্টা বেড়ে ওঠার জন্য হাতে যথেষ্ট সময় ছিল না। অথবা আরো সতর্কভাবে আমরা বলতে পারি, সে ধরনের কোনো প্রচেষ্টার সবচাইতে সম্ভাবনাময় সময়ে অর্থাৎ ১৯৩৭ সালে যখন ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা আন্দোলন পূর্ব বাংলায় সবচেয়ে সক্রিয় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিশেবে আবির্ভূত হয় সেসময় কংগ্রেস এবং কৃষক-প্রজা পার্টির মধ্যকার রাজনৈতিক ঐক্য ভেস্তে যায়। মূলত দুটি কারণে এটি ভেস্তে যায়। পয়লা, কংগ্রেসের কোয়ালিশনে না যাওয়ার অনমনীয় সর্বভারতীয় নীতির কারণে; এবং পরবর্তীতে যুদ্ধের সময় কংগ্রেস নেতারা যেন মন্ত্রী পর্যায়ের ক্ষমতায় যেতে না পারে সেজন্য গভর্নর এবং ব্রিটিশ আমলারা আন্তঃসম্প্রদায়গত রাজনৈতিক জোটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি জারি করে।১৮ অপরিণত হলেও ১৯৩৭ সালে খুব অল্প সময়ের জন্য একমাত্র উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। এই প্রচেষ্টা প্রজা আন্দোলনকে শুধু মুসলমানদের জন্য নয় বরং গোটা বাঙালি সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিশীল একটি আন্দোলন হিশেবে তুলে ধরার কোশেশ চালায়।১৯ যাই হোক, প্রাদেশিক পর্যায়ে আন্তঃধর্মীয় গণতান্ত্রিক মৈত্রীর অনুপস্থিতিতে কৃষকদের সংগঠিত করার মত বামপন্থীদের স্থানীয় প্রচেষ্টা হয় নির্দিষ্ট চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ থাকে অথবা সরকারি আমলাতন্ত্রের মদদপুষ্ট সাম্প্রদায়িক শক্তির দ্বারা বানচাল হয়ে যায়।২০ পূর্ববাংলায় কৃষক-জনতার বিদ্রোহ কৃষিভিত্তিক ভ্রাতৃত্ব ও ইনসাফের ধর্ম হিশেবে ইসলামকে জোড়ালোভাবে ব্যবহার করেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বস্ত গণতান্ত্রিক শক্তি তৈরি করতে পারে না। ফলে এটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়।
কৌশলসমূহ ও ফলাফল
ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে বাংলাভাগের সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল, একথা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। বাংলার ভেতরকার জনমতের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বেঙ্গল এসেম্বলির সদস্যরা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতেন আর তারা সীমিত ভোটাধিকারপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগকে কেন্দ্র করে পক্ষে বিপক্ষে বেশকিছু প্রচারণা হয়েছে। এগুলোকে জনরোষের সাথে তুলনা করলে ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে, সে সময়ের তথ্য-সাবুত থেকে এ কথাই জানা যায়, দেশভাগকে কেন্দ্র করে সকল আলাপ-আলোচনা ১৯৪৬ সালের অগাস্টে কলকাতার এবং তার কয়েক সপ্তাহ পরে নোয়াখালির সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ঘেরাটোপে আবদ্ধ ছিল। হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজ কর্তৃক সংগঠিত এই ঘটনাগুলোই সম্ভবত দেশভাগের পেছনে সবচাইতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। ১৯৪৬-এর নজিরবিহীন সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে কিছু লোক ক্ষমতার সাধারণ পরিবর্তনের সর্বনাশা পূর্বাভাস হিশেবে দেখেছেন। অন্যদের চোখে আইনগত বা সাংবিধানিক কাঠামো যাই হোক না কেন পাকিস্তানের জন্ম ছিল অবধারিত।
অগাস্ট ১৯৪৬ থেকে অগাস্ট ১৯৪৭ সময়কালে বাংলায় যেসব রাজনৈতিক বাহাস হয় সেগুলো পাঠ করলে যে কেউ সহজেই বুঝতে করতে পারবেন পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাচ্ছে, এই পরিণতি ঠেকাবার আর কোনো পথ খোলা নেই এই ধারণার বুনিয়াদেই তখন তারা নিজেদের অবস্থান গ্রহণ করছিলেন। ফলে প্রত্যেক সম্প্রদায় (সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী, সংখ্যালঘু গোষ্ঠী অথবা দলিত শ্রেণি) নিজেদের স্বার্থ হেফাজত করে কিভাবে সর্বোচ্চ ফায়দা আদায় করবে তার হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ছিল। এটাও বুঝতে অসুবিধা হয় না, দল বা গোষ্ঠী এবং সংগঠনের মর্যাদা অথবা নেতা নির্বিশেষে বাংলার মধ্যে সে সময়কার প্রতিটি বক্তব্য হোক সেটা কোনো দাবি কিংবা বা আবেদন, কোনো আশ্বাস অথবা হুংকার বাংলার বাইরের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে; বাংলার কেউই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নিজেকে সম্পৃক্ত করেনি যার দ্বারা এই প্রদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। তাই দেশভাগের পরে পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশে এই অনুভূতি পোক্ত হয় যে, ১৯৪৭ সালে বাংলা সর্বভারতীয় রাজনীতিকদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিল।
অগাস্ট ১৯৪৭-এর পূর্ববর্তী মাসগুলোয় ধর্মীয় ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিদের দ্বারা গৃহীত অবস্থানের অনিশ্চিত ও কৌশলগত প্রকৃতি তুলে ধরা বেশ সহজ। ফজলুল হক (যিনি তখন ক্ষমতার বাইরে এবং মুসলিম লিগেরও বাইরে) নির্দ্বিধায় বলেনÑমন্ত্রিরা আইনসভা নয় বরং মুসলিম লীগের প্রধান জিন্নাহর কাছে নিজেদেরকে সঁপে দিয়েছে। সুতরাং সাংবিধানিকভাবে, বাংলায় কোনো সরকার নেই।২১ আরো তাৎপর্যপূর্ণভাবে, মে ১৯৪৭-এ শরৎ বোস-সোহরাওয়ার্দি সার্বভৌম অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব করলে আবুল হাশিম এ প্রস্তাবের পক্ষে প্রাদেশিক মুসলিম লিগের মধ্যে প্রচারণা চালান এবং এই প্রস্তাবকে মূল লাহোর প্রস্তাব যেখানে ‘স্বাধীন মুসলিম স্টেটগুলো’ নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির দাবি করা হয়েছিল তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখিয়ে ন্যায্যতা দেবার কোশেশ করেন। এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আকরাম খান বলেন, প্রাদেশিক লিগের কেউ এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারে না। কারণ সর্বভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ হেফাজতের জন্য জিন্নাহ এবং কেন্দ্রীয় মুসলিম লিগ আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।২২
হিন্দু সমাজে যখন এই বিভক্তির প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় তখন, অন্তত সংগঠিত হিন্দু মতের ক্ষেত্রে অর্থাৎ চরম ডানপন্থী হিন্দু মহাসভা থেকে শুরু করে মধ্যমপন্থী কংগ্রেস, এমনকি বামপন্থীদের মধ্যে প্রায় মতৈক্য গড়ে ওঠেÑবাংলা ভাগের দাবিতে সবাই গলা মেলায়।২৩ যখন পাকিস্তান জন্মের অনিবার্যতা স্পষ্ট হল, বিশেষত মার্চ ১৯৪৭-এ কংগ্রেসের উচ্চমহল যখন পাঞ্জাব ভাগের ধারণাকে কবুল করে তখন হিন্দুরা বাংলা ভাগের পক্ষে অবিরত বাহাস করে গেছে যাতে বাংলা প্রদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরা পাকিস্তানের বাইরে হিন্দুরাষ্ট্রে জায়গা পায়। উগ্র সাম্প্রদায়িক যুক্তি ছাড়াও এই অবস্থানকে আরো চমৎকার যুক্তি দ্বারা জায়েজ করা হয় যার একটি এরকম ১৯ ও ২০ শতকে সৃষ্ট আধুনিক গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে ভারত সমুন্নত করবে এবং কাজে কাজেই সকল গোষ্ঠীর অধিকারও সেখানে সুরক্ষিত হবে। অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব অল্প লোকই কবুল করেছিলেন এবং বেশিরভাগই শ্যামপ্রসাদ মুখার্জির যুক্তি দ্বারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল সার্বভৌম বাংলা যদি ধর্মের ভিত্তিতে পরে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে চায় সে অবস্থায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আর কিছু করার থাকবে না।
‘দলিত শ্রেণির’ নেতাদের ভিতরকার বাহাসগুলো ছিল আরো কৌতূহলউদ্দীপক। শেডিউল্ড কাস্টস ফেডারেশনের নেতা এবং রাজনৈতিকভাবে মুসলিম লিগের সহযোগী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল দেশভাগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন
‘যদি এরকম হয় তাহলে দেখা যাবে যে পূর্ব বাংলার হিন্দুদেরকে পশ্চিমবাংলায় আশ্রয় নেয়ার জন্য বাধ্য করা হবে। যেসব নেতারা বাংলাভাগের প্রস্তাব করেছেন তারা নিশ্চয়ই জনগোষ্ঠী বদলা-বদলির অভিপ্রায়ও রাখেন। সেক্ষেত্রে আমার কিছু বলার নেই। শুধু একটা কথাই স্মরণ করিয়ে দিব যে, বর্ণহিন্দু নেতারা এতদিন ড. আমবেদকারের ‘Thoughts on Pakistan’ বইয়ের জন্য এবং জিন্নাহর জনগোষ্ঠী অদল-বদলের পরামর্শকে তীব্রভাবে নিন্দা করেছিলেন।… বাংলা ভাগ হলে তপশিলি শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হবে। পূর্ববাংলার বর্ণহিন্দুরা ধনী এবং বেশির ভাগেরই ভালো ভালো চাকরি আছে। পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিমবাংলায় যেতে তাদের তেমন কষ্ট করতে হবে না। দরিদ্র তপশিলি কৃষক সম্প্রদায়, জেলে এবং কারুশিল্প গোষ্ঠীকে পূর্ববাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দয়ায় বেঁচে থাকতে হবে।’
এর প্রত্যুত্তরে রাধানাথ দাস, কন্সটিটুয়েন্ট এসেম্বলির তপশিলি সম্প্রদায়ের একজন সদস্য, বলেন :
‘আজকে যদি আমরা নোয়াখালির নমঃশুদ্রদের বলি তোমরা পশ্চিমবাংলায় চলে আসো, পশ্চিম এবং উত্তর বাংলার সরকার তোমাদেরকে আশ্রয় দিবে এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করবে, তাহলে আমি নিশ্চিত বলতে পারি, যোগেন বাবু তার স্বজাতির একজনকেও সেখানে (নোয়াখালি) ধরে রাখতে পারবেন না। অন্যভাবে বললে, মুসলিম লিগের শাসক বা মুসলিম লিগের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভিতর তারা নিরাপদ বোধ করবে না… আমি বলব, নিম্নবর্ণ হিন্দুরা বরং সবচেয়ে সহজে পূর্ববাংলা ছাড়তে পারবে কারণ তাদের সহায় সম্পত্তি বলতে তেমন কিছুই নেই।২৪
অবশেষে যখন বেঙ্গল এসেম্বলিতে ভোটাভুটি হল, ত্রিশজন তপশিলি সম্প্রদায় সদস্যের মাত্র পাঁচ জন দেশভাগের বিপক্ষে ভোট দেন। স্পষ্টতই, যখন সংখ্যালঘুদের সংখ্যালঘু হিশেবে সংগঠিত একটি গোষ্ঠীর কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আসলো, তপশিলি শ্রেণির প্রতি মুসলিম লিগের দাদাগিরিসুলভ প্রবণতা অপর্যাপ্ততা প্রমাণিত হল।
দেশভাগের প্রশ্ন রাজনৈতিক বলয়ের বাইরের লেখালেখিতেও আলোচিত ছিলÑএর থেকেও আমরা সে সময়কার গভীর অনিশ্চয়তা সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারি। ইংরেজি Delirium শিরোনামে এপ্রিল ১৯৪৭-এ পূর্ববর্তী বছরের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলো নিয়ে একটি ছোট বই বের হয়।২৫ বইটির লেখক বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় পেশায় ডাক্তার, স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডের সাথেও তিনি যুক্ত, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি তার এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি, নিজের মর্যাদা সম্পর্কেও সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। দক্ষিণ কলকাতার আলমবাজার উপশহরের কলকারখানার বস্তির শ্রমজীবী শ্রেণি, হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে অগাস্ট ১৯৪৬-এ তার এলাকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোকে তিনি বহিরাগতদের আক্রমণ হিশেবে বর্ণনা করছেন। এই অজ্ঞাত শক্তিশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিবেশিদের মধ্যকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক পেরে ওঠেনি। তিনি আরো বলেন, কলকাতায় দাঙ্গার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের নেতারা যৌথভাবে শান্তি কমিটি গঠন করে। তিনি নিজেও প্রতিবেশি এলাকায় যান, বহিরাগতদের খুঁজে বের করার জন্য সেখানকার অধিবাসীদের কাছে আবেদন জানান ‘বাইরের উৎপাত কোনোভাবেই আমাদের এলাকায় ঢুকতে দেয়া যাবে না।’ কিন্তু, রাত শেষ না হতেই বস্তিগুলোয় আগুন জ্বালানো হয় এবং নির্মম নিষ্ঠুরতায় খুনোখুনি চলতে থাকে।
বইটির বাকি অংশে আছে কেন এমন ঘটনা ঘটলো আর এর পরিণতি কী হতে পারে তা নিয়ে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি। এই লেখার মধ্যে তখনকার হিন্দু মধ্যবিত্ত পুরুষরা যে ধরনের আলোচনা করতো তার পরিচয় মেলে। ব্রিটিশদেরকে দোষ দেয়া, কংগ্রেসকে দোষ দেয়া, মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলিম লিগকে দোষ দেয়া ইত্যাদি সকল রাজনৈতিক যুক্তিই এখানে হাজির ছিল। আধুনিক ভারতের ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের কাছেও এসব যুক্তি খুবই পরিচিত। তবে যে পদ্ধতিতে বিভ্রান্তিকর এবং নিন্দনীয় ঘটনাগুলোকে ‘ঐতিহাসিক অনিবার্যতা’ বলে চালিয়ে দেয়া হয় তা ছিল অবাক করার মতো।
‘লিগ, কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের ভিতরকার মতপার্থক্য এবং দ্বন্দ্ব আমার কাছে রাজনৈতিক মঞ্চে থিয়েটার নাটকের মতো মনে হয়। যে নাটকের নাট্যকার ও পরিচালক মহাত্মাজি আর বাকিরা অভিজ্ঞ অভিনেতা। বেশিরভাগ ভারতীয়রাই বুঝতে পারে না কোন রহস্যময় পথে মহাত্মাজি এবং জিন্নাহ সাহেব তাদের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিলেন। … তারা দুজনে মিলে ধর্মসংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ধর্মবেত্তাদের পাশ কাটিয়ে ধর্মপ্রচারণার সঙ্গে স্বাধীনতার বার্তাও যুক্ত করেছেন। এভাবেই তারা তাদের পার্টি এবং জাতি তৈরি করেছেন। … একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা নিশ্চল মানসিকতা ও জরাজীর্ণ সমাজকে ধ্বংস করতে এবং সাধারণ মানুষের ভিতর রেনেসাঁর জন্ম দিতে চেয়েছেন। … এই আলোড়নকে আমি সাম্প্রদায়িক বলে মনে করি না। একে আমি ভারতের শেষ আন্দোলন হিশেবেই দেখতে চাই।… যে সংঘাত এখন এই দেশে সংঘটিত হচ্ছে খুব শীঘ্রই তা এমন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবে যখন দুই সম্প্রদায়ের লোকেরাই অস্পৃশ্যতা, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা এবং ধর্মীয় ভণ্ডামিতে ভরে উঠবে। সম্ভবত তখনই ভারতে একটি নতুন জাতির উদ্ভব হবে’।২৬
বইটিতে একের পর এক ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাবলীকে অবাস্তব হিশেবেই দেখানো হয় যেগুলো ‘প্রকৃত’ ইতিহাসের পথ আটকাতে পারবে না।
‘এই ডিসেম্বরে [১৯৪৬] কংগ্রেস, ব্রিটিশদের অবস্থানকে মেনে নিয়েছে যা বহুদিন থেকেই মুসলিম লিগের উদ্দেশ্য হাছিলের পক্ষে যায়। এখন কংগ্রেস বাংলার ভাগ, পাঞ্জাবের ভাগ, এমনকি ভারত ভাগও মেনে নিবে। লিগের পাকিস্তান দাবিকে হজম করতে গিয়ে একসময় সম্ভবত ভারতের সব প্রদেশকেই ভাগ করতে হবে। এই ঘটনা হয় দুই জাতির শক্তি বৃদ্ধি করবে নয়তো হিন্দু-মুসলমানের প্রাত্যহিক জীবন এমনই দুর্বিষহ হয়ে উঠবে যে তারা নিজেরা মারামারি কাটাকাটি করবে, দেশের মধ্যেই কাঁটাতারের দেয়াল তুলবে এবং কোনো সম্প্রদায়ই সুখে-শান্তিতে থাকতে পারবে না।…দেশভাগ যদি আজকে অপরিহার্যও হয়ে থাকে, চিরকাল এরকম খণ্ডিত অবস্থায় থাকতে পারে না’।২৭
স্বাধীনতা এবং দেশভাগের সমসাময়িক সময়ে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত আরেকটি ছোট্ট বইয়ের মূল থিমও ছিল এই ‘ঐতিহাসিক অনিবার্যতা’।২৮ মুসলিম লিগের যে মতাদর্শ অর্থাৎ ‘মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতার আড়ালে আধুনিক একদলীয় শাসন’ সেই ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ফলে দেশভাগ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।২৯
‘সত্যি বলতে, কংগ্রেসের ব্যর্থতা প্রকারান্তরে মুসলিম লিগেরই সাফল্য। বাস্তবতা হল, দেশভাগ ঠেকানোর জন্য শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের প্রচেষ্টা একদমই একটা কার্যকর ছিল না… অনিবার্য কাজটাই তিনি [মাউন্টব্যাটেন] করেছেন, কারণ এই পরিণতি ঠেকানোর সবরকমের প্রচেষ্টাই শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে; তিনি শুধুমাত্র সার্জনের ছুরি দিয়ে সমস্যার সুরাহা করেছে।৩০
উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীদের ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বকে নিন্দা করার পর লেখক অন্য আরেকটি বিফল সম্ভাবনার (ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের) জন্য আফসোস করেন‘যে বাংলা একসময় উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাহসিকতার সঙ্গে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেয়, ১৯৪৭ এসে সেই একই ধরনের আরেকটা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হল। হায়রে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস! ১৯০৫ সালে নেতৃত্ব এসেছিল প্রধানত পূর্ববাংলা থেকে এসেছিল, এখন আসছে পশ্চিমবাংলা থেকে। ১৯০৫ সালে এর সংগঠক ছিল ভারতের তদানীন্তন সরকার আর এখন বাঙালিরা নিজেরাই। ১৯০৫ সালে সমস্যার ধরন ছিল রাজনৈতিক, এখন সম্প্রদায়গত। ১৯০৫-এর আন্দোলন সারা ভারতে অবিভক্ত জাতীয়তার সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল; এখন বাংলা তার সেই গৌরবময় ঐতিহ্যকে বলি দিতে আগ্রহী, তাদের ত্রাণকর্তা হিশেবে অন্যের পানে চেয়ে আছে।৩১
চুনিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের পোর্ট্রেট গ্যালারিতে মূলত ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের করুণ পরিণতির সুরই বেজে উঠেছে।৩২ ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সালের ভিতরকার সময়ে লেখা অনেকগুলো চিঠির মধ্যে একটি ছিল খাদিম ইসলামের যে সারাজীবন মুসলিম লিগের সমর্থন করেছে। সে এখন বলছেÑ‘আমার ভুলের কারণেই আমার জন্মভূমি আজ বিভক্ত ও পরাজিত হচ্ছে… হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবাংলা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববাংলা থেকে আলাদা হয়ে যাবে আর উত্তর ভারতের কলোনিতে পরিণত হবে।’ জয়নুল কবির বলছেন ‘লিগ ও ইংরেজদের ষড়যন্ত্র পূর্ববাংলাকে আলিগড়ের এবং পশ্চিমবাংলাকে বানারসের কলোনিতে পরিণত করবে… রাজা গণেশ থেকে সুভাষ [চন্দ্র বসুর] এবং সুলতান ইলিয়াস থেকে তিতুমীরের বাংলা আবার কবে সময়ের অতল গহ্বর থেকে জেগে উঠবে?’ পুরুলিয়ার সুনীল সেন এপ্রিল ১৯৪৯-এ এসে উপলব্ধি করেন ‘পাটনার শাসকরা বিহারের বাঙালিদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে… সারাজীবন লালন করা তার ভারতবাদ’ হঠাৎ করেই ধূলিসাৎ হল… জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি উপলব্ধি করলেন ‘পাঞ্জাবের হিন্দু অথবা পেশোয়ারের মুসলমানের সাথে তার কোনো কাল্পনিক বা প্রয়োজনীয় বন্ধন নেই। বরং আদর্শ ও স্বার্থের দিক থেকে তিনি বাঁকুড়ার হিন্দু ও বরিশালের মুসলমানদের সাথে যুক্ত।’
ঐতিহাসিকভাবে পাঠ করলে এগুলো আমাদের কাছে নতুন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ওপর গুরুত্বারোপের চাইতে দেশভাগের বাস্তবতাকে অস্বীকারের কাল্পনিক স্মৃতি-জাগানিয়া চিহ্ন হিশেবেই বেশি ধরা পড়ে। এমনকি পশ্চিমবাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাসবিদ্যাও ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ্যার অন্তর্গত দানবীয়তাকে সচেতনভাবে ধামাচাপা দিতে চায়। ফলশ্রুতিতে দেশভাগকে গ্রিক ট্র্যাজেডির সাথে তুলনা করা হয় : ‘পতঙ্গ যেমন আগুনের দিকে ছুটে আমাদের নিয়তিও কোনো এক অদৃশ্য হাত দ্বারা পরিচালিত হয়ে অনিবার্য ট্র্যাজেডির দিকে ছুটে চলে… তা না হলে ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা যারা সকলেই (জিন্নাহসহ) একসময় দেশভাগের ধারণাকে প্রতিহত করেছিলেন, কেন তারা ক্ষমতা হস্তান্তরের শেষ দিকে এসে এমন আচরণ করলেন যে দেশভাগ অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল’?৩৩
আশ্চর্যজনকভাবে, দেশভাগের ক্ষত যখন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছিল এবং বিপুল সংখ্যক উন্মুল জনগোষ্ঠী নতুন করে তাদের জীবন আরম্ভ করছিল (কংগ্রেস তথা বাম শাসনামলেও) সেসময় পশ্চিমবাংলায় যে ধাঁচের জাতীয়তাবাদ আধিপত্য বিস্তার করে, তার আদল ছিল ঠিক স্বদেশি আন্দোলনের সময়কার জাতীয়তাবাদের মতো অর্থাৎ হিন্দু সভ্যতার অতীতে প্রোথিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদ (বাঙালির পরিচয়গত বোধও দৃঢ়ভাবে এই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধে। কেন্দ্রের রাজনীতির সাথে এর কৌশলগত সম্পর্ক কতটা কৃত্রিম তা যেন কোনো বিষয়ই না) এবং হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রণোদনা (যাকে এখন ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি হিশেবে উল্লেখ করা হয়)। এ ধরনের ইতিহাসবিদ্যার কাছে দেশভাগে এক ধরনের গলদ, ক্ষতি ও ব্যর্থতার চিহ্নস্বরূপ এবং এর দায় সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের অক্ষমতার ওপর বর্তায়। কল্পিত জাতির দীর্ঘস্থায়ী মতাদর্শ তার আধিপত্য জারি রাখে, দাবি করে এধরনের ‘জাতির’ ভিতরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও নিরাপদে থাকবে অথচ বাস্তবে দেখা যায় জনজীবনে এটি ব্যাপক পরিমাণে সম্প্রদায়গত বৈষম্য, বিরোধ ও কৌশলগত সংঘাতকে অনুমোদন দেয়।
অন্যদিকে, ওপার বাংলায় পরবর্তী ২৫ বছরে, একটি নতুন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ তৈরি হয়, ১৯৪৭ সালের অগাস্ট নয় বরং ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর জন্ম ঘটে। ১৯৭১-এর পর বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক ভেদাভেদকে ছিন্ন করে ভাষার ভিত্তিতে মিলিত একটি জাতীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আধিপত্যশীল হয়। সেখানেও ১৯৪৭-এর বাংলাভাগ একটি গলদ, ক্ষতি ও ব্যর্থতার চিহ্ন হিশেবেই বিবেচিত হয় আর এ পরিস্থিতি হিন্দু নেতাদের গোয়ার্তুমি এবং ব্রিটিশদের ম্যানিপুলেশনের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।৩৪ দেশভাগের আগের দশকে যে আধিপত্যশীল প্রণোদনার অভাব ছিল, ১৯৭০-এ সেটাই সফলতার সাথে তৈরি হল, তবে এর পরিধি ছিল শুধুমাত্র পূর্ববাংলা। কারণ সাতচল্লিশেই ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হয়ে গেছে।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বাতিল করা সত্ত্বেও, কোনো পক্ষই বাংলার অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের জন্য তেমন তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতেও এর সম্ভাবনা নেই। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় অনেক সময় অত্যন্ত আকস্মিক ও স্বল্পকালীন উদ্যোগ দ্বারা উদ্ভূত ঘটনা পরবর্তীতে সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক কল্পনার পরিগঠনের স্থায়ী সুরত তৈরি করে দিতে পারে। আমি ইতিমধ্যে দেখিয়েছি পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশ উভয়স্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতি দ্বিতীয়বারের বাংলাভাগের বাস্তবতাকে কঠোরভাবে অস্বীকার করে; তথাপি ধর্মীয় পরিচয় ব্যতিরেকে নতুন জাতীয়তাবাদী কল্পনার সম্ভাবনা দেশভাগের পরিণাম দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, তার বাইরে যেতে পারেনি।
বাংলার এই পরিস্থিতি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের একটা বিশেষ দিক বুঝতে সাহায্য করে আর তা হল আধিপত্যশীল জাতীয় মতাদর্শগুলোর পরিগঠনে সাংস্কৃতিক জনমিতির উপাদান হিশেবে প্রায়শই ধর্মের অদৃশ্য উপস্থিতি। জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত লেখালেখিতে একে অবশ্য একদমই স্বীকৃতি দেয়া হয় না। এনলাইটেনমেন্ট-উত্তর রাষ্ট্রের বৈধতা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার ‘জনগোষ্ঠী’র যে বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করে তার ভিতর ধর্ম খুব একটা খাপ খায় না। যত যাই হোক না কেন, সাম্প্রতিক সকল জাতিরাষ্ট্রের ভিতর শুধুমাত্র ইজরায়েল ও পাকিস্তান প্রকাশ্যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার দাবি করে। তারপরও জাতীয়তাবাদের এন্তার নজির দেখানো সম্ভব যেখানে জাতীয় পরিচয়ের সাংস্কৃতিক নির্মাণের উপাদান হিশেবে ধর্মীয় পরিচয় প্রধান ভূমিকা রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে, জাতীয়তাবাদ নিয়ে কাজ করা সাম্প্রতিক পণ্ডিতরা দেখিয়েছেনÑপশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর তথাকথিত সেকুলার জাতীয়তাবাদ গঠনেও ধর্ম অন্যতম উপাদানরূপে কাজ করেছে।৩৫ সম্ভবত, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শগুলো আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয় যখন তারা এর জন্মের গোপন ইতিহাস থেকে ধর্মকে বাদ দিতে কামিয়াব হয়, যখন তারা ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতো মোটাদাগের বাস্তবতাকে জনজীবনের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক কাণ্ডজ্ঞানে রূপান্তর করতে পারে। এটা সম্ভবত সেই শর্ত যেখানে জাতিরাষ্ট্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সর্বজনীন বুর্জোয়া নাগরিকত্ব প্রদানের মহানুভবতা দেখায়। সেরকম পরিস্থিতি তৈরি করতে হলে জনসাধারণের স্মৃতি থেকে নির্দিষ্ট কিছু বয়ানকে মুছে দেয়াই জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ্যার প্রধান কর্তব্য হয়ে ওঠে।
লেখার উৎস : পার্থ চট্টোপাধ্যায় ‘দি প্রেজেন্ট হিস্ট্রি অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, দিল্লি, ১৯৯৮।
ভাষাবদল করেছেন : সাব্বির আজম
ফুটনোট
১. সুমিত সরকার, The Swadeshi Movement in Bengal ১৯০৩-১৯০৮ (নয়া দিল্লি : পিপলস পাবলিশিং হোম, ১৯৭৩)।
২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭-১৮।
৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯-২০।
৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২০-৪।
৬. ভূদেব মুখোপাধ্যায়, ‘স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস’ (১৮৭৬), ভূদেব রচনা সম্ভার। সম্পাদনা : প্রমথনাথ বীশি (কলকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ ১৯৬৯), পৃ. ৩৪১-৭৪।
৭. বদরুদ্দীন উমর, বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি (কলকাতা : চিরায়ত, ১৯৮৭), মুখবন্ধ।
৮. সুগত বসু, Agrarian Bengal Social Structure & Politics : ১৯১৯-১৯৪৭ (কেমব্রিজ : কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৬) বিশেষত, পৃ. ১৮১-২৩২।
৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩১-২।
১০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৭।
১১. সুরঞ্জন দাশ, Communal Riots in Bengal : ১৯০৫-১৯৪৭ (দিল্লি : অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯১)
১২. জয়া চ্যাটার্জী, Bengal Divided : Hindu Communalism & Partition : ১৯৩২-১৯৪৭ (কেমব্রিজ : কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৫), পৃ. ১৫২।
১৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৮।
১৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৭।
১৫. রিচার্ড এম ইটন, The Rise of Islam & The Bengal Frontier : ১২০৪-১৭৬০ (দিল্লি : অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৪)।
১৬. রফিউদ্দিন আহমেদ, Bengal Muslims : The Quest for Identity : ১৮৭৬-১৯০৬ (দিল্লি : অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮২); তাজিন এম. মুরশিদ, The Sacred & the Secular : Bengal Muslim Discourses : ১৮৭১-১৯৭৭ (কলকাতা : অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৫)।
১৭. জয়া চ্যাটার্জী, জাতীয়তাবাদ থেকে সাম্প্রদায়িকতায় রূপান্তরের যুক্তি হাজির করেছেন : ‘জাতীয়তাবাদ ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এবং ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিত। ভদ্রলোকদের সাম্প্রদায়িকতা তাদের এই সতীর্থ বাঙালিদের প্রতি ঐ ছিল। একপক্ষের ইতিহাস হল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের; অন্য পক্ষের কাছে এটা ছিল ব্রিটিশ শাসনের আনন্দোৎসব কারণ মুসলমান স্বৈরতন্ত্র থেকে তারা স্বাধীনতা পেয়েছে। এর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যাবে এই ‘স্বৈরতন্ত্র’কে প্রতিহত করা এবং অস্বীকার করা যে মুসলমানরাও বাঙালি বা ভারতীয়।’ Bengal Divided, পৃ. ২৬৮। তার মতে এই ‘রূপান্তর’ ত্রিশের দশকে হয়েছিল এবং জোরারোপ করে বলেনÑসাম্রাজ্যের হাতের অসহায় পুতুলে পরিণত হওয়ার কারণে নয়, বরং বিশাল এক শক্তিশালী হিন্দু জনগোষ্ঠীর (শহর এবং গ্রাম উভয় স্থানেই) প্রদেশ বিভক্তির সক্রিয় সংগ্রামের ফলেই দেশভাগ ঘটেছে। তার যুক্তি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সরল দৃষ্টিভঙ্গি প্রসূত বলে মনে হয়েছে আমার কাছে।
১৮. এ দুটো ঘটনাই এখন শক্তিশালী তথ্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত : শীলা সেন, Muslim Politics in Bengal: ১৯৩৭-১৯৪৭ (নয়া দিল্লি : ইমপেক্স ইন্ডিয়া, ১৯৭৬); কমলা সরকার, , Bengal Politics: ১৯৩৭-১৯৪৭. (কলকাতা : এ. মুখার্জি, ১৯৯০); লিওনার্দ এ. গর্ডন, Brothers Against the Raj : A Biography of Sarat & Subhas Chandra Bose (নয়া দিল্লি : পেঙ্গুইন বুকস ইন্ডিয়া, ১৯৯০)।
১৯. দেখুন, বিশেষত, হুমায়ুন কবির, Muslim Politics ১৯০৯-১৯৪২ (কলকাতা : গুপ্ত, রহমান এবং গুপ্ত, ১৯৪৩) এবং নরীশচন্দ্র সেনগুপ্ত, যুগ পরিক্রম, খ–২ (কলকাতা : ফির্মা কে. এল. মুখোপাধ্যায়, ১৯৬১), বিশেষত পৃ. ১৭৮-২৫৩।
২০. ত্রিপুরা এবং নোয়াখালি জেলার জন্য সুগত বসুর Agrarian Bengal-এ এর তথ্যউপাত্ত হাজির করা হয়েছে, পৃ. ১৮১-২৩২।
২১. কালিপদ বিশ্বাসের যুক্ত বাংলার শেষ অধ্যায় (কলকাতা : অরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, ১৯৬৬), পৃ. ৩৮৬-৯০।
২২. বদরুদ্দীন উমরের বঙ্গ-ভঙ্গ বইয়ে এই তর্কে বিস্তৃতভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। পৃ. ৪৬-৬৮।
২৩. অধিকাংশ কমিউনিস্টই পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন যে, ১৯৪৬-৪৭-এর সেই পরিস্থিতিতে, সাম্প্রদায়িক বিভক্তির অপরিহার্যতাকে শনাক্ত করার চাপ ছিল অপ্রতিরোধ্য। দেখুন : কমিউনিস্ট লেখালেখির ওপর সার্ভে এবং স্মৃতিকথা, অমলেন্দু সেনগুপ্ত, উত্তাল কাল : অসমাপ্ত বিপ্লব (কলকাতা : পার্ল পাবলিশার্স, ১৯৮৯)।
২৪. এই বিতর্ক আবার পুনর্মুদ্রণ হয়েছে, জগদীশচন্দ্র ম-ল, বঙ্গ-ভঙ্গ (কলকাতা : মহাপ্রাণ পাবলিশিং সোসাইটি, ১৯৭৭)।
২৫. ধীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, Dilirium (সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা) (আলমবাজার : দাতব্য বিভাগ, ১৯৪৭)।
২৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
২৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭-৮।
২৮. সত্যেন সেন, পনেরোই আগস্ট (কলকাতা : সিটি বুক কোম্পানি, ১৯৪০)।
২৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৩।
৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৫।
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৭-৮।
৩২. চুনিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, ভাঙ্গন দিনের কথামালা (প্রকাশকাল নেই সম্ভবত ১৯৫২)।
৩৩. শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, জিন্নাহ, পাকিস্তান : নতুন ভাবনা (কলকাতা : মিত্র এবং ঘোষ, ১৯৮৮), পৃ. ৩০২-৩
৩৪. বাংলাদেশি ঐতিহাসিকদের মধ্যে এ বিষয়ে প্রায় ঐক্যমত্য দেখা যাচ্ছে। যেমন, সরকারি অর্থানুকুল্যে লিখিত একটি ইতিহাস সোহরাওয়ার্দি ও আবুল হাশিমের সার্বভৌম যুক্ত বাংলার মহৎ পরিকল্পনাকে নসাৎ করে দেয়ার জন্যে একগুঁয়ে বাঙালি হিন্দুদের’ নিন্দা করছে। বাংলা ভাগের অনুমতির ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘুদের সমান গুরুত্ব দেয়ার কারণে ব্রিটিশদেরকেও সমালোচনা করেছে। মুহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ, আমাদের মুক্তি সংগ্রাম (ঢাকা : বাংলা একাডেমি, ১৯৭৮), পৃ. ৪১১-১২। র‌্যাডিকাল ঐতিহাসিক বদরুদ্দীন উমর লেনিনীয় যুক্তিতে বলেনÑভারতের মতো বহুজাতির দেশে একমাত্র প্রকৃত গণতান্ত্রিক যুক্তরাজ্যীয় ব্যবস্থা সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক স্বার্থের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য নিয়ে আসতে পারে। তিনি কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং ব্রিটিশদেরকে দেশভাগের জন্য দায়ী করেন। বঙ্গ-ভঙ্গ, পৃ. ১০৪-৫।
৩৫. যেমন, লিন্ডা কোলি, Britons : Forging the Nation :১৭০৭-১৮৩৭ (নিউ হাভেন : ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯২)।