Thursday, 3 November 2016

বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার আনুপাতিক অবস্থান ------------------ আজম খান

২০৫১ সনে হিন্দুদের সংখ্যা ১৯৭৪ সনে যা ছিল তাই হতে পারে
 আজম খান
বাংলাদেশে সমগ্র জনসংখ্যার তুলনায় হিন্দু সংখ্যার আনুপাতিক অবস্থান ক্রমাগতই নিম্নমুখী হচ্ছে সেটা এতদিনে আমরা সবাই জানি। সাধারণ ভাবে বলা যায় যে এই অবক্ষয়ের প্রক্রিয়াটি ১৯৪৭ সনের দেশভাগের ও পরবর্তীকালের সরকারদের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত না করার পরিণতি। অন্যাদিকে ভারতে বিজেপি ও অন্যান্য চরমপন্থী দলের উপস্থিতি সত্ত্বেও মুসলিম জনসংখ্যার আনুপাতিক হার ১৯৫১ সনের ১০% থেকে ২০১১ সনে ১৪% এ উঠে এসেছে। ঐ একই পর্যায়কালে (১৯৫১-২০১১) বাংলাদেশে হিন্দুদের শতকরা অংশ ২২ থেকে কমে হয়েছে ৮.৫, আর পাকিস্তানে আরো প্রকটভাবে ১৯৪৭ সনের ২০ থেকে ২৫% হিন্দু-শিখ জনসংখ্যা কমতে কমতে এখন ২%এর নিচে নেমে আসেছে।
এই লেখাটিতে বাংলাদেশের ক্রম-নিম্নগামী হিন্দু জনসংখ্যাকে একটি খুবই সাধারণ গাণিতিক সমীকরণ বা বক্ররেখা দিয়ে দিয়ে মিলিয়ে (বা fit করে) ভবিষ্যতে তার সংখ্যাটা কততে গিয়ে দাঁড়াবে তার একটা হিসাব করা হয়েছে। এই পদ্ধতির পদ্ধতিগত কোন বিশুদ্ধতা দাবি করছি না – সংখ্যাগুলোর যথাযথতায় কিছু বিচ্যুতি থাকতে পারে, তবে মোটা দাগে দেখলে এই লেখার ভাবিকথন বাস্তবতা থেকে খুব দূরে হবে না। আর একটি ব্যাপার – এই গণনায় অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা আদিবাসীদের ভবিষ্যত ধরা হয় নি, তাদের সংখ্যাগুলোও এই অবক্ষয় প্রক্রিয়ার অংশ। এই লেখায় কোন গভীর সামাজিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয় নি।
১ নম্বর টেবিলে ১৯৫১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত জরীপের নম্বরগুলো দেখানো হল। চার নম্বর কলাম বা স্তম্ভ থেকে হিন্দু জনসংখ্যার ক্রমান্বয় আনুপাতিক ক্ষয়িষ্ণুতা খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে। সাথে সাথে তিন নম্বর কলাম থেকে ২০১১ নাগাদ এই সমগ্র জনগোষ্ঠী যে সংখ্যাগত ভাবে আর বৃদ্ধি পাচ্ছে না সেটারও একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
টেবিল ১. সমগ্র জনসংখ্যা, হিন্দু জনসংখ্যা ও হিন্দু আনুপাতিক শতকরা জনসংখ্যা (মিলিয়ন এককে)
বছরসমগ্র জনসংখ্যাহিন্দু জনসংখ্যাহিন্দু আনুপাতিক জনসংখ্যা
১৯৫১৪১.৯৩৯.২২২২
১৯৬১৫০.৯৫৯.৪২১৮.৫
১৯৭৪৭০.৮৮৯.৫৭১৩.৫
১৯৮১৮৪.৭৬১০.২৮১২.১
১৯৯১১০৯.৯১২.৭৭১১.৬
২০০১১৩৪.৭১২.৯৩৯.৬
২০১১১৫২.৯১২.৯৯৮.৫
এবার আমরা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বের করব। ১৯৫১ থেজে ২০১১ পর্যন্ত সমগ্র জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার হল ৪.৪%, অথচ এই সময়ে হিন্দু জনসংখ্যার বৃদ্ধিহার হচ্ছে মাত্র ০.৭%।
টেবিল ২. জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার
পর্যায় কালসমগ্র জনগোষ্ঠীহিন্দু জনগোষ্ঠী
১৯৫১ – ২০১১৪.৪%০.৭%
ওপরের সারণীর পর্যায়কালটিকে আরো ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে দেখলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি হার যে কতখানি মুখ থুবড়ে পড়েছে সেটা আরো স্পষ্ট হয়।
টেবিল ৩. জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার
পর্যায় কালসমগ্র জনগোষ্ঠীহিন্দু জনগোষ্ঠী
১৯৭৪-১৯৮১২.৮%১.০৬%
১৯৮১-১৯৯১৩.০%২.৪২%
১৯৯১-২০০১২.২৫%০.১২%
২০০১-২০১১১.৩৫%০.০৫%

২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত হিন্দু জনগোষ্ঠী ০.০৫% মত নিতান্তই দুর্বল একটা হার নিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, বলতে গেলে ১৯৯১ থেকেই মনে হয় এই গোষ্ঠীর বৃদ্ধিতে একটা বড় ব্রেক কষা হয়েছে। ১ নং টেবিলের ৪ নং স্তম্ভের ক্রমান্বয় পতনকে যদি একটা গাণিতিক সূচক (power) রেখা দিয়ে মেলানো (fit) যায় তবে আমরা নিচের টেবিলের নিম্নভূমি নম্বরগুলো পাব।
টেবিল ৪. আগামীতে সমগ্র জনসংখ্যার তুলনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আনুপাতিক মান
বছরআনুপাতিক শতকরা মান
২০২১৬.৩
২০৩১৫.৩
২০৪১৪.৪
২০৫১৩.৭
২০৬১১.৫
এবার আমরা ভবিষ্যতের দুটি বছরকে লক্ষ করি। একট ২০৩১, অপরটি ২০৫১। ২০১১র বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে ভিত্তি করে ও বর্তমানের আনুমানিক ১.৩৫% বৃদ্ধির হার ধরে নিয়ে হিসাব করলে ২০২১ সালের জনসংখ্যা হবে ২০০ মিলিয়ন বা ২০ কোটি এবং ২০৫১ সনে হবে ২৬১.৪ মিলিয়ন বা ২৬ কোটির কিছু ওপরে। অবশ্য দেশের জনসংখ্যা ২৫০ মিলিয়নে স্থিত হতে পারে এরকমও একটা মতামত আছে, তবে সেই আলোচনাটা আর এক দিনের জন্য তোলা থাকল।
টেবিল ৪’র নম্বরগুলো ব্যবহার করলে ২০৩১য়ে হিন্দু জনসংখ্যা হবে ১০.৬ মিলিয়ন ও ২০৫১তে হবে ৯.৬৭ মিলিয়ন। অর্থাৎ ২০৫১তে সংখ্যাগত ভাবে হিন্দুদের পরিমাণ ১৯৭৪ সনে যা ছিল তাই হবে। এর মানে হল সংখ্যাবৃদ্ধির হার হবে ঋণাত্মক। খুবই মোটা দাগের একটা হিসাবে বলা যেতে পারে ২০১১ থেকে ২০৫১ পর্যন্ত বৃদ্ধির হার হবে -০.৬৪%।
টেবিল ৫. ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা (মিলিয়ন হিসাবে)
বছরসমগ্র জনসংখ্যাহিন্দু জনসংখ্যাবৃদ্ধির হার
২০১১১৫২.৯১২.৯৯+০.০৫%
২০৩১২০০.০১০.৬০-০.৯২%
২০৫১২৬১.৪৯.৬৭-০.৪৪%

অনেক শিল্পোন্নত দেশের জনসংখ্যার কম প্রবৃদ্ধির কম, অনেক ক্ষেত্রে সেটা ঋণাত্মক। স্কান্ডানেভীয় দেশগুলোতে এই বৃদ্ধির হার ০.৫ থেকে ০.৭%, জাপানে – (নেগাটিভ) ০.২%। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দু সমাজ নিঃসন্দেহে এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত নয় ।
কয়েক বছর আগেও আমি বিশ্বাস করতাম যে যদিও হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার কমছে কিন্তু তাদের সংখ্যা কম হার হলেও বাড়ছে। এবং ভবিষ্যতেও বাড়বে। কিন্তূ কার্যতঃ দেখা যাচ্ছে এই বৃদ্ধির হার ক্রমাগতই ঋণাত্মক মানের দিকে যাচ্ছে। আগামী ৪০ বছর হিন্দুদের সংখ্যা ২০১১ সনের সর্বোচ্চ ১৩ মিলিয়ন থেকে ধীরে ধীরে ১০ মিলিয়নে পরিণত হবে। ২০৫১র পরে জনসংখ্যা সাংঘাতিক ভাবে কমে যাবে কিনা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু কার্য্তঃ রাষ্ট্রের সমস্ত কাজে এই সমাজের কোন ভূমিকা থাকবে না। যদি বাংলাদেশ তার জনসংখ্যা ২৫০ মিলিয়ন স্থিতি করতে পারে, একটা সাধারণ হিসাবে ২১০১ সনে হিন্দু জনসংখ্যা ৩.৭৫ মিলিয়নে (৪০ লক্ষের নিচে) নেমে যেতে পারে।
চিন্তকদের মতে হিন্দু জনসংখ্যার এরকম নিম্নমুখী প্রক্রিয়ার কারণ বিবিধ। এর মধ্যে আছে (১) ভারতে ব্যাপক আকারে অভিবাসন, (২) বিভিন্ন কারণে পারিবারিক গঠনের অবক্ষয় এবং (৩) জরীপে হিন্দুদের ইচ্ছাকৃত ভাবে কম দেখানো।
তৃতীয় কারণটিকে নিয়ে আমি আপাততঃ কিছু বলছি না। সরকারি ভাবে যদি আদমশুমারীতে হিন্দুদের কম করে দেখানো হয় তবে এই লেখার সব বিশ্লেষণই বাতিল। আমি আপাততঃ জনগণনার প্রকাশিত সংখ্যাগুলোকে সঠিক বলে ধরে নিচ্ছি।
অনেকে বলেন ভারতে গমন নিতান্তই অর্থনৈতিক একটি পদক্ষেপ, সম্পত্তি নিয়ে কাড়াকাড়ি সারা পৃথিবীতেই আছে, তো বাংলাদেশে থাকবে না কেন, এর সঙ্গে ধর্মীয় বৈষম্য টেনে আনা কেন? সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোয় ধর্মীয় ঐক্য যে এক ধরণের দল গঠন করতে পারে সেটা যেন তাঁরা দেখেন না। নরম গরম হুমকি, চাঁদা তোলা, পারিবারিক গঠনের ওপর জুলুম, সম্পত্তি ও জমি দখলে রাখা, আর তারপরে সম্পত্তি ও মন্দিরে আগুন ও লুট, এত কিছুর পরে সেই গোষ্ঠী চলে যাবার কথা তো ভাববেই। ক্ষমতার কেন্দ্রে তাদের কোন ভাগ নেই, বলার জন্য কেউ নেই।
বাংলাদেশের প্রতিটি হিন্দু পরিবার এক ধরণের হুমকির মুখে থাকে। আর এই তিনদিন আগে যশোরে একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটল। পরিবারটি ভিটে-মাটি ছেড়ে চলে গেল। থানা, পুলিশ, কোর্ট সেখানে যেন অসহায়। ওপরে যতই সমন্বয়ের কথা বলা হোক না কেন, কার্যক্ষেত্রে এসে কেউই আসলে সাহায্য করতে পারেন না। অর্পিত সম্পত্তি কেউ কি যথাযথ ভাবে ফেরত পেয়েছেন? কোর্ট ন্যায্য অধিকারীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন দখলদারকে কেন যেন ওঠাতে পারেন না।
ভবিষ্যতের এই অবক্ষয় ধারাকে কি সামলানো যাবে? গতি জড়ত্বে যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে তার কি আর শেষ আছে? উচ্চ হারে মাদ্রাসা শিক্ষা বোধহয় জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিভাজনকে আরো প্রকট করে তুলছে। বাংলায় ধর্ম সমন্বয়ের একটা syncretist ধারা বজায় ছিল, এর একটা প্রমাণ হল আমাদের বাউল ফকিরদের গানের মধ্যে দিয়ে। এই বাংলার বেশীরভাগ হিন্দু, মুসলমানের পূর্ব পুরুষ একই ছিল। হতে পারে ২০৫১ সনের উন্নত সমাজে যেমন সবার নাগরিক ও সম্পত্তি আধিকার বজায় হবে তেমনই একটা syncretist ধারা সবাইকে এক করবে। তবে ইতিহাসের পরিসংখ্যানের চাকা এই সব ভাল চিন্তার ধার ধারে না। মনে হয় আজ থেকে ৪০ বছর পরে এই ধরনের আলোচনার কোন অর্থ থাকবে না।

কিংবদন্তির ট্রেন শহিদ মানিক

কিংবদন্তির ট্রেন..................
বেইজিং থেকে মঙ্গোলিয়া; সেখান থেকে সাইবেরিয়া হয়ে মস্কো, দশ হাজার কিলোমিটার পথ, রেলপথ৷ ট্রেন কিন্তু শুধু একটা৷ তবে যে সে ট্রেন নয়, কিংবদন্তির ট্রান্সসাইবেরিয়ান রেলওয়ের জারেনগোল্ড, বা জারের সোনার ট্রেন৷
ট্রেনটির নাম ‘জারেনগোল্ড' বা ‘জারের সোনার ট্রেন'; জার বলতে স্বভাবতই রাশিয়ার জার বা সম্রাটকে বোঝায়৷ যাত্রীরা সবে এশিয়া থেকে ইউরোপ মহাদেশে পা দিয়েছেন, ইয়েকাটেরিনবুর্গ শহরের কাছে৷ ট্রান্সসাইবেরিয়ান রেলওয়ে ধরে বেইজিং থেকে মঙ্গোলিয়ার উলান বাটোর হয়ে, বৈকাল হ্রদ, ইর্খুটস্ক আর নভোসিবিরস্ক ছাড়িয়ে ইয়েকাটেরিনবুর্গ পৌঁছাতে দশ দিন দশ রাত সময় লেগে গেছে!
ট্রেনের ভেতরে সব কিছু লাল মখমলে মোড়া, যেন সত্যিই জারের জন্য৷ পরে কমিউনিস্ট পার্টির হোমরা-চোমরা ছাড়া অন্য কেউ জারের সোনার ট্রেনে চড়তে পারতেন না৷ আজ হামবুর্গের পেট্রা আর আক্সেল পট সেই ট্রেনে চড়েছেন বটে, তবে খুব একটা ইমপ্রেসড হননি, অন্তত ট্রেন দেখে নয়৷ ট্রেনের ঝাঁকানিতে ঘুমোনোও অভ্যেসের ব্যাপার৷ আক্সেল বলেন, ‘‘ম্যানেজ করে নিতে হয়৷ আমি ১৯০ সেন্টিমিটার লম্বা৷ আমিও এই বিছানায় শুতে পারি, কিন্তু ডানদিক বাঁদিক নড়াচড়া করার উপায় নেই৷ তা সত্ত্বেও বেশ আরামের৷ চার বা পাঁচতারা হোটেল নয় বটে, তা প্রত্যাশা করাও ভুল, বিশেষ করে এই ট্রেনে চড়লে...৷''
পেট্রা বললেন, ‘‘দিন দুয়েক পরেই ওটা আর গায়ে লাগে না, বেশ ভালো ঘুমোনো যায়৷ বরং কেবিন থেকে করিডর ধরে রেস্টুরেন্ট কার অবধি যেতে যে দোলা খেতে হয়, তাই নিয়েই লোকে ঠাট্টা-মশকরা করে৷ নয়ত বেশ মজাই লাগে৷'
নানা ভাষা, নানা মত
জারেনগোল্ড ট্রেনে সব দেশের মানুষ আছেন৷ ইন্দোনেশিয়ার এক যাত্রী বললেন, এটাই তাঁর প্রথম রেল যাত্রা৷ ট্রান্সসাইবেরিয়ান রেলওয়ে সম্পর্কে অনেক শুনেছিলেন, এবার সেই স্বপ্ন সার্থক হলো৷ কিংবদন্তির ট্রেন ট্রান্সসিব সারা বিশ্ব থেকে মানুষকে টানে – শুধু একটি দেশের মানুষের কমতি৷ খোদ রুশদের এই ট্রেনে বিশেষ দেখতে পাওয়া যাবে না৷
টুর গাইড ডিটমার এব্যার্ট বলেন, ‘‘অধিকাংশ সময়টা আমরা রাশিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু ট্রেনে রুশ যাত্রী খুব কম থাকেন৷ ...রুশদের কাছে ট্রান্সসাইবেরিয়ান রেলওয়ের একটা অন্য অর্থ বা উদ্দেশ্য আছে৷ সাইবেরিয়ায় পণ্য ও যাত্রী চলাচলের ধমনী হতে পারে এই ট্রান্সসিব, কিন্তু সেটা পরিবহণের পন্থা হিসেবে৷''
এতটা পথ প্লেনে না গিয়ে ট্রেনে যাবার ইচ্ছা হয় কেন?
ভ্যানকুভার থেকে আসা ক্রিস্টা ম্যাগনুসন, ‘‘প্লেনে চড়লে অনেক কিছু মিস করতে হয়; দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে সেরকম চেনাজানা হয় না৷ ...ট্রেনে চড়লে দেশের সংস্কৃতির অনেক কাছে আসা যায়, মানুষজনের কাছে আসা যায়; অনেক কিছু দেখা যায়৷'' যেমন স্বশাসিত তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী কাজান৷ বহু শতাব্দী ধরে এখানে মুসলমান, খ্রিষ্টান, ইহুদি, তাতার ও রুশরা শান্তিতে বসবাস করছেন৷ কাজান-এর চোখ ধাঁধানো স্থাপত্য তার প্রমাণ৷

দ্বিপ্রহরে জারেনগোল্ড-এর যাত্রীদের জন্যে আরেকটা চমক৷ কাজানের সংগীত বিদ্যালয়ের ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সি সংগীতশিল্পীরা যাত্রীদের জন্য একটি কনসার্ট দিলেন৷ কাজানের সংগীত বিদ্যালয়টি গোটা রাশিয়ায় খ্যাত৷ বহু বিশ্বখ্যাত যন্ত্রবাদকের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছে এই কাজান থেকে৷ গানবাজনা আর সেই সঙ্গে রুশ খানাপিনা৷ ট্রেনের রেস্টুরেন্টের খাবারে মাছের কোনো অভাব নেই, তার সঙ্গে রয়েছে মাংস, আলু ও সবজি৷ ট্রেনে তিনটি রেস্টুরেন্ট কার৷ সেখানকার পরিবেশ আদৌ ফর্মাল নয়৷

পেট্রা পট বললেন, ‘‘সবকিছু বেশ ভালো৷ কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে হয় না৷ আগে থেকেই সব কিছুর ব্যবস্থা করা আছে, দারুণ ভালো ব্যবস্থা৷'' আক্সেল পট বললেন, ‘‘আমরা দু'জনেই নানা ধরনের স্মৃতি নিয়ে যাচ্ছি; এছাড়া যে সব মানুষের সঙ্গে আলাপ ও বন্ধুত্ব হয়েছে৷ ...সব মিলিয়ে ভালো কেটেছে৷'' এবার শুধু মধ্য রাশিয়া পার হয়ে মস্কোয় যাওয়াটা বাকি৷ সেখানেই জারের সোনার ট্রেনের সুদীর্ঘ ১০,০০০ কিলোমিটার যাত্রাপথের শেষ ও নতুন যাত্রার সূচনা৷

Tuesday, 1 November 2016

আক্রান্ত জনতার মিডিয়া

দেবব্রত চক্রবর্তী

“Beauty, no doubt, does not make revolutions. But a day will come when revolutions will have need of beauty.” 
― Albert Camus, The Rebel: An Essay on Man in Revolt

মালেক ব্লাক্তভিচে
২০১১ সালে আরব স্প্রিং এর অভিঘাতে সিরিয়ার রাজপথ যখন স্বৈরতন্ত্রের অবসান এবং গণতন্ত্রের দাবীতে আসাদ বিরোধী গণআন্দোলন তীব্র হয়ে উঠছে, ‘মালেক ব্লাক্তোভিচে’ সেই সময়ে সিরিয়ার বানিজ্যিক রাজধানী আলেপ্পো শহরে এক সাধারন জাভা সফটওয়্যার প্রোগ্রামার। একদিন এক বন্ধুর উৎসাহে নিছক নিরামিষ কৌতহলে নিজের স্মার্ট ফোন দিয়ে সরকার বিরোধী রাস্তার লড়াইয়ের ছবি তুলতে শুরু করেন। দেশব্যাপী তখন কঠিন সেন্সার, সমস্ত গণমাধ্যম সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন, আসাদ বিরোধী আন্দোলনের ভিডিও, অডিও বা ছবি প্রচার নিষিদ্ধ। সিরিয়ার আর দশটা যুবকের মতই ব্লাক্তভিচে আসাদ বিরোধী স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের প্রভাবে ধীরে ধীরে প্রভাবান্বিত হতে শুরু করেন। সাধারণ কৌতহল পরিনত হতে থাকে অন্যায় অত্যচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শক্তির সমর্থক হিসাবে। অবশেষে মালেক ব্লাক্তোভিচে রাজী হয়ে যান বন্ধুর অনুরোধে। শুরু করেন নিজের অ্যান্ড্রয়েড স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে ছবিতোলা এবং সেই কাজের মধ্যে খুঁজে নিতে থাকেন জীবনের নূতন অর্থ। 
মালেক ব্লাক্তোভিচে নামক সেই সাধারণ সিরিয়াবাসী,দৈনিক সফটওয়্যার প্রোগ্রামারের কাজ সেরেই ছদ্মনামে ইউটিউব, বিভিন্ন পোর্টালে আপলোড করতে থাকেন সেই সমস্ত আসাদ বিরোধী প্রতিরোধের ও গণআন্দোলনের মুহূর্তগুলি। তার কথায় “আমি এতো আনন্দিত ছিলাম, আমার মনে হত সত্যই আমি কাজের কাজ কিছু করছিলাম। তিনি সেই হাজারো সাধারণ সিরিয়ানদের একজন যারা প্রত্যেকে, নিজেদের স্মার্ট ফোন, অডিও রেকর্ডার এবং কলম ব্যবহার করে বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত রেকর্ড করে রাখছিলেন দেশব্যাপী গৃহযুদ্ধ ও আসাদের বর্বরতার প্রতিটি মুহূর্ত। সিরিয়ায় তখন একদিকে বিদেশী মিডিয়ার প্রবেশ নিষেধ, লুকিয়ে প্রবেশ করা সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের হুমকি অন্যদিকে সরকারী মিডিয়ায় বিরোধীদের সন্ত্রাসবাদী হিসাবে দেগে দেওয়ার মিথ্যা অপপ্রচার আর তার মাঝে এই সমস্ত হাজারও ব্লাক্তভিচেরা না থাকলে দুনিয়া জানতেই পারতোনা আসাদের বর্বরতার ইতিহাস। 
মালেক ব্লাক্তোভিচে তার প্রথম আসাদ বিরোধী গণ আন্দোলনের পরিস্থিতি কভার করার পরে নিয়ম করে প্রতিদিন কাজের ফাঁকে ঘণ্টা খানেকের ছুটি নিয়ে নিয়মিতভাবে শহরের বিভিন্ন মিছিল এবং আসাদ বিরোধী আন্দোলন কভার করা শুরু করেন। আর প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধ্যেবেলায় কাজ থেকে ফিরে বিভিন্ন মাধ্যমের সূত্রে শুরু করেন গণপ্রচার। ২০১২ সালের শুরুর দিকে আসাদ বিরোধী গণআন্দোলন আসাদের নির্মম অত্যাচারের মোকাবিলায় ক্রমে সশস্ত্র প্রতিরোধের রাস্তা নিতে শুরু করে,অন্য বন্ধুরা হাতে অস্ত্র তুলে নিলেও মালেক ব্লাক্তোভিচে চাকরী ছেড়ে দিয়ে সর্বক্ষণের জন্য নাগরিক সাংবাদিকতার পথ বেছে নেন; প্রতিটি সংঘর্ষ, প্রতিটি মিছিল, সরকারি স্নাইপারের আঘাতে লুটিয়ে পরা সাধারণ প্রতিবাদী মানুষের ঠোঁটের কষ দিয়ে গড়িয়ে পরা রক্ত কভার করা হয়ে দাঁড়ায় তার কর্মক্ষেত্র এবং কর্তব্য। কলম, কিবোর্ড এবং ক্যামেরাই আসাদ বিরোধী আন্দোলনে তার প্রতিবাদের অস্ত্র। তিনি বলেন “আমার ভূমিকা ছিল ক্যামেরা হাতে নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত ধরে রাখা, এবং সেই ভিডিও ডকুমেন্ট যথা সম্ভব সূত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া”। যথারীতি এ কোন সূচীকর্ম অথবা বাগানে গাছের পরিচর্যা নয়। ভীষণ রক্তাক্ত,নির্মম গৃহযুদ্ধে সামনাসামনি যুদ্ধের এবংসংঘর্ষের চিত্র গ্রহণ,দু পক্ষ থেকেই গুলি খাওয়ার সম্ভবনা আর তার মধ্যেই বিপদের ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যহ ভিডিও সম্প্রচার। অবশেষে মালেক ব্লাক্তোভিচে ২০১২ সালে কুখ্যাত আসাদ পন্থী মিলিশিয়া ‘শাবিহা’র হাতে ধরা পড়েন,স্থান হয় আলেপ্পোর কেন্দ্রীয় কারাগারে,চলে অকথ্য অত্যাচার। বেশ কিছুদিন পরে নিরস্ত্র হওয়ার সুবাদে ছাড়াও পান কুখ্যাত কারাগার থেকে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়া ব্লাক্তোভিচে ভয়ে এবং শঙ্কায় বাড়িতে বসে থাকেন বেশ কিছুদিন – কিন্তু তখন আলেপ্পো ফুটছে,গণতন্ত্রকামী বিপুল জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের ঢেউ প্রত্যহ আছড়ে পড়ছে রাজপথে। আসাদ এবং আসাদ বিরোধীদের প্রত্যহ লড়াইয়ের ময়দানে মুখোমুখি সংঘর্ষ – মানসিক ভাবে শক্তিশালী করতে থাকে ব্লাক্তভিচেকে,অবশেষে বিবেক দংশন তাকে আবার পথে নামায়। ব্লাক্তভিচে সিদ্ধান্ত নেন সিরিয়ার এই সর্বব্যাপী ধ্বংস,গণহত্যা,শিশু,নারী সাধারণ মানুষের দুর্দশার চিত্র যথা সম্ভব রেকর্ড করবেন তিনি, তার তথ্যভিত্তিক ভিডিও,অডিও এবং কিবোর্ড আসাদের বর্বরতার অবসান ঘটাবে একদিন। 
২০১৩ সালে মালেক ব্লাক্তোভিচে তার মত আরও তিন জন স্বাধীন সাংবাদিকের সাথে মিলে তৈরি করেন Hadath Media Center। সম্পদ বলতে কয়েকটা কম্পিউটার আর সহায় বলতে নিজেদের জমানো অর্থ। তাদের এই মাল্টি মিডিয়া সাইট সিরিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বেচ্ছা সেবক নাগরিক সাংবাদিকদের পাঠানো গৃহযুদ্ধের ভিডিও,ছবি,অডিও ক্লিপ ক্রমাগত আপলোড করতে থাকে। যেহুতু এই সমস্ত কর্মকাণ্ড বিনা পয়সায়,অর্থ উপার্জন দূরের কথা যে কোন মুহূর্তে গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা তাই পেট চালানোর দায়ে মালেক ব্লাক্তোভিচে খুলে ফেলেন একটা কাফে আর পাশাপাশি শুরু করেন গরু ছাগল ভেড়া কেনা বেচার ব্যবসা। অবশেষে এই স্বাধীন সংবাদসংস্থার যা হওয়ার ছিল তাই হল, একবছরের মধ্যে আসাদ বাহিনীর ব্যারেল বোমের আঘাতে চুরমার হয়ে গেল Hadath Media Center এর অফিস, ভাগ্য ক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেন ব্লাক্তোভিচে। আসাদের ব্যারেল বোমা ব্লাক্তভিচে এবং তার দুই বন্ধুর সৃষ্ট স্বাধীন নাগরিক সাংবাদিকতার উদ্যোগ ধ্বংস করে দিলেও সিরিয়ার এই গৃহযুদ্ধে ততদিনে গড়ে উঠতে শুরু করেছে অসংখ্য অকুতোভয় যুবকদের স্বাধীন সংস্থা। কোথাও একা কোন সাংবাদিক তার মাত্র একটা স্মার্ট ফোন সম্বল করে যুদ্ধ চালাচ্ছেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোথাও এই ধরনের সাংবাদিকদের ছোট ছোট গ্রুপ। আর এই যুদ্ধের মধ্যেই গড়ে উঠল LCCSy, লোকাল কোঅডিনেশন কমিটি অফ সিরিয়া। সিরিয়ার বিভিন্ন প্রান্তর জুড়ে নিজেদের উদ্যোগে কাজ করে যাওয়া স্বাধীন নাগরিক সাংবাদিক এবং ৭০টির অধিক বিভিন্ন ছোট ছোট নাগরিক সাংবাদিক গ্রুপের সমন্বয় কমিটি এই LCCSy। এই সমন্বয় কমিটি দেশের বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে যাওয়া সাংবাদিকদের একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার স্বাধীন সংস্থা। সরকারি মিডিয়ার বাইরে আমজনতার মিডিয়া। 
সিরিয়ার বিভিন্ন প্রান্তরের গৃহযুদ্ধের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক মতামত এবং আন্তর্জাতিক খবর নিজেদের কমিটির সাংবাদিকদের মধ্যে সংবাদ ভিডিও আদান প্রদান ছাড়াও LCCSy গড়ে তুলছেন যুদ্ধে মৃত সমস্ত মানুষের ব্যাক্তিগত তথ্যের এক বিস্তৃত তথ্য সম্ভার। সমস্ত সিরিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাংবাদিকদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের আঘাতে প্রতিটি মৃত মানুষের ব্যক্তিগত ইতিহাস,পারিবারিক জীবন এবং যথাসম্ভব তথ্য জমা করছেন নিজেদের সার্ভারে। যুদ্ধ আজ না হয় কাল সমাপ্ত হবে কিন্তু এই সমস্ত নিরীহ সাধারণ মানুষের গণহত্যার ইতিহাস যাতে ভবিষ্যৎ সিরিয়া এবং বিশ্ববাসী বিস্মৃত না হয়, সিরিয়াবাসী যেন যুদ্ধের নির্মমতা মনে রাখে তার এক অনবদ্য প্রয়াস এই যথাসম্ভব নিখুঁত, অতি পরিশ্রমসাধ্য তথ্য সম্ভার প্রস্তুতির কার্যক্রম চলছে স্বেছায় এবং সমস্তটাই জনতার সাংবাদিকদের নিজেদের উদ্যোগে। সরকারি, বেসরকারি বা বিদেশী মিডিয়ার সাহায্য ছাড়াই সিরিয়ার সাধারণ জনতা সাংবাদিকরা যুদ্ধের মধ্যে নিয়মনিষ্ঠ ভাবে ইতিহাস রেখে যাচ্ছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। 
এখনো পর্যন্ত LCCSy সবথেকে উল্লেখযোগ্য কাজ ২০১২ সালের দামাস্কাস শহরের প্রান্তে “Daraya” গণহত্যার ভিডিও তথ্যচিত্র। ১৯৮২ সালে সিরিয়ার বর্তমান শাসক বাসার আসাদের পিতা হাফিজ আসাদের জমানায় ‘হামা’ শহরের সুন্নি মুসলমানেরা সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত করলে হাফিজ আসাদের সরকারি বাহিনী পুরো হামা শহর মিলিটারি ট্যাঙ্কের গোলার আঘাতে গুঁড়িয়ে দেয়। আনুমানিক ২০০০০ সুন্নি মুসলমান কে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়, কিন্তু স্বাধীন মিডিয়া, ইন্টারনেট,স্মার্ট ফোন এবং ইউটিউব বিহীন সেই জমানার এই বীভৎস গণহত্যার তথ্য সরকার সহজেই জনচক্ষু এবং বিশ্বের নজরের বাইরে রাখতে সমর্থ হয়। সরকার পুনরায় যাতে সেই হামা শহরের গণহত্যার মতই সমস্ত গণহত্যা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে সমর্থ না হয় সেই উদ্দেশ্যে LCCSy এবং তার সহযোগী স্বাধীন নাগরিক সাংবাদিকরা ২০১২ সালের Daraya গণহত্যার দীর্ঘ এবং তথ্য নিষ্ঠ ডকুমেন্টারি তৈরি করা শুরু করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। আসাদ বাহিনীর হাত থেকে আসাদ বিরোধী বিদ্রোহীরা দামাস্কাসের বাইরে এই Daraya শহর ছিনিয়ে নেয় ২০১২ সালের শুরুর দিকে। মুক্তাঞ্চলে পরিনত হয় Daraya শহর – কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে উন্নত অস্ত্রে বলীয়ান আসাদের বাহিনী Daraya শহর পুনঃদখল করে ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে এবং তার পরে শুরু হয় উন্মত্ত সরকারি বদলার গণহত্যা। প্রতিটি বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় টেনে এনে নির্দোষ সাধারণ জনতা নারী পুরুষ নির্বিশেষে লাইন দিয়ে গুলি চালাতে থাকে আসাদ সমর্থক বাহিনী আর এই নির্মম হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত বিপদের ঝুঁকি নিয়ে ক্যামেরাবন্দি করতে থাকে LCCSy এবং তার সহযোগী স্বাধীন নাগরিক সাংবাদিকরা। বিভিন্ন সাংবাদিকদের সংগৃহীত ভিডিও সম্পাদিত অবস্থায় ইউটিউবে আপলোড হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে বয়ে যায় নিন্দার ঝড়, আসাদ বাহিনী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন এ সব মিথ্যা, জালিয়াতি, বিরুদ্ধ শক্তির অপপ্রচার। কিন্তু LCCSy এর এই ডকুমেন্টারি তিনটে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত নানাবিধ ডকুমেন্ট এবং ভিডিও সূত্রের সত্যতা যাচাই করবার পরে এতটাই নিখুঁত ভাবে সম্পাদিত এবং তথ্যনিষ্ঠ ছিল যে আসাদের চরিত্র এবং বর্বরতা আড়াল করার আর কোন উপায়ই ছিলোনা। আমজনতার সাংবাদিকদের তোলা এই Daraya গণহত্যার ভিডিও তথ্যচিত্র দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে আসাদ বিরোধী রাজনীতির অভিমুখ ১৮০ ডিগ্রী ঘুরিয়ে দেয়। 
বিশ্বের ঐ যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে যেখানে মিডিয়ার প্রবেশ নিষিদ্ধ,প্রতিমুহূর্তে গুলি খাওয়ার সম্ভাবনা সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সিরিয়ার এই অসংখ্য নাম না জানা স্বাধীন উদ্বুদ্ধ জনতার সাংবাদিকতা না থাকলে বিশ্ব জানতেই পারত না আসলে সেখানে ঠিক কি ঘটছে। বিশ্বকে ভরসা করতে হত সরকার সরবরাহকৃত বিভিন্ন সাজানো গোছানো মিথ্যা তথ্যের ওপর। সিরিয়ার এই নাগরিক সাংবাদিক অ্যাক্টিভিস্টদের কাজ কতটা বিপদসংকুল তার নমুনা তুলে ধরেছে পিও রিসার্চ সেন্টার। তাদের তথ্য মতে ২০১১-২০১৩ সালের মধ্যে সিরিয়াতে ৬৫ জন নাগরিক সাংবাদিক যুদ্ধের ছবি তুলতে গিয়ে মারা গেছেন, অন্যদিকে একই সময়ে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার ২৪ জন পেশাদার সাংবাদিক মারা গেছেন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে। কিন্তু তবুও বিপদ মাথায় করে, প্রায় বিনা পয়সায় এই প্রবণতা পুরো আরব দুনিয়াকে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও সংবদ্ধ ভাবে এগিয়ে যাবে বলে প্রমাণিত হচ্ছে। ব্লাক্তভিচে সম্প্রতি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসাবে এক আন্তর্জাতিক পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে লন্ডনে উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে এক সাক্ষাৎকারে বলেন “For 50 years…media was so false,” আরও বলেছেন “Using our mobile phones and cameras we could show the ugly truth of this dictator and we were able to convey our voice to the whole world.” সিরিয়ার মালেক ব্লাক্তোভিচেরা কেবল নাগরিক সাংবাদিকই নন প্রত্যেকে এক একজন গণতন্ত্র স্থাপনের সৈনিক। 
মধ্যপ্রাচ্যে আমজনতার সাংবাদিকতার বিস্তার
দিনকে দিন আধুনিক প্রযুক্তি,ইন্টারনেট এবং অনলাইন মিডিয়ার প্রসার,আধুনিক মোবাইল ফোনের শক্তিশালী ক্যামেরা এবং সরাসরি ভিডিও প্রচারের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রায় রিয়েল টাইম ভিডিও প্রসারণ মধ্য প্রাচ্যে আধুনিক মিডিয়ার পটভূমি দ্রুত পরিবর্তিত করে দিচ্ছে। আমাদের মত বা অধিকাংশ আপাত শান্তির দেশে এই প্রযুক্তি সাধারণ আনন্দ বা সীমিত খবরের মাধ্যম হিসাবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ব্যবহৃত হলেও ২০১০-২০১১এর সময় থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার কিছু অংশে নাগরিক সাংবাদিকতা কেবল শৌখিন ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয় বরং তা এক মুক্তি, স্বাধীনতা, বিদ্রোহ এবং সহমর্মিতার আন্দোলনে পরিনত হয়েছে। ব্লগার, স্বাধীন সাংবাদিক, হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ, টুইটার অ্যাকাউন্ট, ফেসবুক এবং অনলাইন বিশেষ গুপ্ত পোর্টালের মাধ্যমে স্বদেশী এবং বিদেশী ভাষায় খবর ছড়িয়ে যাচ্ছে দ্রুত। মিশরে তাহিরির স্কোয়ারের গণআন্দোলনের পর থেকে এই সাংবাদিকতা মধ্যপ্রাচ্যে আর কোন শৌখিন ব্যক্তিগত সচেতন জনতার উদ্যোগ নয় বরং বর্তমানে তা এক আন্দোলন, রাষ্ট্রের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং মুক্তির স্বাদ। জনতার সাংবাদিকতা সেখানে স্বাধীন শিল্পকর্ম; গ্রেপ্তার, মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে সামাজিক স্বার্থে অকুতোভয় স্বাধীনতা প্রিয় জনতার সক্রিয় যোগদান। ২০১০-২০১১ সালের সময়ে মিশরে তিউনিসিয়ায় এবং সিরিয়ায় যখন লক্ষ লক্ষ জনতা গণতন্ত্রের দাবীতে রাস্তায় নামছে, পুলিশ গুলি চালাচ্ছে, সরকারী দমন, সংবাদ সংস্থায় কঠিন নিয়ন্ত্রণের ফলে সত্য খবর বাইরে আসছেনা তখন সরকারী মাধ্যমকে এড়িয়ে বিপুল জনতার কাছে প্রকৃত খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এর জন্ম। সেই সময়ে মিশরের জনতা Bambuser, Ustrem প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ফোনে তোলা ভিডিও সরাসরি সম্প্রচার করতে শুরু করে। শুধু তাই নয় এই সমস্ত ভিডিও সম্প্রচার হওয়ার পরেও যাতে পরস্পরের মধ্যে বিনিময় করা যায় এবংপরবর্তীতে যাতে এই সমস্ত ভিডিও চাইলেই পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা হতে থাকে। সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এড়িয়ে সাধারণ জনতার কাছে সত্যি খবর পৌঁছে দেওয়ার এই প্রতিস্পর্ধা মুহূর্তের মধ্যে কায়রোতে পুলিশের গুলি চালনার দৃশ্য পৌঁছে দিতে থাকে সারা বিশ্ব জুড়ে। যদিও প্রথাগত সাংবাদিকতার বাইরে সাধারণ মানুষের এই অসাধারণ সাংবাদিকতা আরব স্প্রিং দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়া এবং জনমত সৃষ্টির পেছনে অন্যতম কারণ কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আজকের দিনে নাগরিক সাংবাদিকতা এক বিপুল আন্দোলনে পরিনত হওয়ার পেছনে নানাবিধ অন্যান্য কারণও বর্তমান। তার মধ্যে প্রধান কারণ দীর্ঘদিন যাবত মিশর,ইরাক,সিরিয়া,লিবিয়া,তিউনিসিয়া ইত্যাদি দেশে একনায়কতন্ত্র,আধিপত্যবাদি ক্ষমতার দাপট। অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বেড়ে চলা অসাম্য। দেশের ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীর মধ্যে চূড়ান্ত গোষ্ঠীতন্ত্র,আকণ্ঠ দুর্নীতি এবং ক্রম হতাশ জনতার বিক্ষোভ। একই সাথে ২০০০ সালের মধ্যভাগ থেকে বৈদ্যুতিন যোগাযোগ,মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের বিস্তার গণতন্ত্রের দাবীতে এই নাগরিক সাংবাদিকতাকে আজকে প্রায় আন্দোলনে পরিনত করেছে। রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নজরদারি, যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুল ধরপাকড়,মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর প্রয়াস সত্ত্বেও গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নাগরিক সাংবাদিকতার এই বিপুল এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বৃদ্ধি রোধ করতে প্রায় সমস্ত দেশের সরকার আজকের দিনে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত। প্রতি মুহূর্তে নাগরিক সাংবাদিকতা এতদিনের প্রচলিত সংবাদ মাধ্যমকে প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে এবং নাগরিক সাংবাদিকতার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের বেশি বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নির্ভরতা অর্জন করছে। 
নাজি আলি জের্ফের কথাঃ- 
ব্লাক্তভিচে এবং LCCSy যদি আসাদের কুকীর্তির কথা বিশ্ববাসী কে জানানোর ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন তাহলে ‘নাজি আলি জের্ফ’ আইসিস (ইসলামিক স্টেট) এর কুকীর্তি বিশ্বের দরবারে তুলে আনার পেছনে প্রধান এবং অন্যতম কারিগর। মধ্য প্রাচ্যের এই আইকনতুল্য নাগরিক সাংবাদিক, Hentah monthlyর প্রধান সম্পাদক নাজি জের্ফ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তখন তুরস্কে ‘গাজিয়ানটেপ’ শহরে বসে প্যারিসে যাওয়ার কাগজ পত্র তৈরি করছেন। শেষ মুহূর্তে সহকারীদের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন,তার স্ত্রী এবং দুই শিশুকন্যা ইতিমধ্যে প্যারিসে সরকারি অভিবাসন পেয়ে চলে গেছেন, নাজি জের্ফএর প্লেনের টিকিট পর্যন্ত প্রস্তুত এমন একটা সময়ে প্রকাশ্য দিবালোকে আইসিস গুপ্তঘাতকের হাতে নিজের বাড়ির সামনে খুন হয়ে গেলেন তিনি। প্রশিক্ষিত আইসিস খুনি সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল নিয়ে দিনের পর দিন নাজি জের্ফকে অনুসরণ করেছে, সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছে অবশেষে ২০১৫ সালের ২৭সে ডিসেম্বর ২০১৫ নাজি তাঁর আবাস থেকে বেরোনোর সাথে সাথে একদম কাছ থেকে গুলি চালিয়ে মিশে গেছে জনতার ভিড়ে। 
সিরিয়ায় প্রশিক্ষিত নাগরিক সাংবাদিকদের গেরিলা বাহিনী সৃষ্টির কারিগর ছিলেন নাজি জের্ফ। এক দিকে আসাদ এবং অন্যদিকে আইসিস উভয়েরই চরম শত্রু। নাজি নিজেকে ঠিক সাংবাদিক হিসাবে ভাবতেন না তার নিজের কথায় “our group members do not consider themselves journalists, but activists, dedicated to overthrowing the Assad regime as much as the Islamic State” সহজবোধ্য যে তার জীবনের ঝুঁকি ছিল অপরিসীম। নাজি জের্ফের মৃত্যুর পর ‘রিপোর্টার উইদাউট বর্ডার’ ফরাসী দূতাবাসের প্রতি নাজি জের্ফ এর ভিসার আবেদন পত্র প্রকাশ করে,যেখানে তিনি লিখেছিলেন “I now live in the Turkish city of Gaziantep and my safety is more and more difficult after an increase in the threats to me and my family – above all because I am a secularist and belong to the Ismaili minority, which is targeted by the jihadis.”
নাজি জের্ফ সেই বিরল অকুতোভয় সাংবাদিকদের অন্যতম যিনি এবং তার হাতে গড়া Raqqa Is Being Slaughtered Silently (RBSS) গ্রুপের সদস্যরা নিয়মনিষ্ঠ ভাবে আইসিসের নির্মম অত্যাচারের ডকুমেন্টারি প্রস্তুত করেছিলেন একেবারে আইসিস নিয়ন্ত্রিত তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের রাজধানী রাক্কা শহরের ভেতরে বসে। প্রথম দিকে নাজি জের্ফ সিরিয়ার আসাদ বাহিনীর অত্যাচারের ভিডিও এবং অডিও তথ্য প্রচার করতে থাকেন। নাজির ভাষায় “২০১২ সাল থেকে দেখতে শুরু করলাম আসাদ বাহিনী আমার বন্ধুদের যখন খুশি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং আমরা জানতাম দ্বিতীয় দিনের মাথায় বন্ধুর পরিবার তাদের প্রিয়জনের মৃতদেহ এসে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশের কাছ থেকে খবর পাবে”। এই অত্যচারের তথ্য রেকর্ড করার জন্য নাজি হাতে তুলে নেন ক্যামেরা। আসাদের অত্যাচারের দলিল,তাঁর প্রথম তথ্য চিত্র সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে ‘আল আরাবিয়া’ চ্যানেলে প্রচারিত হয়। সারা বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২মিলিওন মানুষ আজ পর্যন্ত নাজি জের্ফের আলেপ্পো এলাকায় আসাদের অত্যাচারের এই নির্মম দলিলটি দেখছেন। 
এই তথ্যচিত্রটি প্রসারণের মুহূর্তের মধ্যে নাজি জের্ফ আসাদের সরকারি বাহিনীর বিষনজরে চলে আসেন, আসাদের গুপ্ত ঘাতক হন্যে হয়ে নাজিকে খুঁজতে থাকে। বিপন্ন নাজি তাঁর পরিবার সমেত সিরিয়ায় – অনেক সাংবাদিকদের মতই আশ্রয় নিতে বাধ্য হন সিরিয়া তুরস্ক সীমান্ত শহর গাজিয়ানটেপ-এ। ইতিমধ্যে স্বপ্রশিক্ষিত নাজি লক্ষ করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের এই বিপুল পরিমাণ সাংবাদিকদের মধ্যে উৎসাহের অভাব নেই, বিপদের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনস্বীকার্য কিন্তু প্রথাগত সাংবাদিক হওয়ার যে ট্রেনিং,সঠিক সূত্র সহকারে তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়ে পার্টিজান মানসিকতা বাদ দিয়ে যথাসম্ভব নির্লিপ্ত ভাবে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের যে পারিপাট্য, তার যথেষ্ট পরিমাণ অভাব বর্তমান। এই দুর্বলতা থাকা স্বাভাবিক। কারণ দেশে গৃহযুদ্ধর পূর্বে এই বিপুল পরিমাণ উৎসাহী নাগরিক সাংবাদিকদের মধ্যে প্রায় কেউই সাংবাদিকতার পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন না। কেউ ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা স্কুল শিক্ষক অথবা কেউ কেউ নাজির মত আইনজ্ঞ। আর এই পেশাগত দুর্বলতার কারণে সততা থাকলেও অনেক সময়েই খবর অতিরঞ্জিত ও সূত্রের অস্বচ্ছতার ফলে তা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। তুরস্ক সিরিয়ার সীমান্তের সেই গাজিয়ানটেপ শহরে ততদিনে প্রবাদে পরিনত নাজি এই দুর্বলতা দূর করে প্রশিক্ষিত সৈন্যবাহিনীর মত উপযোগী একদল সাংবাদিক বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে দলে দলে নাগরিক সাংবাদিকের সাংবাদিকতার প্রাথমিক ট্রেনিং দিতে শুরু করেন। মুখোমুখি ক্লাস রুম ট্রেনিং,সেমিনার এবং skype প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিডিও ট্রেনিংএর মাধ্যমে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নাজি জের্ফ প্রায় ১০০০ নাগরিক সাংবাদিকদের ট্রেনিং দিয়েছেন। অসংখ্য ছোট ছোট গেরিলা বাহিনীর মত সাংবাদিক বাহিনী তৈরি করে যুদ্ধের সঠিক এবং ধারালো খবর পরিবেশনের জন্য সূত্র সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হাতে তৈরি এই ধরনের গ্রুপের মধ্যে কোহিনূর সমান গ্রুপ Raqqa Is Being Slaughtered Silently (RBSS)। 
RBSS গঠিত হওয়ার আগে আইসিস নিয়ন্ত্রিত বিপুল এলাকার খবরের একমাত্র সূত্র ছিল আইসিস প্রচারিত বিশ্ববাসীকে ভয় দেখানোর জন্য উদ্দেশ্যে নির্মিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের ভিডিও এবং প্রায় হলিউডি দক্ষতায় নির্মিত কিছু প্রচারমূলক ভিডিও – দেখ আমাদের এলাকায় মানুষ কত শান্তিতে বসবাস করছে। প্রায় গুপ্ত গেরিলা বাহিনীর কায়দায় তৈরি RBSSএর সদস্যরা গোপনে, এনক্রিপ্টেড মেসেজ পাঠাতে থাকে সিরিয়ার সীমান্ত শহরে বসবাসকারী নাজি জের্ফের কাছে আর তিনি RBSS-এর টুইটার অ্যাকাউন্ট,ফেসবুক এবং পোর্টালের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিতে থাকেন বিশ্ব জুড়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে RBSS আইসিস সম্বন্ধে বিশ্বস্ত খবর সংগ্রহের সূত্র হয়ে দাঁড়ায়। এপ্রিল ২০১৪ সালে সারা বিশ্ব যখন আইসিস নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত তখন RBSSএর আন্ডারকভার সাংবাদিকরা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ক্যালিফেটের রাজধানী রাক্কার ভেতর থেকে সেখানকার দৈনিক অবস্থার খবর পাঠাতে শুরু করে। আজকে RBSSএর খবরের প্রতি আস্থার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক পেন্টাগনের উচ্চ পর্যায়ের আধিকারিক, সারা বিশ্বের সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার প্রায় ৫০০০০ সদস্য RBSS টুইটার আক্যাউন্টের নিয়মিত অনুসরণকারী। প্রায় ৪৫০০০ এর ওপর বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ নিয়মিত RBSS কে অনুসরণ করে। অন্যদিকে RBSS এর কাজকর্মের ফলে আইসিসের ভেতরের খবর প্রচার এবং প্রকাশ হয়ে যাবার বিড়ম্বনায় RBSS হয়ে পড়ে আইসিসের অন্যতম শত্রু। আইসিস নিয়ন্ত্রিত এলাকার মসজিদের শুক্রবারের নমাজে ইমামরা ফতোয়া দেওয়া শুরু করে যে কেউ যদি খবর পাচারকারী হিসাবে ধরা পড়ে তাহলে ইসলামিক স্টেটের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে তার সাজা হবে। কেবল RBSSএর প্রতি নজরদারির কারণে রাক্কার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বসানো হয় CCTV। ছবি বা ভিডিও লুকানো আছে কিনা তা দেখার জন্য যেখানে সেখানে যখন তখন মোবাইল তল্লাশি শুরু হয়। টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ধমকিপূর্ণ মেসেজ দেওয়া হতে থাকে। তুরস্কে নাজি জের্ফের গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সেই বিস্ফোরণে নাজি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। 
অন্যদিকে RBSS সদস্যরা নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের মত স্লিপার সেল হিসাবে কাজ করা শুরু করে, এমনকি গ্রুপের লোকেরাও একে অপরের পরিচয় বিষয়ে অজ্ঞাত থাকে, মেসেজ পাঠানো হতে থাকে এনক্রিপ্টেড সফটওয়্যারর মাধ্যমে। কিন্তু ভুল তো আর সব সময়ে এড়ানো সম্ভব নয়, RBSSএর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য “মোয়াতাজ বিল্লাহ”, ক্যামেরা, মোবাইল ফোন এবং ভিডিও সমেত ধরা পড়ে যান এক আইসিসের চেকপয়েন্টে। প্রমাণিত হয়ে যায় যে মোয়াতাজ বিল্লাহ খতরনাক সংবাদ সংস্থা RBSSএর সাথে যুক্ত। আইসিসের হাতে এক মাস বন্দী থাকার পর খুন হয়ে যান তিনি। অন্য আরেকটি ঘটনায় গত বছরে এক সাধারণ নাগরিক তেল আবিয়াড শহরে সংযুক্ত বাহিনীর বিমান হানায় আইসিসের বিপুল ক্ষতির ভিডিও পাঠিয়েছিলেন RBSSকে। দুর্ভাগ্য ক্রমে সেই ভিডিও তে ভিডিও প্রেরকের কণ্ঠস্বর ছিল। আইসিস সেই সূত্রে ভিডিও প্রেরক এবং তাঁর অবস্থান খুঁজে বার। তারপর সেই সাধারণ নাগরিক সাংবাদিকের আর কোন খবর নেই। RBSS এর আরেক প্রতিষ্ঠাতা আবু মোহাম্মেদ ২০১৩ সালে আইসিসের বিদেশী জঙ্গিদের ফটো তোলার দায়ে প্রায় ৬ মাস আইসিসের রাক্কার কারাগারে বন্দী ছিলেন। তিনি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাদের কাজের বিপদ সম্বন্ধে বলেছেন “Any mistake means death. If you are arrested, they will kill you।”
যদিও যুদ্ধ ক্ষেত্রের এবং আইসিসের এলাকার ভেতর থেকে পাঠানো খবরের সত্যাসত্য বিষয়ে সন্ধেহ থেকেই যায় তবে এখনো পর্যন্ত RBSS এর কোন স্কুপ বা খবর ভুল বলে প্রমানিত হয়নি। যেমন,গত বছরের জুলাই মাসে রাক্কা শহরের গোপন এলাকায় লুকিয়ে রাখা আমেরিকান সাংবাদিক জেমস ফলি এবং অন্যান্য বিদেশী বন্দীদের উদ্ধার করার জন্য আমেরিকা এক গোপন কমান্ডো অভিযান চালায়। সেই অভিযান যে চূড়ান্ত রূপে ব্যর্থ ছিল তার খবর RBSS রাক্কার ভেতর থেকে ছবি এবং ভিডিও সমেত প্রকাশ করলেও সেই খবরের সত্যতা প্রায় ৬ সপ্তাহ পড়ে আমেরিকার প্রশাসন স্বীকার করে। আমেরিকাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সাংবাদিক জেমস ফলিকে পরবর্তীতে আইসিস ভিডিও ক্যামেরার সামনে হত্যা করে খবর সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়। গত বছরে জর্ডনের পাইলট কে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার খবর RBSS প্রথম বিশ্বের গোচরে আনলেও ঘটনার প্রায় একমাস পরে আইসিস তাদের প্রচার মাধ্যমে ভিডিও প্রচার করে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে। 
নাজি জের্ফের প্রতিষ্ঠিত RBSS যে কেবল যুদ্ধ বা আইসিসের বর্বরতার খবর করে তা নয়। বরং,আইসিস অধিকৃত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক দুর্দশার চিত্র, জল, ওষুধ,বিদ্যুতের অপ্রতুলতা, রেশনের দোকানে লাইন,ভেঙ্গে পরা আর্থ- সামাজিক অবস্থা এবং বিভিন্ন দেশের নির্বিচার বিমান হানায় সাধারণ মানুষের দুর্দশা, আর্তনাদের রিপোর্ট কেবল মাত্র RBSSএর অকুতোভয় সাংবাদিকদের কারণেই আজকে সমস্ত বিশ্ববাসী জানতে পারছেন। প্যারিসে প্রথম সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পরে ফরাসি সরকার রাক্কায় যে নির্বিচার বিমান হানা চালায় RBSS প্রায় রিয়েল টাইম সেই আক্রমণের বীভৎসতার চিত্র রাক্কার ভেতর থেকে প্রসারণ করে। নাজি জের্ফ এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন “We are nonviolent activists. We can’t fight Daesh(ISIS) with weapons. We can only fight them with words,”। সুতরাং আশ্চর্যের নয় কেন আইসিস নাজি জের্ফ কে হন্যে হয়ে খুঁজছিল, নাজি জের্ফ কে দুনিয়ে থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই Raqqa Is Being Slaughtered Silently (RBSS), আইসিসের বিরুদ্ধে সব থেকে প্রবল যোদ্ধার মাজা ভেঙ্গে দেওয়া যাবে। 
অতএব .......
************************************************************************************************************
আজকের দিনে নাগরিক সাংবাদিকতা সিরিয়া ইরাক সহ মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে একপেশে সরকারি প্রচার এবং উলটোদিকে বিদ্রোহীদের প্রচারের মধ্যে যে বিপুল শূন্যতা সেই শূন্যতা পূরনে এক অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করছেন। প্রতিদিন তাদের সংবাদ পরিবেশন উন্নত এবং পেশাদারি দক্ষতা অর্জন করছে। সংবাদ পরিবেশন থেকে পক্ষপাতিতা দূর করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস তাঁরা চালাচ্ছেন এবং বিপুল পরিমাণ জনতার কাছে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, স্থানীয় ভাষায় পৌঁছে দিচ্ছেন বিশ্বস্ত খবর। মধ্যাপ্রাচ্যের এই নাগরিক সাংবাদিকতার এই অসামান্য আন্দোলন সাধারণ জনতাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে উদ্বুদ্ধ করছে,নিরুত্তাপ অবস্থান থেকে নাগরিক যাতে সক্রিয় অবস্থান নেন সেই বিষয়ে বিভিন্ন খবরের মাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদসংস্থা এই বিপুল সংখ্যক স্বাধীন সাংবাদিকদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছে, রাজনৈতিক মতামত সৃষ্টি হচ্ছে আর এই প্রকল্পে নাজি জের্ফরা আইসিস সন্ত্রাসবাদী অথবা আসাদ সরকারের রোষের শিকার হয়ে প্রাণ দিচ্ছেন। সত্য যে কোন ক্ষমতার কাছে অস্বস্তিকর। 
যেখানে প্রথাগত সাংবাদিকতা ব্যর্থ,যুদ্ধের ময়দানে অনুপস্থিত, নির্দিষ্ট মিডিয়া হাউসের রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী খবরকে বিকৃত উপায়ে পরিবেশন করতে বাধ্য,সেখানে স্বাধীন আমজনতার সাংবাদিকতা এখন ভবিষ্যতের নূতন প্রহরী। নাজি জের্ফের মত এই সমস্ত স্বাধীন দেশপ্রেমী সাংবাদিকরা সংবাদের দুনিয়ায় গণতন্ত্র বজায় রাখছেন। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রবিরোধীদের ভূমিকার তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রস্তুত করছেন। সরকার এবং বিদ্রোহীরা যাতে গণতান্ত্রিক অবস্থান বজায় রাখে এবং আরও স্বছ ভাবে কাজ করতে বাধ্য হয় তার জন্য নিরলস কাজ করছেন। আর মধ্য প্রাচ্যের এই নূতন মিডিয়ার দুনিয়ায় নাজি জের্ফ এক অনবদ্য ব্যক্তিত্ব। আজকের দুনিয়া যেখানে জনসেবা ক্রমশ ক্ষীয়মাণ এবং সাংবাদিকতার চরিত্র পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে দ্রুত,সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের এই সমস্ত স্বাধীন নাগরিক সাংবাদিকদের গ্রুপ, ক্রমে আরও বেশি বিশ্বস্ত, বেশি নিরপেক্ষ এবং প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক মতামত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ক্রমশ নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। অন্তত মধ্যপ্রাচ্যে নাগরিক সাংবাদিকতা প্রথাগত মিডিয়ার জায়গা সক্ষম ভাবে প্রতিস্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছে। নাগরিক সাংবাদিকতার এই হটাৎ বিস্ফোরণ সাময়িক কোন ঘটনা নয় বরং এইটাই ভবিষ্যতের ছবি হতে চলেছে। নাজি জের্ফ যেমন বলেছিলেন “To defeat us, they would have to shut down the Internet. And they can’t do that because all of them use the Internet.”
————————————————————————————————————————————————————————
উৎসাহী পাঠক নাজি জের্ফ এবং LCCSyর কাজকর্মের ব্যাপকতার বিষয়ে ধারণার জন্য দেখতে পারেনঃ- http://www.raqqa-sl.com/en/  এবংhttp://www.lccsyria.org/en/  
লেখাটি ‘একক মাত্রা' পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২০১৬ সংখ্যাতে ছাপা হয়েছিল। 

দেশভাগের অভিজ্ঞতাঃ জম্মু ১৯৪৭

বেদ ভাসিন - অনুবাদ শমীক মুখার্জি

নোম চমস্কির একটি লেখা “ দ্য রেসপন্সিবিলিটি অফ দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস ”-এ তিনি ডুইট ম্যাকডোনাল্ডের একটি নিবন্ধের সিরিজের বিষয়ে উল্লেখ করেছিলেন। সিরিজটি ১৯৪৫ সালে পলিটিক্স পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন জনতার দায়, বিশেষত বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়ের দায়িত্বের বিষয়েঃ জার্মানি বা জাপানের মানুষ তাদের সরকারের ঔদ্ধত্যের জন্য কতটা দায়ী? এবং, একই ভাবে, ব্রিটিশ বা আমেরিকান সরকার যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর বোম ফেলে চলেছে, দিনের পর দিন ধরে তাদের যুদ্ধপ্রক্রিয়াকে আরও নিখুঁত করে চলেছে যতক্ষণ না হিরোশিমা বা নাগাসাকির মত ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা সংঘটিত না হচ্ছে, এই যুদ্ধবাজ মানসিকতার জন্য এইসব দেশের নাগরিকরা কতটা দায়ী?
চমস্কি লিখেছেন, “বুদ্ধিজীবিদের দায়িত্বকে মাথায় রেখেই বলছি, প্রশ্ন আরও আছে, যেগুলো আরও বেশি অস্বস্তিকর। বুদ্ধিজীবিদের এমন একটা অবস্থান থাকে যেখান থেকে তাঁরা রাষ্ট্রের মিথ্যেগুলোকে এক্সপোজ করে দেবার ক্ষমতা রাখেন, বিভিন্ন কার্যকলাপের পেছনে রাষ্ট্রের যে সমস্ত গোপন অ্যাজেন্ডা থাকে সেগুলো তাঁরা অ্যানালাইজ করতে পারেন কার্যকারণ বিচার করে উচিত-অনুচিতের বিচার করতে পারেন।  … খুব অল্পসংখ্যক কিছু ব্যক্তিকে পশ্চিমী গণতন্ত্র এই সুবিধে, এই ক্ষমতা, এই ট্রেনিং দেয় যাতে তাঁরা আদর্শ বা ইতিহাসের বিকৃত এবং বিচ্যুত ইন্টারপ্রিটেশনের আড়াল থেকে সত্যিটাকে খুঁজে বের করতে পারেন। ইন্টেলেকচুয়ালদের এটা দায়িত্ব, (যা সাধারণভাবে আমজনতার দায়িত্বের থেকে অনেক বেশি – যে সুবিধে তাঁরা পান তার বদলে) সত্যের সপক্ষে বলা এবং মিথ্যার আবরণ হটিয়ে দেওয়া।”
এই সত্য এবং মিথ্যার উন্মোচন হয় তো কাউকে কাউকে আঘাত করতে পারে, যাদের ধ্যানধারণাই বিভিন্ন তথাকথিত জাতীয়তাবাদী প্রোপাগান্ডার ওপর নির্ভর করে গঠিত। কিন্তু সত্যকে স্বীকার করা এবং তার দায়িত্বের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে যে সম্মান আছে, সে সম্মান আর কিছুতে নেই।
শুরুতে আমি এই বিষয়ে বক্তব্য রাখতে একটু ইতস্তত করছিলাম, ভাবছিলাম সেই সব অন্ধকার, বেদনাদায়ক ভাগ বাঁটোয়ারার দিনগুলোকে মনে করা টিক হবে কিনা, যদিও জানি কিছু বন্ধু সেই সব সময়ের ঘটনাবলীর একটা নিজেদের মত মানে বানিয়ে রেখেছে তাদের মনে। কিন্তু চমস্কির এই বক্তব্য আমাকে উৎসাহিত করল সেই দিনগুলোর কথা বলতে, উপমহাদেশের বাঁটোয়ারার সেই দিনগুলোয় জম্মুতে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কাহিনি বলতে।
আমি এটুকু ভেবে খুশি যে, জম্মু সেদিনকার ধ্বংস আর মৃত্যুর তাণ্ডবের মধ্যে দিয়ে শিক্ষা নিয়েছিল এবং হিংসা-হানাহানির মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিল।
 শুরুতেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে সেই অন্ধকার হিংসা, রক্তপাত আর সাম্প্রদায়িক হানাহানির দিনগুলোর কোনও লিখিত এবং স্বীকৃত রেকর্ড রাখা নেই, আর তাই জোর দিয়ে কালানুক্রমিকভাবে সেই দিনগুলোর কাহিনি বলা আমার পক্ষে খুব কঠিন। এ বিষয়ে যতটুকু যা লেখা হয়েছে, সীমান্তের এপারে বা ওপারে, তার সমস্তটাই নিতান্ত একপেশে এবং রঙ চড়িয়ে লেখা যাতে একপক্ষ অন্যপক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে গেছে, বা অন্যপক্ষের হিংসা দিয়ে নিজের “মানবিক” হিংসাকে জাস্টিফাই করে গেছে। আজ সন্ধ্যেয় আমি আপনাদের যেটুকু শোনাব, তা একান্তই আমার স্মৃতিনির্ভর। আমি আজ আপনাদের আমার স্মৃতি থেকে শোনাব ১৯৪৭ সালের জম্মুর কথা, যখন আমি ছিলাম ১৭ বছরের এক কিশোর, এবং শান্তির পক্ষপাতী। এই স্মৃতিচারণায় আমি আরও কয়েকজন জ্ঞানী বন্ধুদের থেকে তথ্য আহরণ করেছি যাঁরা সেদিনের ঘটনাবলী সাম্প্রদায়িকতার চশমা পরে দেখেন নি।
প্রথমে সংক্ষেপে বলি সেই সময়ের রাজনৈতিক অবস্থার কথা, যখন এই উপমহাদেশ স্বাধীনতা পেতে চলেছে, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক আর কদিন পরেই ভারত এবং পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেবে কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের হাতে।
সেই সময়ে, ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন একটি বয়ান প্রকাশ করে, যার ১৪ নম্বর স্তবকে লেখা ছিল “সম্পূর্ণ ক্ষমতা ব্রিটিশ ক্রাউনের কাছে রাখা সম্ভব নয়, নতুন গঠিত সরকারের কাছেও অর্পণ করা সম্ভব নয়।” শেষ পর্যন্ত এই “সম্পুর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের” টানাপোড়েন শেষ হয় ১৯৪৭ সালের ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্টের মাধ্যমে যার আর্টিকল ৭-এ লেখা ছিল “দ্য সুজেরেইন্টি অফ হিজ ম্যাজেস্টি ওভার দ্য ইন্ডিয়ান স্টেটস ল্যাপসেস।” এর মানে দাঁড়াল ঔপনিবেশিক শাসক চলে যাবার পরে ভারতীয় উপমহাদেশের ছোট ছোট রাজ্যগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে স্বাধীন এবং সর্বভৌম হয়ে যাবে, যাদের সম্পূর্ণ নিজেদের ইচ্ছা থাকবে তাদের ভবিষ্যত বেছে নেবার এবং আইনত কোনও চাপ থাকবে না নবগঠিত ভারত বা পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগদান করার।
মাউন্টব্যাটেনের প্ল্যান ঘোষিত হল তেসরা জুন ১৯৪৭ সালে, লন্ডনের ভাইসরয় লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর এবং এর পর ভারত আর পাকিস্তান, ১৫ই আর ১৪ই আগস্ট দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। সমগ্র উপমহাদেশ সাম্প্রদায়িক উসকানি আর দাঙ্গায় ছেয়ে গেল, বাংলা, বিহার আর পঞ্জাবে ঘটতে থাকল বড় বড় হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ জাতীয় ঘটনা। ইতিহাস প্রত্যক্ষ করল বিশ্বের বৃহত্তম মাইগ্রেশনের প্রক্রিয়া, পাকিস্তানের অধিকৃত এলাকা থেকে হিন্দুদের এবং ভারতের অধিকৃত এলাকা থেকে মুসলিমদের স্থানান্তরণ, হিংসা, হানাহানি আর রক্তের বন্যার তাদের স্বপ্নের দেশের দিকে।
জম্মুর অবস্থা ছিল সংকটপূর্ণ, ভয় এবং অনিশ্চয়তার আবহে ঘেরা। সঠিক খবরের অভাবে দাবানলের মত গুজব ছড়াতে লাগল এবং ধর্মান্ধ নেতারা তাদের মত করে ধর্মের জিগির তুলে দুই সম্প্রদায়কেই একে অপরের বিরুদ্ধে তাতিয়ে তোলার চেষ্টা করে যেতে থাকল। জম্মুর স্থানীয় মিডিয়া “হিন্দু প্রেস” আর “মুসলিম প্রেস” নামে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল এবং দুই পক্ষই তাদের নিজেদের মত করে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত খবর প্রকাশ করতে লাগল। এই পরিস্থিতিতে যা হয়ে থাকে, সবার প্রথমে নিহত হয় সত্য এবং সঠিক তথ্য। লাহোরের কিছু সংবাদপত্র – ইংরেজিতে ট্রিবিউন এবংসিভিল মিলিটারি গেজেট আর উর্দুতে মিলাপ , প্রতাপ এবং জমিনদার হয়ে উঠল খবরের মূল সোর্স। বিশেষ করে উর্দু খবরের কাগজগুলো সমানে প্রতিবেশি দেশের এবং বাকি দেশের বিভিন্ন ঘটনার একতরফা এবং রঙ চড়ানো খবর ছেপে যেতে লাগল। লেখার প্যাটার্ন হত আগুন লাগাবার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু ক্রমাগত হিংসায় রাস্তা এবং রেলপথের ক্ষতি হবার কারণে এই কাগজগুলোও লোকের হাতে এসে পৌঁছতে পারত না নিয়মিতভাবে।
জম্মুর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেরও সাম্প্রদায়িকভাবে মেরুকরণ ঘটে গেছিল, মূল চক্রী হিসেবে উঠে আসছিল মুসলিম কনফারেন্স, হিন্দু মহাসভা বা রাজ্য হিন্দু মহাসভার নাম। এই অঞ্চলের দুই ধর্মের পুরুষপ্রধান এলাকাগুলো একবাক্যে মহারাজার পতাকার তলায় নিজেদের আনুগত্য একত্রিত করেছিল। কংগ্রেস বা ন্যাশনাল কনফারেন্সের মত ধর্মনিরপেক্ষ পার্টিগুলোর এই অঞ্চলে তেমন উপস্থিতি ছিল না – মিরপুর বাদে, এখানে রাজা মহম্মদ আকবরের নেতৃত্বে ন্যাশনাল কনফারেন্সের শক্ত ঘাঁটি ছিল। এমনকি ছাত্রদের সংগঠনও ধর্মীয় সংস্থাগুলোর হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল – আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার তরফে হিন্দু স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবং মুসলিম কনফারেন্সের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন – এরা তাদের নিজের নিজের মত করে সাম্প্রদায়িকতার তাস খেলে চলছিল যেগুলো ছাত্রদের উসকে দেবার কাজ করত। আমরা যুক্ত ছিলাম জম্মু স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সঙ্গে, যেটা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা ধরে থাকা একমাত্র যুব-সংগঠন। যদিও এরা ন্যাশনাল কনফারেন্সের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল, তবে এরা স্বাধীনভাবেই কাজ করত এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখবার জন্য সবরকমভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেত। ১৯৪৬-৪৭ সাল নাগাদ আমি ছিলাম এই সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি, আর আমার সঙ্গে সেই সময়ে ছিলেন আবদুল খাদিক আনসারি, বলরাজ পুরি, নীলাম্বর দেবশর্মা, বেদ পাল দীপ, রাম নাথ মেঙ্গী, ভূপিন্দর সিং, ইন্দরজিৎ জলি, গুরচরণ সিং ভাটিয়া এবং আরও অনেকে – এদের বেশির ভাগই ছিলেন এই সংগঠনের ফাউন্ডার মেম্বার।
মাউন্টব্যাটেনের ঘোষণা রাজ্যে একটা বিশাল পরিবর্তনের ঢেউ বয়ে এনেছিল। উপমহাদেশ যখন দুটো নতুন দেশের স্বাধীনতার জন্য তৈরি হচ্ছিল, তখন জম্মু-কাশ্মীরে ঘনিয়ে আসছিল সংকট, এক এলোমেলো অবস্থা। মহারাজা হরি সিং কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলেন না, শোনা যাচ্ছিল তিনি জম্মু-কাশ্মীরকে আলাদা একটি স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে ঘোষণা করতে চলেছেন। গুজব চলছিল, তাঁর ধর্মীয় গুরু স্বামী সন্ত দেব, যাঁর কথা মহারাজা খুব মেনে চলতেন, তিনি নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে জম্মু কাশ্মীর এক বিশাল স্বতন্ত্র হিন্দু রাষ্ট্রের অংশ হবে। অন্যদিকে রাম চাঁদ কাক, জম্মু কাশ্মীরের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাশ্মীরের ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিরোধী ছিলেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত মনোবাসনা ছিল এক স্বাধীন স্বতন্ত্র জম্মু-কাশ্মীর রাষ্ট্রের।
কাক ন্যাশনাল কনফারেন্সকে খুব সহযোগিতা করতেন না, এ কথা সবাই জানত এবং তিনি আর মহারাজা – কেউই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষপাতি ছিলেন না। শেখ আবদুল্লা তখন জেলবন্দী, তাঁর তৈরি করা ন্যাশনাল কনফারেন্সও স্বাধীন কাশ্মীরের আইডিয়ার খুব একটা বিরোধী ছিল না সেই সময়ে। কিন্তু মহারাজা আর শেখ আবদুল্লার মতানৈক্যের জন্যই তাঁরা একসাথে সেই কমন-স্বপ্নকে সফল করবার কাজে নিযুক্ত হতে পারেন নি।
জুন মাসের তিন তারিখের প্ল্যানের পর থেকেই মহারাজার ওপরে কংগ্রেস আর মুসলীম লীগ লাগাতার চাপ দিতে থাকে ভারত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রে কাশ্মীরের যোগদানের জন্য। কিন্তু মহারাজা কোনওদিকেই সমর্থন না জানিয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষেই তাঁর মত ব্যক্ত করেন। শোনা যায়, কাক, মহারাজাকে বারণ করেন কনস্টিট্যুট অ্যাসেমব্লিতে যোগদান করতে – তাতে তাঁর মুসলিম প্রজারা অসন্তুষ্ট হত। ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেই গান্ধিজী পয়লা আগস্ট শ্রীনগরে আসেন মহারাজার সঙ্গে দেখা করতে। যদিও গান্ধিজী বলেছিলেন এই যাত্রা কোনওভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, তিনি শুধুমাত্র মহারাজাকে কথা দিয়েছিলেন শ্রীনগর বেড়াতে আসবেন, তাই এসেছেন, তবু এটা বুঝতে কোনও অসুবিধেই ছিল না যে তিনি এসেছিলেন মহারাজাকে ভারত রাষ্ট্রে যোগদানের সুবুদ্ধি জোগাতে। গান্ধিজী ফিরে গেলেন জম্মু হয়ে, যেখানে তিনি তেসরা জুনের তারিখটিতেও এসেছিলেন। স্থানীয় ন্যাশনাল কনফারেন্স তাঁর জন্য জম্মুতে একটি ছোটখাটো সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করেছিল, তাঁকে একটি প্রাইভেট বাড়িতে রাখা হয়, কারণ ন্যাশনাল কনফারেন্স স্থানীয় পুলিশকে গান্ধিজীর নিরাপত্তার দায়িত্ব দিতে চায় নি। সেই দায়িত্ব পেয়েছিলাম আমি, জনা-পঞ্চাশ বিশ্বস্ত যুবক যুবতীর দ্বারা তৈরি একটি সুরক্ষা বলয় আমি তৈরি করে দিয়েছিলাম গান্ধিজীকে রক্ষা করার জন্য। তারা সেই বাড়িতে, এবং সন্ধ্যেবেলায় কাছেই একটা চকে তাঁর প্রার্থনাসভাতে তাঁর নিরাপত্তার কাজে নিযুক্ত ছিল। সেখান থেকে গান্ধিজী সিয়ালকোট চলে যাবার কথা ছিল। কোথাও কোনও ঘোষণা করা হয় নি এই প্রার্থনাসভার ব্যাপারে, লাউডস্পিকার ব্যবহার করা বা প্রকাশ্য জনসভা করাও তখন নিষিদ্ধ ছিল, তবুও কী করে যেন খবর পেয়ে কয়েক হাজার লোক জড়ো হয়েছিল তাঁর সভায়। সেই সময়ে ঐ এলাকায় আরএসএসের কর্মীরা গান্ধিজীর বিরুদ্ধে হেট-ক্যাম্পেন চালাচ্ছিল। তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা তাই খুব চিন্তিত ছিলাম, আমরা সবাই মিলে পুরো জনসভাটাকে বৃত্তাকারে ঘিরে ছিলাম। গান্ধিজী মূলত শান্তি এবং সৌহার্দ্যের ওপরেই তাঁর বক্তব্য পেশ করেন।
কাশ্মীর কীভাবে ভারতের ‘অন্তর্ভূক্ত’ হল, সে বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনায় আমি যাচ্ছি না; কারণ সে ইতিহাস খুব ভালোভাবে লিখিত হয়ে রয়েছে, প্রায় সকলেই সে ইতিহাস জানেন। গান্ধিজীর শ্রীনগর আসার পরে পরেই ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত এগোতে থাকে এবং ধারণা করা হয় অনিচ্ছুক মহারাজা ক্রমশ ভারতে অন্তর্ভূক্তির পক্ষে সায় দেন। রাম চাঁদ কাককে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করা হয়, এবং কয়েক দিন পরে তাঁর বিরুদ্ধে একটি কেস দায়ের করা হয়। মেজর জেনারেল জনক সিং নামে মহারাজার জনৈক বিশ্বাসভাজন নতুন প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ নেন। তাঁর পদগ্রহণের সাথে সাথেই জমু-কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ ঘিরে অনিশ্চয়তা শেষ হতে থাকে এবং এটা পরিষ্কার হতে থাকে যে মহারাজা, ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) আর কংগ্রেস মিলে রাজ্যটির ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে চলেছেন। কাকের অপসারণে এনসি অত্যন্ত খুশি হয়েছিল, তারা এটাকে তাদের জয় হিসেবে দেখেছিল। এগারোই আগস্ট তারিখে কয়েকশো এনসি সমর্থক শ্রীনগরের সেক্রেটারিয়েট কম্পাউন্ডে জড়ো হয়ে জনক সিংকে সম্বর্ধনা জানান, শ্লোগান ওঠে ‘মহারাজা বাহাদুর কি জয়’, ‘জনক সিং জিন্দাবাদ’ এবং ‘শেখ আবদুল্লা জিন্দাবাদ’। শেখ আবদুল্লা জেল থেকে ছাড়া পেলেন ২৯শে সেপ্টেম্বর, প্রায় দু লাখ কাশ্মীরি মহাসমারোহে তাঁকে রাজকীয় সম্বর্ধনা জানিয়েছিল। তিনি তাদের অনুরোধ করলেন শান্তি আর সম্প্রীতি বজায় রাখতে, আর মহারাজার প্রতি নিজের আনুগত্য ব্যক্ত করলেন। মহারাজার সঙ্গে দেখা করতে যাবার আগে তিনি মহারাজার প্রতি নিজের আনুগত্য জানিয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন –
“মহারাজাধিরাজের জয় হোক।
এ দেশের সমস্ত শুভার্থীর কাছে এটা এখন স্পষ্ট যে অতীতে যে সমস্ত দুঃখজনক ঘটনা এখানে ঘটে গিয়েছে, সেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা তৈরি করা, তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য … আমি মহারাজাধিরাজকে আশ্বস্ত করতে চাই এই বলে যে, অতীতে যা-ই ঘটে থাকুক, আমি এবং আমার পার্টি কখনওই মহারাজাধিরাজের বিরুদ্ধে, তাঁর বংশের বিরুদ্ধে বা তাঁর সিংহাসনের বিরুদ্ধে কোনওরকমের চিন্তাধারায় যুক্ত ছিলাম না। এই সুন্দর দেশের উন্নতি এবং এই দেশের মানুষদের সুখ সাচ্ছন্দ্য আমাদের সাধারণ লক্ষ্য এবং এই লক্ষ্যপূরণে আমি এবং আমার পার্টি সদাসর্বদা আপনার সমর্থনে থাকবে। শুধু তাই নয়, আমি মহারাজাধিরাজকে আশ্বস্ত করতে চাই এই বলে যে, দেশে এবং দেশের বাইরে কোনো পার্টি যদি আমাদের এই লক্ষ্যপূরণে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তারা আমাদের শত্রু হিসেবে পরিগণিত হবে।
… এই চিঠি শেষ করার আগে আমি আবার মহারাজাধিরাজকে বিনীতভাবে আমার আনুগত্য নিবেদন করতে চাই এবং প্রার্থনা করি, ঈশ্বর মহারাজাধিরাজের রাজত্বে শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি এবং সুশাসন বলবৎ রাখুক যেন এই রাজ্য জগতের সেরা হিসেবে পরিগণিত হয়।
মহারাজাধিরাজের একান্ত অনুগত
এস এম আবদুল্লা”
মেহর চাঁদ মহাজন শ্রীনগরে এসে মহারাজার সাথে দেখা করলেন, চারদিকে তখন গুজব চলছে, ইনিই জনক সিং-এর জায়গায় প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। অবশেষে সত্যিই প্রধানমন্ত্রী হবার পরে মহাজন ১৬ই অক্টোবর ঘোষণা করলেন, তিনি কাশ্মীরকে প্রাচ্যের সুইটজারল্যান্ড বানাবেন। শাসনব্যবস্থা তিনি ওপর থেকে ঢেলে সাজালেন। রাম নাথ শর্মা নামে এক সেশনস জাজ চৌধরি নিয়াজ আহমেদকে সরিয়ে মুখ্যসচিব হলেন। এর পর মহাজন দিল্লি গেলেন নেহরুর সঙ্গে দেখা করতে, তার ঠিক পরে পরেই ২৬শে অক্টোবর মহারাজা চলে গেলেন জম্মুতে, ভি পি মেননের সঙ্গে দেখা করে তিনি ভারত অন্তর্ভূক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন। শেখ আবদুল্লা শাসনব্যবস্থার শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে সম্মানিত হলেন। এক ঐতিহাসিক মিছিল তাঁকে নিয়ে চলল শ্রীনগরের লাল চকে, যেখানে শেখ আবদুল্লা ভারত এবং নেহরুর প্রতি তাঁর আনুগত্য ঘোষণা করলেন এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে – যে খুব শিগগিরই গণভোটের মাধ্যমে জেনে নেওয়া হবে কাশ্মীরের ভবিষ্যতের বিষয়ে জনতার মতামত, ততক্ষণ পর্যন্ত কাশ্মীরের ভারতের অংশ হয়ে থাকা এক অস্থায়ী স্থিতি মাত্র। কিন্তু ততদিনে পাকিস্তান থেকে লুটেরার দল ঢুকে পড়েছে জম্মু আর কাশ্মীরে, লুণ্ঠন, খুন, ধর্ষণ – দুই সম্প্রদায়ের পুরুষ আর মহিলাদের ওপরেই, অরাজকতা এসে পৌঁছেছিল শ্রীনগরের খুব কাছে। এ ইতিহাসও খুব ভালোভাবে লিখিত, এর বিস্তারিত বিবরণে যাবার প্রয়োজন নেই।
আগেও বলেছি, জম্মুর রাজনীতি সাম্প্রদায়িক চরিত্রের ছিল। শুধু একবারই, ১৯৪৩ সালের রোটি আন্দোলনের সময়ে হিন্দু আর মুসলমানরা হাতে হাত মিলিয়ে প্রতিবাদ করেছিল আসন্ন দুর্ভিক্ষের কালে, একটিমাত্র ব্যানারের তলায়, এবং পুলিশের গুলিতে প্রায় ডজনখানেক লোক মারা যান, যাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলিম। এটুকু বাদ দিলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এই শহরের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল।
ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান ঘোষিত হবার পরে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল। হিন্দু সভা দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেল, একদল মহারাজা-সমর্থক পণ্ডিত প্রেম নাথ ডোগরার সমর্থনে নাম নিল রাজ্য হিন্দু সভা। এদের দাবি হল কাশ্মীর রাজ্যের ভবিষ্যত মহারাজাই নির্ধারণ করবেন, আর তাঁর সমস্ত সিদ্ধান্তে সহমত জানাবে মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন সদস্যদের দ্বারা গঠিত এই দল, যাদের সত্যিকারের মনোগত বাসনা ছিল কাশ্মীর স্বতন্ত্র স্বাধীন একটা দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। অন্য অংশটি গোপাল দত্ত মেঙ্গির নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত নিল যে তারা সম্মিলিতভাবে মহারাজাকে অনুরোধ করবে কাশ্মীরকে ভারত ইউনিয়নের মধ্যে পাকাপাকি অন্তর্ভূক্ত করতে। মুসলিম লীগের ছায়ায় প্রতিপালিত মুসলিম কনফারেন্স কোনও সিদ্ধান্তেই আসতে পারে নি এই সময়ে।
২৮শে মে, ১৯৪৭, একটি প্রেস কনফারেন্সে মুসলিম কনফারেন্সের কার্যকারী সভাপতি চৌধরী হাবিবুল্লাহ্‌ বললেনঃ
“কাশ্মীরের পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্তি হিন্দুদের সমস্যায় ফেলবে, আর ভারতে অন্তর্ভূক্তি মুসলমানদের সমস্যায় ফেলবে। সুতরাং, আমরা ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে কোনওরকমের বিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে চাই না। তা ছাড়াও আমরা এই রাজ্যটির সম্পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য চেষ্টা করব। এখন আমাদের সামনে প্রশ্ন এই, এ বিষয়ে মহারাজার অবস্থান কী? আমরা তাঁকে যথাযথ আনুগত্য এবং সম্মান প্রদর্শনে কখনও বিচ্যুত হই নি এবং এই কারণেই আমরা কখনও কুইট কাশ্মীর আন্দোলনকে সমর্থন জানাই নি, যদিও সেটা এক দিক থেকে একটা স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল। অতএব আমরা এমন একটা অবস্থান নিতে চাই, যেটা মহারাজাকেও তাঁর অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করবে, একই সাথে তাঁর প্রজাদেরও সন্তুষ্ট রাখবে। সেরা সমাধান, আমাদের মতে, মহারাজাকে সাংবিধানিকভাবে রাজা বলে স্বীকার করা হোক, বিভিন্ন দেশে যে রকম নিয়ম আছে, … এর সাথে আমরা আমাদের একটা সাংবিধানিক সংসদ বানাব যার মাধ্যমে আমরা আমাদের সংবিধান তৈরি করব …
আমার সাথে মুসলিম কনফারেন্সের সমস্ত নেতা এবং চৌধরি গুলাম আব্বাস খানের পূর্ণ সমর্থন আছে এই বিষয়ে। মুসলিম কনফারেন্সের তরফে একটি রিপ্রেজেন্টেটিভ কনভেনশন আহ্বান করা হবে এক মাসের মধ্যে যেখানে এই প্রোপোজালটি সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত হবে। অতএব, এই প্রোপোজালটিকে মুসলিম কনফারেন্সের তরফ থেকে অফিশিয়াল হিসেবে মেনে নেওয়া যেতে পারে। এটি মুসলিম লীগের মস্তিষ্কপ্রসূতও নয়, আমরা এটিকে ব্যবহার করে হিন্দুদের ধোঁকা দেবারও চেষ্টা করব না। আমরা বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণ বিবেচনা করে সততার সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। মুসলিম লীগের সাথে আমাদের একমাত্র সম্পর্ক এই যে, ভারতের দখলদারির বিরুদ্ধে মুসলীম লীগের প্রাক্তন ও বর্তমান নীতি আমাদের বলীয়ান করেছে। সম্পূর্ণ সততার সাথে আমি জানাচ্ছি যে এই বিষয়ে আমাদের সাথে মুসলিম লীগের কোনও নেতা বা কর্মীর সাথে কোনও আলোচনা হয় নি। মুসলিম লীগের থেকে আমরা এই ব্যাপারে কোনও নির্দেশ চাই না, এবং হিন্দুরাও কংগ্রেসের মাধ্যমে আমাদের যেন কোনও উপদেশ দিতে না আসে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ আমাদের সংশ্রব ত্যাগ করে; আমরাও ওদের সাথে কোনও রকম সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছুক নই। আমরা যে বলছি আমরা হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান, দুইয়ের থেকেই আলাদা হতে চাই, এর সত্যিকারের মানে হচ্ছে, আমরা দুজনের সাথেই বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চাই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকবে আমাদের সাথে পাকিস্তানের এবং একজন হিন্দু মহারাজার নেতৃত্বে ভারতের সঙ্গেও আমাদের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে।”
মুসলিম কনফারেন্সের কার্যকরী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হল ১৮ জুলাই, ১৯৪৭ সালে। কার্যকরী কমিটি, সবদিক বিবেচনা করে চৌধরী হামিদুল্লাহ্‌র বয়ানকে সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন জানাল, এবং সর্বসম্মতিক্রমে মহারাজার ওপরে কাশ্মীরের স্বাধীনতা ঘোষণা করার দায়িত্ব ন্যস্ত করল এবং জানাল এ বিষয়ে পার্টি সবরকমভাবে সাহায্য এবং সমর্থন জানাবে।
অবশ্য, খুব তাড়াতাড়িই তারা ডিগবাজি খেল, পেছন থেকে মুসলিম লীগ মেন্টরদের কলকাঠি নাড়াবার ফলে অচিরেই আরেকটি জমায়েতে তারা জানাল যে তারা “পাকিস্তানের অংশ হিসেবে নিজেদের পরিগণিত করে ধন্য মনে করছে এবং কায়েদ-এ-আজমকে অভিনন্দন জানাচ্ছে” ।
কাশ্মীরের পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্তিকে সমর্থন জানিয়ে সেই জনসভায় বলা হলঃ
“…অতএব, এই রাজ্যের পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্তি খুবই প্রয়োজনীয়।
এই সভা মহারাজার কাছে দাবি পেশ করছে যে, কাশ্মীরের জনতা পূর্ণ আভ্যন্তরীণ স্বরাজ পাক, মহারাজা তাদের সাংবিধানিক নেতা হোন এবং একটি সংসদীয় দল গঠন করা হোক, প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি এবং যোগাযোগের মন্ত্রকগুলি পাকিস্তানের সংসদের হাতে তুলে দেওয়া হোক।
এই সভা ঘোষণা করছে যে, যদি কাশ্মীরের সরকার আভ্যন্তরীণ বা বাইরের কোনও চাপের মুখে পড়ে মুসলিম কনফারেন্সের দাবি মেনে না নেয় বা এর প্রস্তাবনা-মাফিক কাজ না করে, এবং এই রাজ্যকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, কাশ্মীরের সমস্ত মানুষ একত্রিত হয়ে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করবে।”
জম্মুতে, ন্যাশনাল কনফারেন্সও এই প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে ছিল। এনসির নন-কমিউনিস্ট সদস্যরা একটি মিটিং-এ প্রস্তাবনা আনল যে মহারাজার কাছে শেখ আবদুল্লার মুক্তির দাবি জানানো হোক, জনমত নিয়ে সরকার গঠিত হোক এবং কাশ্মীর ভারতে সংযুক্ত হোক। অন্যদিকে প্রো-কমিউনিস্ট অংশটি মোতি রাম বাইগ্রার নেতৃত্বে প্রস্তাবনা আনল, শেখ আবদুল্লার মুক্তির দাবি জানানো হোক এবং জনতাকে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা দেওয়া হোক ভারত বা পাকিস্তানে সংযুক্তিকরণের ব্যাপারে। এই অংশের বেশির ভাগই অবশ্য স্বতন্ত্র জম্মু-কাশ্মীর গঠনের পক্ষপাতি ছিলেন।
ভারতের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির দিন জম্মুর আবহাওয়া থমথমে ছিল। সারা ভারতে যে উল্লাস উদ্দীপনার মাধ্যমে স্বাধীনতাকে অভ্যর্থনা জানানো হচ্ছিল, সেই উল্লাস জম্মুতে অনুপস্থিত ছিল। স্থানীয় কংগ্রেস এবং ভারতপন্থী এনসি সদস্যরা এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ভারতের স্বাধীনতাকে স্বাগত জানান এবং তিরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করেন।
জম্মুর রাস্তায় রাস্তায় মহারাজার পতাকার সঙ্গে অসংখ্য ব্যানার লাগানো হয়েছিল হিন্দু রাজ্য সভা এবং আরএসএসের তরফে, “মহারাজাধিরাজ স্বাধীন জম্মু, কাশ্মীর, লাদাখ, তিব্বতের একচ্ছত্র অধিপতি”, স্পষ্টতই তাদের দাবি বোঝা যাচ্ছিল। (অবশ্য পরে জনাদেশের মাধ্যমে সরকার গঠিত হবার পরে যখন স্টুডেন্টস ইউনিয়ন তখনকার প্রিন্স অফ ওয়েলস কলেজের মাথায় ভারতের জাতীয় পতাকা এবং লাঙলের ছবি-ওলা লাল রঙের এনসি পতাকা উত্তোলন করে, তখন আরএসএস সমর্থকেরা এই ব্যানার পোস্টারগুলো ছিঁড়ে ফেলে, এবং এর পরে পরেই ইউনিয়নের কর্মীদের ওপর আক্রমণ করে)
মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান ঘোষিত হবার পরে পরেই জম্মুতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়ছিল, হিন্দু সভা-আরএসএস এবং মুসলিম কনফারেন্স প্রত্যেকেই নিজেদের সাধ্যমত সাম্প্রদায়িকতার আগুন ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছিল। উত্তেজনা আরও বাড়ে যখন এক বিপুল সংখ্যক হিন্দু এবং শিখ পঞ্জাব এবং NWFP (নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স) থেকে, এমনকি বর্তমান পাকিস্তানের অধীনে থাকা বিভিন্ন এলাকা থেকেও জম্মুতে আসতে শুরু করে। পুঞ্ছ সেক্টরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে যখন মহারাজার প্রশাসন সেখানকার একটি জায়গীর নিজের রাজ্যের অন্তর্গত করে নেন ও সেখানে কিছু কর বসান, ফলে একটা অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের আন্দোলন সেখানে দানা বাঁধে। এই আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে মহারাজার প্রশাসন শুরুতেই কঠিন দমন-পীড়নের আশ্রয় নেয়, ফলে এই অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন অচিরেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয়।
মহারাজার প্রশাসন তাঁর অধীনস্থ সমস্ত মুসলিমদের অস্ত্র সমর্পণ করতে আদেশ দেয়, শুধু তাই নয়, ডোগরা আর্মি এবং পুলিশ বিভাগেও যে সমস্ত মুসলিম ছিলেন, তাঁদেরও আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়, কারণ তাদের আনুগত্যে সন্দেহ করা হয়েছিল। মহারাজার ভীম্বার যাত্রার পরে সেখানে বড় মাত্রায় হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। এর ফলে পুঞ্ছ, পুলান্দরি, বাগ এবং সুধনোতি এলাকার এক বিশাল সংখ্যক জনতা, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইংরেজ সৈন্যদলের হয়ে লড়াই করেছিল, তারা সরাসরি মহারাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল।
এই সব দিনের কোনও সঠিকভাবে লিখিত ইতিহাস কোথাও রাখা হয় নি, ফলে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বলা খুব মুশকিল আসলে কী ঘটেছিল। ডোগরা আর্মির ট্রুপ পুঞ্ছ, বাগ, রাওয়ালকোট এবং অন্যান্য এলাকায় মোতায়েন করা ছিল। হিন্দু সৈন্য আর মুসলমান প্রাক্তন-সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধল। পুঞ্ছ এলাকা থেকে মুসলমানরা বেশির ভাগই পালিয়ে গেল অন্যদিকে, আবার বাগ, পুলান্দরি, রাওয়ালকোট এবং অন্যান্য এলাকা থেকে হিন্দু আর শিখরা দলে দলে পুঞ্ছের দিকে চলে আসতে লাগল।
২১শে অক্টোবর তারিখে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অফ ইন্ডিয়ার নিউ দিল্লির একটি রিপোর্টে শেখ আবদুল্লাকে উদ্ধৃত করা হয়েছে এই সময়ের ওপরেঃ
“পুঞ্ছের আজকের এই সমস্যা, এই সামন্ততান্ত্রিক অশান্তির মূল কারণ হচ্ছে কাশ্মীর রাজ্যের গৃহীত নীতি। পুঞ্ছের মানুষদের এই যে নির্যাতন, একবার স্থানীয় শাসকের হাতে, একবার সেই শাসকের শাসক কাশ্মীর দরবারের হাতে, এই নিরন্তর নির্যাতন এক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, জনতার আন্দোলন, এই নির্যাতনের অভিযোগের বিরুদ্ধে। এই আন্দোলন সাম্প্রদায়িক নয়। কাশ্মীর রাজ্য তার সৈন্য দিয়ে দমন-পীড়ন চালিয়েছে, পুঞ্ছের মানুষ আতঙ্কিত। পুঞ্ছের বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষই ভারতীয় সেনাবাহিনির প্রাক্তন সেনা, যারা ঝিলম আর রাওয়ালপিণ্ডির মানুষদের সাথে খুব গভীরভাবে যুক্ত ছিল। ঘরের নারী আর বাচ্চাদের ফেলে তাদের পালাতে হয়েছে, সীমা পেরিয়ে তারা অন্যপারের লোকেদের থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আবার ফিরে এসেছে। তাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে কাশ্মীরের সেনাকে কয়েক জায়গায় পিছু হঠতে বাধ্য হতে হয়েছে।”
খবর পাওয়া গেল যে, সংলগ্ন মিরপুর এলাকাতেও এক্স-সার্ভিসম্যানদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে কাশ্মীরের সেনাবাহিনিকে। অভিযোগ এল যে, মুখোমুখি লড়াইতে নামতে গিয়ে সেনা প্রচুর নিরপরাধ মানুষকে মেরে ফেলেছে, তাদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং তারপরে দাবি করেছে যে তারা বিদ্রোহীদের প্রতিহত করেছে। কাশ্মীরের প্রশাসন সরাসরি এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে বিদ্রোহীদের সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করা হয়েছে, এবং বিদ্রোহীরাই হিন্দু আর শিখদের ওপরে আক্রমণ চালিয়েছে।
জম্মুতে ঘটল নৃশংসতম গণহত্যা। গুজবের পর গুজব ছড়ালো যে মুসলমানরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হিন্দুদের আক্রমণ করছে, এবং তার ফলে যা হবার তাই হল – সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।
১৯৪১-এর জনগণনা অনুযায়ী জম্মু প্রভিন্সের জনসংখ্যা ছিল মোটামুটি ২০ লাখ, যার মধ্যে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ১২ লাখ। জম্মু জেলার জনসংখ্যা ছিল সাড়ে চার লাখ, এর মধ্যে মুসলমান ছিল এক লাখ সত্তর হাজার। জম্মু শহরের জনসংখ্যা ছিল মাত্র পঞ্চাশ হাজার, এর মধ্যে মুসলমান ছিল মাত্র ষোল হাজার। সেপ্টেম্বরের শেষাশেষি সীমান্ত এলাকার বিষ্ণাহ, আর এস পুরা, আখনূর এলাকা থেকে এক বিপুল সংখ্যক মুসলমান পাকিস্তানের সিয়ালকোটের দিকে পালায়। পঞ্জাবে তখন পুরোদস্তুর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে, ফলে জম্মুর সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলতে খুব তাড়াতাড়ি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছিল। ফলে, আর এস পুরা আর কাথুয়া থেকে মুসলমানরা সিয়ালকোটের দিকে যখন চলে যাচ্ছিল, তখন অন্যদিক থেকে হিন্দু আর শিখরা শরণার্থী হয়ে চলে আসছিল জম্মুতে। সিয়ালকোট থেকেও এক বিশাল সংখ্যক হিন্দু আর শিখ জম্মু শহরের দিকে চলে আসে, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তাদের আশ্রয় বা শরণ দেবার মত কোনও সংস্থানই ছিল না। বেসরকারি লেভেলে কিছু রিলিফ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। কিছু শরণার্থী তাদের পরিচিতজনের বাড়িতে আশ্রয় পেল, বাকিদের আশ্রয় হল প্যারেড গ্রাউন্ডে এবং অন্যান্য এলাকায়, খোলা আকাশের নিচে। সিয়ালকোট থেকে শেষ ট্রেন নিয়ে এল আরও অসংখ্য হিন্দু আর শিখ শরণার্থী।
উধমপুর জেলায় দলে দলে মুসলমানদের খুন হবার খবর আসছিল; উধমপুর শহর, চেনানি, রামনগর এবং রেয়াসি  এলাকা থেকে বিশেষত। ভাদেরওয়াতেও মুসলমানদের দলে দলে খুন করা হচ্ছিল। এই হত্যাকাণ্ডে মূল ভূমিকা ছিল আরএসএসের, তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল একদল অস্ত্রধারী শিখ শরণার্থী, যারা এমনকি জম্মুর রাস্তায় খোলা তলোয়ার হাতে প্যারেডও করেছিল। এই দাঙ্গা আর গণহত্যা সুচারুভাবে পরিকল্পনা এবং পরিচালনা করছিল আরএসএস, এবং উধমপুর-ভাদেরওয়াতে যারা এই দাঙ্গার মূল হোতা ছিল, পরিহাসের বিষয়, তাদের কয়েকজন পরে এনসি-তে যোগ দেয়, এবং পরে মন্ত্রীও হয়। ছাম্ব, দেবা বাতালা, মানাওসার এবং আখনূরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডের খবর আসছিল, লোকজন প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে হয় অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল, অথবা জম্মু শহরে চলে আসছিল। কাথুয়া জেলাতেও বড় মাপে হত্যাকাণ্ড ঘটছিল, মুসলমানদের কচুকাটা করা হচ্ছিল, মেয়েদের হয় ধর্ষণ কিংবা অপহরণ করা হচ্ছিল। বিলাওয়ার এলাকায় হিন্দু সাম্প্রদায়িক গুণ্ডারা যথেচ্ছভাবে মুসলমান পুরুষদের খুন করছিল আর মেয়েদের ধর্ষণ অপহরণ করছিল। মাচেদি এবং আশপাশের এলাকা থেকে এক বিশাল সংখ্যক মুসলমান ডোডা এলাকার দিকে পালায়। গুজব ছড়ায় – যারা প্রাণ বাঁচাতে ডোডা পালিয়ে গেছে, তারা ডোডার জঙ্গলের মধ্যে একটা “মিনি-পাকিস্তান” বানিয়ে ফেলেছে।
পরে, যখন শেখ আবদুল্লা সরকারিভাবে এমার্জেন্সি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রধান হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করবার পরে জম্মু শহরে আসেন, তখন একটি গুডউইল ডেলিগেশন টিম বানানো হয় – যাতে ছিলেন কাথুয়ার তৎকালীন এমার্জেন্সি অফিসার গিরধারী লাল ডোগরা, হিন্দু সভার গোপাল দত্ত মেঙ্গি, আঞ্চলিক ন্যাশনাল কনফারেন্সের সম্পাদক সৈয়দ নাজির হুসেন সামনানি, এবং আটা মহম্মদ নামে একজন ফরেস্ট অফিসার। এই টিম বিলাওয়ারে গিয়ে সেই জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা মুসলমানদের উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনেন। তারা প্রায় কিচ্ছু খেতে পায় নি ততদিন।এই উদ্ধারকার্যে আমি এবং স্টুডেন্টস ইউনিয়নের কিছু সদস্য যুক্ত ছিলাম। কাশ্মীর থেকে একদল সশস্ত্র শান্তিবাহিনি আমাদের সঙ্গে ছিল। মাচেদি ফেরার পথে, আমাদের সেই মুসলমানেরা তাদের দুঃখ আর আতঙ্কের কাহিনি শোনাচ্ছিল। আমরা হিন্দু সাম্প্রদায়িক গুণ্ডাদের কবল থেকে অনেক মুসলমান মেয়েদেরও উদ্ধার করেছিলাম এবং তাদের জম্মু এনেছিলাম পুনর্বাসনের জন্য।
এই হত্যাকাণ্ড থামানো বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার কোনও চেষ্টা তো মহারাজার প্রশাসন করেই নি, উলটে তারা পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক গুণ্ডাদের হাতে অস্ত্র তুলে তাদের আরও হিংসায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্পষ্টতই, এটা আরএসএস পরিচালিত সম্পূর্ণ পরিকল্পিত একটা গণহত্যা ছিল, যাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা কিছু সশস্ত্র শিখ শরণার্থী, এবং তারা স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা আর সহযোগিতা পেয়েছিল। জম্মুতে নামকরা উকিল লালা দীননাথ মহাজনের নেতৃত্বে হিন্দু-শিখ ডিফেন্স কমিটি তৈরি হয়, সরকারি সমর্থনপুষ্ট হয়ে। মহাজন পরে বকশি গুলাম মহম্মদের মন্ত্রীসভায় অর্থ-রাজস্ব মন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন।
নৃশংসতম ঘটনা ঘটে জম্মু শহরের তালাব খটিকান এবং মোহল্লা উস্তাদ এলাকার মুসলিম বসতিতে। তাদের ঘিরে ফেলে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়, একটি দানা খাদ্য, এক ফোঁটা জলও সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। শহরের অন্যদিকে লাখদাতা বাজার এবং পীর মিঠা বাজার ছিল হিন্দু আর মুসলমান বসতির মধ্যেকার সীমারেখা। মুসলিমপ্রধান এলাকার বাইরে অন্যান্য এলাকার মুসলিমদের নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল, খুন করেছিল দাঙ্গাবাজেরা, যারা শহরে কার্ফু চলার সময়েও খোলা অস্ত্রশস্ত্র হাতে করে গাড়িতে চেপে শহর দাপিয়ে বেড়াত। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, কার্ফু চলাকালীন শুধু মুসলমানদের গতিবিধিই নিয়ন্ত্রণ করা হত। মোহল্লা উস্তাদ এলাকার বিচ্ছিন্ন মুসলমান বন্ধুদের জন্য আমাদের কয়েকজন বন্ধু কিছু খাদ্যশস্যের জোগাড় করে পৌঁছে দিয়ে আসতে পেরেছিল। কর্নেল পীর মহম্মদ এবং আরও কিছু রাজসভার লোক যদিও তাঁদের বাড়ির সামনে শান্তির প্রতীক হিসেবে সাদা পতাকা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, তবুও দাঙ্গাকারীরা তাঁদের বাড়িতেও আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিল। লাখদাতা বাজার আর পীর মিঠা বাজারের সীমারেখার কাছাকাছি হিন্দু বাড়িগুলোতে হিন্দুরা পজিশন নিয়ে বসে ছিল। পরে তাদের সাথে যোগ দেয় পাটিয়ালা থেকে আসা একদল দাঙ্গাকারী। তালাব খটিকান এলাকার মুসলিমরাও প্রাণরক্ষার তাগিদে হাতের কাছে যা অস্ত্র পেয়েছিল তাই নিয়ে একত্র হয়েছিল। পরে মুসলিম কনফারেন্স তাদের কিছু সাহায্য করে।
জম্মুতে এবং জম্মুর চারদিক থেকে অবিশ্রান্ত মুসলিম হত্যাকাণ্ডের খবর আসছিল। গুজ্জর সম্প্রদায়ের নারীপুরুষ, যারা মূলত আশপাশের গ্রাম থেকে শহরে দুধের জোগান দিত, তাদের দলে দলে কচুকাটা করা হয়েছিল। রামনগর রাখ ভর্তি হয়ে গেছিল গুজ্জর পুরুষ, নারী আর শিশুদের মৃতদেহে। আমার এক সহকর্মী এক সকালে রামনগর এলাকায় প্রাতর্ভ্রমণ করতে গিয়ে এক বাচ্চার চীৎকার শুনে দৌড়ে যায় এবং আবিষ্কার করে একটা আট-ন বছরের বাচ্চা মেয়ে তার নিহত বাবা-মায়ের মৃতদেহের সামনে বসে তারস্বরে কাঁদছে। সে মেয়েটিকে নিয়ে আসে এবং ১৬ই নভেম্বর, ১৯৪৭, যখন শেখ আবদুল্লা জম্মুতে আসেন এবং মোহল্লা উস্তাদে একটা রিলিফ ক্যাম্প স্থাপন করেন, সেই ক্যাম্পে গিয়ে মেয়েটিকে রেখে আসে।
তালাব খটিকান এলাকার মুসলিমদের আত্মসমর্পন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। অসহায় অবস্থায় তাদের নিয়ে আসা হয় জোগি গেট পুলিশ লাইনে, আজ যেখানে দিল্লি পাবলিক স্কুল অবস্থিত। নিরাপত্তা দেবার পরিবর্তে সেখানে প্রশাসন তাদের বলে পাকিস্তানে গিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা খুঁজে নিতে। প্রায় ষাটটি লরিতে প্রথম দফার মুসলিমদের বোঝাই করা হয়, তাদের সিয়ালকোট নিয়ে যাবার জন্য। তারা জানত না তাদের ভাগ্যে কী ঘটতে চলেছে। গাড়িগুলোকে প্রশাসনের বাহিনি এসকর্ট করে নিয়ে চলে, কিন্তু যখন তারা শহরের বাইরে জম্মু-সিয়ালকোট রোডের চত্থা এলাকায় পৌঁছয়, বিশাল সংখ্যক সশস্ত্র আরএসএসের গুণ্ডা এবং শিখ শরণার্থীরা সেখানে তাদের ঘিরে ধরে। প্রতিটা গাড়ি থেকে মুসলমানদের টেনে নামানো হয় এবং প্রত্যেককে কুপিয়ে কুপিয়ে মারা হয়। এসকর্ট করা সৈন্যরা কেউ কেউ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, বাকিরা চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ড দেখেছিল। কাউকে জানতে দেওয়া হয় নি এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে, পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়েছিল। পরের দিন আর এক দফা মুসলমান পরিবারকে লরিতে করে নিয়ে আসা হয় এবং তাদেরও একই পরিণতি হয়। শুধুমাত্র কয়েকজন যারা বেঁচে পৌঁছতে পেরেছিল সিয়ালকোট, তাদের কাছ থেকে শোনা গেছিল সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের কাহিনি।
কোনও রেকর্ড রাখা হয় নি, তাই বলা সম্ভব নয় ঠিক কতজন মারা গেছিলেন, ধর্ষিত হয়েছিলেন বা অপহৃত হয়েছিলেন। তবে সংখ্যাটা যে কয়েক হাজারের থেকে কম নয়, সেটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
রাজ্য প্রশাসন যথারীতি এই হত্যালীলায় তাদের অংশগ্রহণের তত্ত্ব অস্বীকার করে। আমি, এখানে শুধু দুটো ঘটনার কথা উল্লেখ করব প্রশাসনের এই হত্যালীলায় যুক্ত থাকার প্রমাণ হিসেবে, যা জম্মুর জনঘনত্বের চরিত্র পালটে দিয়েছিল। আমি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে “ইনসানিয়ত কে নাম পর ” শীর্ষকে একটি আপীল করেছিলাম সাধারণ মানুষের কাছে, শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখবার জন্য, এবং দাঙ্গাবিধ্বস্ত হিন্দু, শিখ ও মুসলমান শরণার্থীদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেবার প্রচেষ্টায় সবাইকে সামিল হতে আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমরা একটা ছাত্রদের শান্তিকমিটিও গঠন করেছিলাম। আমাকে শমন পাঠান জম্মুর তৎকালীন রাজ্যপাল লালা চেত রাম চোপড়া, কাচি ছাওনিতে তাঁর সরকারি বাসভবনে। অত্যন্ত বিনীতভাবে তিনি আমাকে হুমকি দেন, “তোমার এই ছ্যাঁচড়ামোর জন্য আমি চাইলেই তোমাকে এক্ষুনি গরাদের পেছনে পাঠাতে পারি। কিন্তু তুমি কিনা আমার মতই খত্রি (ক্ষত্রিয়) এবং কোনও না কোনওভাবে আমার দূর সম্পর্কের বেরাদর, আমি তাই তোমাকে আপাতত উপদেশ দিচ্ছি। এটা শান্তি কমিটি গঠন করা বা শান্তির জন্যে কাজ করার সময় নয়, এখন সময় হচ্ছে সাম্প্রদায়িক মুসলিমদের হাত থেকে হিন্দু আর শিখদের রক্ষা করার, যারা হিন্দু আর শিখদের খুন করার চক্রান্ত করছে এবং পরিস্থিতি বিগড়ে দিচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই একটা হিন্দু-শিখ ডিফেন্স কমিটি গঠন করেছি। তুমি আর তোমার বন্ধুরা যদি একে সমর্থন করো তো ভালো।” অতঃপর তিনি বলেন, “আমরা হিন্দু আর শিখ যুবকদের অস্ত্রচালনার ট্রেনিং দিচ্ছি রেহারি এলাকায়। তুমি আর তোমার বন্ধুরা যেন অতি অবশ্যই সেই ট্রেনিংয়ে যোগ দেয়”। আমি যখন পরের দিন আমার এক সহকর্মীকে সেই ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠাই, সেখানে সে দ্যাখে কিছু আরএসএসের লোককে আর কিছু যুবককে থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সেনার লোকেরা।
আরেকটা ঘটনা যেটা আমার মনে পড়ছে, সেটা মেহর চাঁদ মহাজনকে নিয়ে। তিনি জম্মু এসে পৌঁছনোর পরে হিন্দুদের একটি ডেলিগেশনের সাথে দেখা করেন, এবং বলেন যে ক্ষমতা যখন হস্তান্তর হচ্ছেই, তখন তাদের উচিত সাম্যের দাবি করা। এনসির এক সদস্য তখন তাঁকে প্রশ্ন করেন সাম্য কীভাবে সম্ভব যেখানে জম্মুর জনসংখ্যায় এতখানি বৈচিত্র্য আছে? কাছেই রামনগর রাখ, যেখানে তখনও কিছু মুসলমানের লাশ পড়ে রয়েছিল, সেইটা দেখিয়ে মহাজন বলেছিলেন, “জনসংখ্যার অনুপাতও তো বদলানো যায়”।
জম্মুর সাম্প্রদায়িক হানাহানি অবশ্যই একতরফা ছিল না। এক বড় সংখ্যক হিন্দু আর শিখও নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল মুসলমান ঘাতকদের হাতে, রাজৌরি, মিরপুর, এবং কিছু এলাকায় যেগুলো এখন পাকিস্তানের অধীনে পড়ে। রাজৌরিতে যেখানে মুসলমান-প্রধান এলাকা থেকে হিন্দুরা সরে আসছিল, সেই সময়েই অন্য এলাকা থেকে মুসলমানেরাও সরে আসছিল মুসলমান-প্রধান এলাকায় – একই পথে। মুসলমানদের দল হিন্দুদের গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং গণহত্যা, ধর্ষণ আর লুটতরাজ চালায়। মিরপুর জেলাতেও এক বড় সংখ্যক হিন্দু খুন হয়েছিল। মুসলমানেরা যখন মিরপুরের জেলাসদর থেকে কাছাকাছি গ্রামে এবং ঝিলমে চলে আসছিল, হিন্দুরা তখন সদরে ফিরে আসছিল নিরাপত্তার খোঁজে।
আসলে এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, আরএসএসের গুন্ডারা যখন রাজা ইকবাল খান আর শেখ ইমাম দিন নামে দুই মুসলমান পুলিশ অফিসারকে খুন করে, তখন থেকে। কিছু এনসি সমর্থককেও আক্রমণ করা হয়েছিল। হিন্দুরা সব চেয়ে বেশি মাত্রায় খুন হয়েছিল কাসগুমাতে, যেখানে মুসলমান দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু প্রাক্তন আইএনএ-র সদস্য, যারা জম্মু ফিরছিল। এক বিশাল সংখ্যক হিন্দু শরণার্থী, যারা গরুর গাড়িতে আর পায়ে হেঁটে চলছিল সদরের দিকে, বিনা খাবারে, বিনা জলে, তাদের সবাইকে নৃশংসভাবে খুন, ধর্ষণ আর অপহরণ করেছিল মুসলিম সাম্প্রদায়িক গুণ্ডারা। কেউ কেউ পালিয়ে বেঁচেছিল, তারা পৌঁছেছিল চৌকি চৌরা গ্রামে, যেখান থেকে তাদের জম্মুতে নিয়ে আসা হয়। একই রকম ভাবে আলিবেগ এলাকাতেও হিন্দু আর শিখ শরণার্থীদের দলে দলে হত্যা করা হয়।
… … …
সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার সেই দিনগুলোকে স্মরণ করার পেছনে আমার একটাই উদ্দেশ্য, এটা বোঝানো যে সাম্প্রদায়িকের কোনও ধর্ম হয় না। সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে প্রথম মৃত্যু ঘটে মনুষ্যত্বের, মানবিকতার। বিশেষ কাউকে এই দেশভাগের হত্যালীলার কারণে দোষ দেবার বদলে আমাদের উচিত এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া, যাতে কখনও কোনও সাম্প্রদায়িক দল বা শক্তি আমাদের শান্তি সম্প্রীতিকে নষ্ট করতে না পারে। ১৯৪৭এর সেই উন্মাদনার জন্য একদিকে যেমন আমার মাথা লজ্জায় হেঁট হয়ে যায়, অন্যদিকে গর্বে আমার মাথা উঁচু হয়ে যায় এই মনে করে যে, জম্মুর আলোকপ্রাপ্ত এবং রাজনৈতিকভাবে ম্যাচিওরড লোকজন সেই সময়ে সেই অন্ধকার দিনগুলোর শেষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পেরেছিলেন, যা উপমহাদেশের অনেক সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঘটনার বিপরীতে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

মূল ইংরেজি পেপার থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন  শমীক মুখার্জি । 

প্রদোষে প্রাকৃতজন: মহাকালের প্রশ্ন

অদিতি ফাল্গুনী

('চলো, আমরা যবন ধর্ম গ্রহণ করি শ্যামাঙ্গ! এ ধর্ম ত্যাগ করলে আমরা যে মৃত্তিকা থেকে বিচ্যুত হব') 


কথাসাহিত্যে রচনা কর্মের আঙ্গিক নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক হতে দেখা যায়। চোদ্দ শতকে স্পেনে সার্ভেন্তেসের রচিত ‘দন কিহোতে’ কি উপন্যাসের সূচনা বিন্দু? অনেকেই যেতে চান আরো অতীতে। ভারতের মহাভারত, পঞ্চতন্ত্র, জাতক কাহিনী বা কথাসরিৎসাগর, আরবের আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা, গ্রিসের ঈশপ’স টেলস, ইতালীর ‘দেকামেরন’ প্রভৃতি প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যিক ট্র্যাডিশনে অনেক সমালোচকই আধুনিক গল্প ও উপন্যাসের বীজ সণাক্ত করেন। আঠারো-উনিশ শতকীয় রুশ বাস্তববাদী ঘরানায় কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘ পরিশ্রম এবং বলতে গেলে গবেষণা সাপেক্ষে (বাংলা উপন্যাসে তারাশঙ্করের এমন কাজ আছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে, দেবেশ রায়ের উপন্যাসগুলোও অনেকটা সেই ধাঁচের) একটি নির্দিষ্ট স্থান বা ভৌগোলিক পরিসর, একটি নির্দিষ্ট সময় এবং সেই সময় ও পরিসরে নানা পাত্র-পাত্রীর বিচিত্র আচরণ-কর্ম-স্বপ্ন-বাসনা-হতাশার প্রায় দালিলিক বিবরণ ‘গ্র্যাণ্ড নভেল’ হিসেবে প্রায়ই প্রশংসিত হয়ে থাকে। উনিশ শতকীয় রুশী ঘরানায় তলস্তয়ের এমন ধাঁচের সর্বাধিক কাজ রয়েছে। ইংরেজি উপন্যাসে চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাসগুলোও এই ঘরানার। ফরাসী ঔপন্যাসিক বালজাক বা গুস্তাভ ফ্লবেয়ারও এই ‘রিয়েলিস্ট’ ঘরানার উপন্যাসই লিখেছেন। অথচ তলস্তয়ের কিছুটা আগের সময়ের হলেও রচনাশৈলীতে আরো পরবর্তী সময়ের বলে মনে হয় সেই দস্তয়েভস্কির লেখা রিয়েলিস্ট হয়েও খুব রিয়েলিস্ট নয়। তাঁর পাত্র-পাত্রীরা কখনো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা সংলাপ (ব্রাদার্স কারামাজভ্স-এ যেমন) আবার কখনো টানা মনোলগের জগতে (ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্টে রাস্কলনিকফ যেমন) আচ্ছন্ন থাকে। উনিশ শতকের গ্র্যাণ্ড ন্যারেটিভের শেষে বিশ শতকের প্রথমার্দ্ধে ইংরেজি ভাষায় ফকনারের রচনায় স্যুরিয়ালিস্ট রচনাশৈলীর নিরীক্ষা পেল পাঠক। পাশাপাশি ছিল হেমিংওয়ের রিয়েলিস্ট, সরল গদ্যে লেখা মিতায়তণ সব উপন্যাস। ১৯৩০-এর দশকেই পূর্ব ইউরোপের প্রাগ নগরীর এক ক্ষীণকায়-অসুস্থ-অবিবাহিত-ইহুদি যুবক ফ্রাঞ্জ কাফকা বিশ শতকের উপন্যাস বদলে দিলেন যখন গ্রেগর সামসার পোকাতূল্য জীবন বোঝাতে সত্যিই তাকে পোকা করে দিলেন তিনি কলমের অদ্ভুত এক আঁচড়ে। আমেরিকা না গিয়েও লিখলেন ‘আমেরিকা।’ কী অপরাধ করেছে না জেনেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মরতে মরতে তাঁর নায়ক জোসেফ কে. বললেন, ‘কুকুরের মতো!’     

‘হুতোম প্যাঁচার নকশা,’ ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বা ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ ইত্যাদি আদিপর্বের উপন্যাসের পর বাংলা উপন্যাসের যৌবন শুরু হয়েছিল বঙ্কিম চন্দ্রের হাতে। শরৎ চন্দ্রের বিপুল জনপ্রিয় সব আখ্যানের পর বিশ শতকের শুরু থেকেই ‘তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ে’র হাতে বাংলা উপন্যাস ত্রিবিধ মাত্রা পাওয়া শুরু করে। তারাশঙ্করের আখ্যানে রাঢ়-বীরভূম অঞ্চলের স্থানিক কাহিনীগুলো মহাকাব্যিকতা অর্জন করে। মাণিক আসেন তাঁর ভয়াবহ তীক্ষè ও নির্মেদ গদ্যের তলোয়ার নিয়ে...ভিখু-কুবের-কপিলা-শশী-কুসুম-হেরম্ব-চারু-পরীদের অদ্ভুত মনোবিকারের জগতে! পাশাপাশি বিভূতি ভূষণের অনন্য প্রকৃতিচর্যা ও জীবনবেদ আমাদের ভাবনার বিষয় হয়ে ওঠে! দেশভাগের পর বাংলা সাহিত্যের ভুগোল প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলায় যে কথা সাহিত্যিকের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয় তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। ‘একটি তুলসী গাছের আত্মকাহিনী’ নামে গল্পেই পাঠক তাঁর জাত চিনতে পারে। একে একে পাঠক পায় তাঁর ‘লালসালু,’ ‘কাঁদো নদী কাঁদো, ‘চাঁদের অমাবশ্যা’ বা ‘কদর্য এশীয়’র মত সব উপন্যাস। শওকত ওসমান, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত প্রমুখ পঞ্চাশের ও ষাটের দশকে এপার বাংলার কথাসাহিত্যের ভুবন পরিপুষ্ট করেছেন। এরপর সত্তর, আশির দশক হয়ে নব্বই ও শূণ্যের দশকেও অনেকেই এসেছেন এবং লিখছেন এই বাংলায়। রচনার আয়তনের কথা মাথায় রেখে এই নোটে আমি লেখক শওকত আলীর একটি মাত্র উপন্যাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ নিয়েই আলাপ করব।

লেখক শওকত আলীর নিজেরই একাধিক উপন্যাস যেমন ‘উত্তরের খেপ,’ বা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে লেখা ট্রিলজি ‘দক্ষিণায়নের দিন’- ‘কুলায় কালস্রোত’ বা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস ‘দলিল’ কিম্বা তাঁর পরের দশকের লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’ বা ‘চিলেকোঠার সেপাই'য়ের মত ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ সমসাময়িক জীবন বা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লেখা ‘দালিলিক’ ঘরানার উপন্যাস নয়। এই উপন্যাস আয়তনেও খুব বিপুল নয়। মিতায়তণ এই আখ্যান আলো ফেলেছে কিছু অতীতে। কিছু অতীতে বলতে কয়েক শতাব্দী আগে। কোন্ সেই সময়? বাংলায় সেন বংশের শেষকাল। উচ্চবর্ণ বা উচ্চকোটির মানুষের হাতে নিপীড়িত-দলিত সমাজের নব্বই ভাগ অন্ত্যজ ও নারীর ঘোর দুঃসময় কাল। পাল রাজবংশের সময়ে বর্ণাশ্রমের দলিত যে অন্ত্যজ শ্রেণী বৌদ্ধ হয়েছিল, সেই বৌদ্ধরাও সেন আমলে দারুণ নির্যাতিত। এই ডোম-ডোমনী, শুঁড়ি-শুঁড়িনী, ধোপা-ধোপানী, মেছুনি...এরাই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে, বজ্রযান আর সহজিয়া চর্যায় আশ্রয় নিয়েছিল মুক্তির আশায়। তাদের সবারই তীব্র তাড়নপর্ব চলছে সেন রাজ্যশাসনে। শ্যামাঙ্গ নামে এক মৃৎশিল্পী যুবককে ইতিহাসের এই প্রদোষকালের ফ্রেমে নায়ক হিসেবে এঁকেছেন শওকত আলী। শ্যামাঙ্গ আত্রেয়ি বা বর্তমান উত্তর বাংলার আত্রাই নদীর পাশ দিয়ে চৈত্রের এক খরতাপ দিনে আসার সময় ক্লান্ত হয়ে এক গৃহস্থ বাড়িতে আশ্রয় নেয়। গৃহস্থের কন্যা শ্যামাবতী প্রবাসী বণিক বসন্ত দাসের স্ত্রী। শ্যামাঙ্গকে সে ভাইয়ের মত যত্ন করে। শ্যামাবতীরই সখী লীলাবতী আবাল্য স্বামী পরিত্যক্তা একটি সুন্দরী মেয়ে। শ্যামাঙ্গ আগামীকাল সকালে যেপথে যাবে সেপথে লীলাবতীর শ্বশুরবাড়ি বলে শ্যামাবতী তার সখীর জন্য শ্বশুরবাড়ি ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন স্বামীর খোঁজ-খবর এনে দিতে শ্যামাঙ্গকে অনুরোধ করে।

ধীরে ধীরে নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে শ্যামাঙ্গ আর লীলাবতী পরষ্পর প্রণয়-সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। লীলাবতীর স্বামী কোন না কোন ঘোর সূক্ষ্ণ কারণে লীলাবতীকে ত্যাগ করেছে (সেই সময়টা হিন্দু নারী পতি বা শ্বশুরকুল থেকে ক্ষুদ্র-বৃহৎ, সূক্ষ্ণ-স্থূল লক্ষাধিক নানা কারণে যেমন প্রায়ই পরিত্যক্ত হত; অন্য কোথাও বিয়ে করারও আর উপায় থাকত না তার)। অনাথা লীলাবতীকে দেখার প্রায় কেউই নেই এই সংসারে। কিন্তু তাকে ভোগ করবার, তাকে অন্যায় উপদ্রব করার মানুষের অভাব নেই। ক্ষত্রিয়-রাজপুরুষ-সৈন্য-সামন্ত....কে নয়? অস্বাভাবিক নয় যে কোমল ও শিল্পী হৃদয়ের শ্যামাঙ্গ লীলাবতীর এই কষ্টে তার পাশে দাঁড়াতে চাইবে, তাকে রক্ষার চেষ্টা করবে। কিন্তু শ্যামাঙ্গ আর লীলাবতী চাইলেই ত’ হবে না? কুলীশ কঠোর হিন্দু সমাজকেও যে চাইতে হবে! বল্লাল সেন-লক্ষণ সেনের এই সমাজে ডোমনীকে ভোগ করে, প্রাপ্য পারিশ্রমিক না দিয়ে এবং তাকে খুন করে অনায়াসে চলে যেতে পারে উচ্চ বর্ণের রাজপুরুষ। নারীকে গণিকা করার, সেবাদাসী করার শত সহস্র পথ! তাকে সম্মান জানানোর একটি রাস্তাও খোলা নেই! এই বাংলায় গৃহস্থের তখন ঘোর দুর্দিন। পথে পথে দস্যু আর ডাকাতদের আক্রমণ। পথে পথে লুণ্ঠন আর অরাজকতা। একটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি কতটা দুর্বল হলেই না মুষ্টিমেয় কিছু বহিরাগত সৈন্য জয় করে একটি গোটা দেশ ও জনপদ? চাপিয়ে দিতে পারে তাদের ধর্ম? এটা ত’ সেই সময়েরই গল্প। তেমনি প্রদোষকালে লীলাবতীকে রক্ষা করতে প্রেমিক শ্যামাঙ্গ তাকে নিয়ে ছুটছে নানা জায়গায়। এই খবর লীলাবতীর রাজ অমাত্য স্বামী জেনে গেছে। স্ত্রীকে জীবনেও ঘরে না নিলেও স্ত্রীর অন্য পুরুষের সাথে জীবন যাপন যে মানবে না। শ্যামাঙ্গ ও লীলাবতীকে তাই তাড়া করে ফিরছে রাজার সৈন্যরা। এমনি পালিয়ে চলার জীবনেও ওদের মানসিক প্রেম দৈহিক ঘনিষ্ঠতায় গড়ায়। অন্তসত্ত্বা হয় লীলাবতী। ততদিনে তূরকরা (তুর্কিরা) এদেশে এসেছে। সেন রাজত্বে নিপীড়িত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা সভা করছে যে তারা ‘যবনদের’ স্বাগত জানাবে কি জানাবে না। যবনদের স্বাগত জানিয়েও প্রাণে বাঁচতে পারে না বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। লীলাবতী আরব থেকে আসা এক সুফী সাধকের কেন্দ্রে আশ্রয় ও চিকিৎসা পায়। পথঘাটের সর্বব্যপী নৈরাজ্য ও অরাজকতা থেকে বাঁচাতে লীলাবতীকে যবন সাধু পুরুষের আশ্রয় কেন্দ্রেই রেখেছিল শ্যামাঙ্গ। দিন কয়েক পরে তার খোঁজ নিতে এলে নিজের জীবন, প্রেমিক শ্যামাঙ্গ এবং অনাগত সন্তানের জীবন বাঁচাতে মরিয়া লীলাবতী বলে, ‘শ্যামাঙ্গ! চলো, আমরা যবন ধর্ম গ্রহণ করি!’ লীলাবতী আরো জানায়, ‘আমি ওদের মন্ত্রটা শিখেছি। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদার রসুলুল্লাহ! বলো ত’ ওদের মন্ত্রে ল অক্ষরটা এত বেশি কেন?’ বলে পুনরায় হাসিতে আর কৌতুকে লুটিয়ে পড়ে লীলাবতী। সে নতুন জীবনের আস্বাদ চাইছে।

শ্যামাঙ্গ হাহাকার করে। লীলাবতীকে বোঝাতে চায় যে পিতৃ পুরুষের ধর্মে যতই অন্যায় আর ভুল থাকুক সেই ধর্মই যে মৃত্তিকার ধর্ম।

‘এই ধর্ম আমাদের মৃত্তিকার ধর্ম লীলাবতী! এই ধর্ম পরিত্যাগ করলে আমরা আমাদের শেকড় থেকে বিচ্যুত হব!’

উত্তরে লীলাবতী জানায় সে এত বড় বড় কথা বুঝবে না। তাকে বাঁচতে হবে। সে ঘর-সংসার-সন্তান চায়! হতাশ শ্যামাঙ্গ মেনে নেয়। বলে যে সে শুধু একবার বাইরে থেকে পথ-ঘাটের খোঁজ নিয়ে আবার ফিরবে। তারপরই গ্রহণ করবে নতুন ধর্ম। পথে বের হয়ে বাঁচতে পারে না শ্যামাঙ্গ। লীলাবতীর স্বামী এখন তূরকদের সহযোগী। শ্যামাঙ্গকে খুন করে তার বাহিনী। উপন্যাসের শেষে ঔপন্যাসিক জানান যে শ্যামাঙ্গকে বাঁচিয়ে রাখার কোন উপায়ই তাঁর ছিল না। ইতিহাসের সেই ঘোর প্রদোষকালে শ্যামাঙ্গর মত এক সংবেদী শিল্পীর মৃত্যুই ছিল একমাত্র পরিণতি। তবে শ্যামাঙ্গকে আজো খুঁজে পাওয়া যাবে উত্তর বাংলার নওগাঁয় পাহাড়পুর বা বগুড়ার মহাস্থানগড়েরর বৌদ্ধ বিহারের অজস্র মাটির রিলিফ, টেরাকোটা কাজ আর মৃৎ প্রতিমায়।

শওকত আলী যেকথা আর বলেন না কিন্তু আমরা জেনে যাই সেটা হল লীলাবতী নিশ্চিত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তাঁর এবং শ্যামাঙ্গর সন্তানও নিশ্চিত মুসলিম হয়েছিল। নতুন ধর্মের আশ্রয়ে সে শ্যামাঙ্গর মৃত্যুর পর হয়তো আরো একটি বিয়ে করতে সক্ষম হয়েছিল। বঙ্কিম চন্দ্র যতই বলতে চান না কেন যে সতেরো জন অশ্বারোহী নিয়ে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের গল্প যে বাঙালী বিশ্বাস করে সে কাপুরুষ, শুধু ‘বর্বর তরবারি’র জোরে ইসলাম বাংলা বিজয় করেছে এই বাক্যেও প্রতীতী রাখা কঠিন। বর্ণাশ্রমের কঠোরতা, সমাজে নারীর শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থানের জায়গায় জাত-পাতহীন, নারীর জন্য বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের অধিকার দাতা ইসলাম সেই সময়ের প্রেক্ষিতে নির্ঘাৎ একটি ‘মুক্তিদাতা’ ধর্ম হিসেবেই দেখা দিয়েছিল। একথা মানতে বাংলার হিন্দু যতই কুণ্ঠা বোধ করুক, বুক তার পুড়ে গেলেও তথ্যটা মিথ্যা হয় না বা হবে না। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দিচ্ছে যে সিন্ধুতে ইরাকি সেনাপতি বিন কাশিমের অভিযানের সময় রাজা দাহিরের হাতে দলিত জাঠরা শঙ্খধ্বনি দিয়ে বিদেশী সেনাপতিকে অভিবাদন করেছিলেন। হিন্দু ঐতিহাসিকরা এই তথ্য প্রাণপণে অস্বীকার করতে চাইলেও লাভ নেই!

তবে রিচার্ড ঈটনের ‘দ্য রাইজ অফ ইসলাম ইন বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার্স’ গ্রন্থে অবশ্য বর্ণাশ্রমই যে বাংলায় গণ ধর্মান্তরের কারণ সেটি অস্বীকার করা হয়েছে। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন যে তাহলে উত্তর প্রদেশ, বিহার বা মধ্য প্রদেশের মত রাজ্যগুলোয় যেখানে বর্ণাশ্রম ছিল আরো কঠোর, আরো সহিংস সেখানেই অধিকতর মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারত। সেটি কেন হল না? কিন্তু এর পাল্টা হিসেবে ঈটন যে কারণ বলছেন সেটাও মানা কষ্টকর। ঈটন বলতে চাইছেন বাংলার একটি বিস্তীর্ণ অনাবাদী অরণ্য অঞ্চলের মানুষ ছিল মূলতঃ প্রকৃতি পূজারী। যেমন সুন্দরবনের বাঘ বা কুমির উপাসনা, সিলেটের অরণ্যে অরণ্যচারীদের আরো নানা প্রকৃতি উপাসনা। প্রথাগত হিন্দু বর্ণাশ্রমের ভেতর তারা ছিলই না। কোন সুনির্দিষ্ট, সংগঠিত ধর্মই ছিল না এই অরণ্যচারী বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষের। মোগল আমলে মোগল রাজপুরুষদের নির্দেশে (মূলতঃ দিল্লীর মোগল সম্রাটদের রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য) বাংলার চট্ট্রগ্রাম-খুলনা-সিলেট সহ নানা জায়গায় বিশাল অরণ্য সাফ করে যে আবাদ করা হচ্ছিল, সেই সব অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশ থেকে আসা সুফী সাধকরা। অরণ্যগুলোয় এই মেহনতের কাজের বদলে অরণ্যচারী বাঙালীকে খাবার ও মজুরি দেওয়া হত। বন সাফ করে এই আবাদি জমিগুলোয় বানানো হত মসজিদ। প্রায়-ধর্মহীন বাঙালী দলে দলে হলো ধর্মান্তরিত। সুন্দর যুক্তি। কিন্তু ভরসা হারাতে হয় যখন ঈটন লেখেন যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সুফী সাধকরা ‘বাঙালী’কে ধান চাষ শিখিয়েছেন...তখন এটা বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে বসে লেখা থিসিস বলে ভ্রম হয়। বাঙালী হাজার বছর আগে থেকে ধান চাষ, মাছ ধরা, নৌকা বানানো আর কাপড় বোনার কাজ পারে। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ তাকে কি করে ধান চাষ শেখাবে? তবে হতে পারে যে ‘বর্ণাশ্রমে’র কঠোরতা ছিল না বলেই উত্তর প্রদেশ বা বিহারের থেকে এখানের মানুষের পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাটা সহজতর হয়েছে? সোজা বাংলায় এখানে ‘মারের উপর’ থাকলেও সাধারণ মানুষ ততটা ‘মারের উপর’ ছিল না? এত দিন পরে ইতিহাসের অত অত শতাব্দী আগের ঘটনা নিয়ে  কিছু পরিষ্কার ভাবে বলা কঠিন। বলার চেষ্টাও অন্যায়।

তবে আর একটি বিষয় ভেবে দেখা উচিত সবার। অবিভক্ত বাংলায় সম্ভবতঃ ১৯০০ সালের জনগণনায় প্রথম দেখা যায় যে হিন্দুদের চেয়ে মুসলিমরা জনসংখ্যায় এগিয়ে। বর্ণাশ্রম ছাড়া আরো একটি বড় কারণ থাকতে পারে নারীর প্রতি বাঙালী হিন্দুর আচরণ। আমার এক প্রাক্তন ভারতীয় (বিহারি) হিন্দু উর্দ্ধতন কর্মকর্তা আমাকে কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালী হিন্দুকে পছন্দ করি না। এরা অবাঙালী হিন্দু ত’ বটেই, বাঙালী মুসলিমের থেকেও নির্ঘাৎ কথায় কথায় দশটা বইয়ের রেফারেন্স বেশি দিতে পারে। অনেক পড়–য়া। অনেক সাহিত্য-সংস্কৃতি বোঝে। অথচ আজো গয়া-কাশিতে গেলে যত বিধবা তার নব্বই ভাগ বাঙালী হিন্দু। সতীদাহে বাঙালী হিন্দু নারী যত পুড়েছে, সো-কল্ড কনসার্ভেটিভ রেস্ট অফ ইণ্ডিয়ায় অবাঙালী হিন্দু নারী তত পোড়ে নি।’ ঐ বিহারি কর্মকর্তা কোন অজানা কারণে আমার সাথে প্রচন্ড মন্দ ব্যবহার করলেও তার এই বক্তব্য ফেলে দেবার নয়। আইনের ছাত্রী হিসেবে এটুকু শুধু জানি উত্তর ভারতের মিতাক্ষরা হিন্দু আইনের তুলনায় বাংলায় প্রচলিত দায়ভাগা হিন্দু আইনে নারীর ছিটেফোঁটা মাত্র বেশি অধিকারও আখেরে বাঙালী হিন্দুকে নিজের মা-বোন-স্ত্রী-কন্যাকে জীবন্ত চিতায় ঠেলতে উৎসাহিত করেছে। গোটা বাংলা সাহিত্য ভরে আছে হিন্দু বিধবার চিতায় অন্তর্জলি যাত্রা, বিধবার একাকিত্ব, নিগ্রহ আর ভ্রূণহত্যার গল্পে। শতাব্দীর পর শতাব্দী এ ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি প্রতিবেশি সম্প্রদায়ে একটি মেয়ে বৈধব্য বা স্বামী বিচ্ছেদের পর বারবার বিয়ে ও সন্তান ধারণের অধিকার পাচ্ছে। এই একটি কারণই কি একটি সম্প্রদায়কে জনসংখ্যায় শতাংশ হারে এগিয়ে দিতে যথেষ্ট নয়? এ দিকটা কেন গবেষকরা এত দিনেও ভেবে দেখেন নি সেটাই আশ্চর্যের। অভিজিৎ সেনের উপন্যাস ‘মৌসুমী বায়ুর উপকূলে’ গ্রন্থেও বাংলার বরিশাল-নোয়াখালি-চট্টগ্রাম অঞ্চলে মগ (বার্মিজ) বা পর্তুগীজ আক্রমণে ফ্রেফ মগের ছোঁয়ায় একজন নারীকে তার পরিবার শুদ্ধ জাতচ্যুত করা এবং এমন নানা কারণে গ্রামকে গ্রাম ইসলাম ধর্ম গ্রহণের (এমনকি উচ্চ বর্ণের হিন্দুরও ধর্মান্তরিত হবার) আখ্যান আমরা পাই।

যে বা যত সংখ্যক কারণেই অবিভক্ত বাংলায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশি হয়ে থাকুক না কেন, জনমিতির এই সংখ্যাধিক্য বাংলা ভাগ ও দেশভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পলাশীর যুদ্ধের পর গোটা ভারত তথা বাংলার মুসলিম পিছিয়ে পড়েছিল আধুনিক শিক্ষায়। বাংলার বর্ণহিন্দু সারা ভারতেই শিক্ষা-দীক্ষায় নেতৃত্ব নিয়েছিল। এই অগ্রযাত্রায় কিছুটা নিজের বিকাশ নিয়ে চিন্তিত বাঙালী মুসলিম ভারতের মুসলিমের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিন্নাহর আবেদনে সাড়া দিয়েছিল। এরপরও বাংলায় বাঙালী হিন্দুর এই শোচনীয় দশা হত না যদি না দীর্ঘদিনের দলিত হিন্দুরা যোগেন মন্ডলের নেতৃত্বে পাকিস্থানের পক্ষে অপশন না দিত। বৃটিশ শাসকের নৃ-তাত্ত্বিক দস্তাবেজ অনুযায়ী বাংলার একমাত্র ‘মার্শাল রেস’ বা ‘সামরিক সম্প্রদায়’ নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠি (আদিতে মরা পোড়ানো বা চন্ডাল পেশায় নিযুক্ত থাকলেও পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে কৃষিজীবী) বিশ শতকের শুরু থেকে আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শে আসতে থাকে। পাকিস্থান সৃষ্টির আগে বা পরে বাংলার হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাগুলোয় অতি সুসংস্কৃত উচ্চবর্ণের হিন্দু ও তার মন্দিরকে মুসলিম আক্রমণ থেকে বারে বারে বাঁচানো ভয়ানক সাহসী ও আজন্ম কুশলী লাঠিয়াল  নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠি তাদের নিজেদের হিস্যা লাভেই কি পাকিস্তানে থেকে যাবার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয় (দ্রষ্টব্য: বরিশালের যোগেন মন্ডল, দেবেশ রায়)? পাকিস্তানী পুলিশ একাধিক দাঙ্গায় বুঝিয়ে দিয়েছে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পরিণাম (ফুটনোটে অতিরিক্ত সরলীকরণের ঝুঁকি নিয়েই বলা যায় যে শ্যামাঙ্গ আর লীলাবতীর সন্তানদের একটি অংশ হিন্দু বর্ণাশ্রমে ‘দলিত’ হিসেবেই রয়ে গেল; পিতৃ পুরুষের ধর্মে তারা দাঁত কামড়ে থেকে গেল সব গ্লানি আর অবমাননা নিঃশব্দে সহ্য করেই। আর একটি বিপুল অংশ আরবি-ফারসি নাম নিয়ে হয়ে গেল মুসলিম। যাহোক, পৃথিবীর বৃহত্তম দেশত্যাগ বা ‘হিউম্যান এক্সোডাসে’র বিনিময়ে (যার গোটাটারই বলি হয়েছে বাঙালী হিন্দু) বাংলা ভাগের পর নব পূর্ব পাকিস্থানে বাঙালী মুসলিমের শুরু হল কি নতুন লড়াই? যে লীলাবতী ‘যবন’ হলো আর তার সন্তানরাও হল ‘যবন’ নামধারী, কি হলো তাদের নতুন রাষ্ট্র পাকিস্থানে?

শ্যামাঙ্গ-লীলাবতীর যবন সন্তানদের রাষ্ট্র ‘পূর্ব পাকিস্থান’ থেকে ‘বাংলাদেশ’:

ওলন্দাজ গবেষক ভ্যান স্যান্দেল তাঁর ‘আ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশ’ গ্রন্থে ১৯৫২-এর একুশে ফেব্র“য়ারির ‘ভাষা আন্দোলন’ নিয়ে লেখা পরিচ্ছেদে বলছেন যে ১৯৪৮-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন উৎসবে জিন্নাহর বক্তৃতায় ‘উর্দু এন্ড ওনলি উর্দু উইল বি দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অফ পাকিস্থান’ বক্তব্যের প্রতিবাদে পরবর্তী চার বছরের ভাষা সংগ্রামে ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক চেতনা যেমন ছিল, তেমনি ছিল উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে রাষ্ট্রীয় নানা চাকরি, শিক্ষাসহ বিবিধ অর্থকরী সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে পড়ার মধ্যবিত্ত শ্রেণীগত আতঙ্ক। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ সরকারের পরাজয়, পঁয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধে ঢাকার অরক্ষিত অবস্থা এবং বাঙালী সৈন্যদের সাহসী ভূমিকার পরও উপযুক্ত স্বীকৃতি না পাওয়া, পাক সেনাবাহিনী-সরকারী চাকরি সহ নানা ক্ষেত্রে বাঙালীর প্রতি বৈষম্য তদানীন্তন পাকিস্থানে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নির্ভর জাতীয়তাবাদী বিপুল আবেগ ও গণজোয়ারের সৃষ্টি করে। ছিলেন অসমসাহসী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২-৭৫ সাল পর্বে তাঁর সরকারের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কী করে অস্বীকার করা যাবে পাকিস্থান আমলে তাঁর সুদীর্ঘ কারাভোগ আর অমানুষিক তিতিক্ষা? সারাদিন কাজ করে আমাদের মত মানুষেরা অফিসে বসের কাছে দুই টাকা বেশি চাইতে ভয়-সঙ্কোচ-কুণ্ঠা বোধ করে। তিনি অবলীলায় তাঁর ছয় দফা দাবিতে একটি প্রদেশের জন্য পৃথক মুদ্রা চেয়েছেন। ১৯৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ইসলামী চেতনার পরিবর্তে বাঙালী মুসলিম ও তাঁর সাথে বাঙালী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই লড়াই করেছিল নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। কিন্তু শ্যামাঙ্গ আর লীলাবতীর সন্তানদের যুদ্ধ এখানেই কি শেষ হয়ে গেল? কখনোই না। সেই ১২০০ শতক থেকে ১৯৭১...সাত শতাব্দীর ধর্মান্তরিত মানুষদের ভেতর অর্ন্তদ্বন্দ্বের কিছু প্রকাশ ত’ ১৯৭১-এ দেখা গেছে। গোলাম আজমদের মত মাস্টার মাইন্ডদের কথা বাদ দিই। গ্রাম দেশেও অনেক সাধারণ মানুষ ‘রাজাকার’ হয়েছেন। কারণ ‘ইসলাম’ ও ‘পাকিস্তান’ ততদিনে তার কাছে সমার্থক। প্রতিবেশী হিন্দু...যে আদি হিন্দুরই ধর্মান্তরিত সন্তান সে...সেই হিন্দুই আজ তার কাছে ‘মূর্তিপূজারী কাফের।’ প্রতিবেশী তথা পূর্ব পুরুষের  উপাসনালয় ও বিগ্রহ আজ তার কাছে ‘শয়তানের স্থান।’ বিদ্যাধর নাঈপল একবার তেহরানে রোজার মাসে গিয়ে সারা শহর ঘুরে পিপাসার্ত অবস্থায় এক বোতল পানীয় জল না পেয়ে বিস্মিত হয়েছিলেন। ‘ধর্মান্তরিতদের ভুবন’ নামে বই লিখেছেন তিনি। পারস্য ছিল নিজের সভ্যতায় নিজেই সমৃদ্ধ। চির শত্র“ আরবের ধর্মে আজ সে কিকরে এতখানি বদলে গেল? এই একই বিস্ময় ছিল পারস্য জাতীয়তাবাদী নেতা কৌরুশ আয়েরেমানের। হ্যাঁ, ইরানী মুসলিম পরিবারেই জন্ম হয়েছিল তাঁর। বড় হবার সাথে সাথে পারস্য সভ্যতা নিয়ে গভীর পড়াশোনায় এক পর্যায়ে তিনি হতবাক হয়ে আবিষ্কার করেন যে বহিরাগত আরবরা তাদের খুন-ধর্ষণ-ক্রীতদাস বানানোর মত কাজ করেছে, সেই আরবের ধর্মই আজকের ইরাণ বহন করে চলেছে স্বগর্বে। ‘ইসলামী’ নাম পরিত্যাগ করে পুনারায় অগ্নি উপাসক সময়ের পারসিক নাম ‘কৌরুশ আয়েরেমান’ নাম ধারণ করেন তিনি। গড়ে তুলেছিলেন ‘ইসলাম না ইরাণ?’ নামের আন্দোলন। খোমেনীর গুপ্ত ঘাতক বাহিনী প্যারিসে তাঁকে হত্যা করে। ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরাণে আজো ঈদের থেকে ‘ঈদ-ই-নওরোজ’ বা ‘পারসিক নববর্ষ’ বেশি জনপ্রিয়। ইসলামী শাস্ত্রে পন্ডিত কবি ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ পুরোটাই প্রাক-ইসলামী অগ্নিপূজারী বীর ও রাজাদের শৌর্যবীর্যের কাহিনী। পারস্য জাতীয়তাবাদকে পুষ্ট করতেই এই কাব্য লিখেছিলেন তিনি।

কৌরুশ আয়েরেমানের মত অত প্রবলভাবে না হলেও বাংলাদেশেও এই বিপুল ‘ধর্মান্তরিত’ জনগোষ্ঠির আত্ম-পরিচয়ের দ্বন্দ, নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে বহিরাগত ধর্মের দ্বন্দ্বই গত বেয়াল্লিশ বছরের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, টানাপোড়েন আর মতাদর্শিক সঙ্ঘাতের উৎসস্থল হয়ে উঠেছে। ‘ধর্মান্তরিত’ এই বাঙালী মুসলিমের ভেতর থেকেই মোনায়েম খানের মত রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধকারী মানুষ তৈরি হয়েছে; তৈরি হয়েছে তমদ্দুন মজলিশ, নির্মিত হয়েছে আরবি হরফে বাংলা লেখার আন্দোলন। আবার এই আরবি-ফার্সি নামধারী বাঙালী মুসলিমের ভেতর থেকেই ওয়াহিদুল হক-সানজিদা খাতুনদের ‘ছায়ানট’ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের লড়াই হিসেবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে চলেছে গত প্রায় পাঁচটি দশক। এই বাঙালী মুসলিমই পা্কিস্তান রাষ্ট্র কাঠামো যুদ্ধ করে ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গে বাঙালী হিন্দু  উত্তর ভারতীয় ও হিন্দি ভাষার আধিপত্যবাদী শাসনের সাথে এমন পাল্টা লড়াই কেন লড়ে নি এটা ভাবার বিষয়। হয়তো পাকিস্থানে বাঙালী মুসলিমের যে জনসংখ্যাগত গরিষ্ঠতা ছিল, সেটা না থাকা একটা কারণ হতে পারে।

কিন্তু ১৯৭১ সালে বাঙলাদেশ নামে রাষ্ট্র গঠনের পরেও শ্যামাঙ্গ-লীলাবতীর ধর্মান্তরিত সন্তানদের আত্ম-পরিচয়ের দ্বন্দ্ব ঘুচলো কি? ঘুচলো যে না তার প্রমাণ ১৯৭১-এর নয় মাসে অসংখ্য বাঙালী মুসলিম পরিবার যেমন অনেক বাঙালী হিন্দুকে আশ্রয় দিয়ে জীবনে বাঁচিয়েছে, অনেকেই প্রতিবেশীর সম্পত্তি লুট করেছে। দেলোয়ার হোসেন সাঈদিরা খুন-ধর্ষণ-লুট করেছে। আমার নিজের মা’ই যে প্রতিবেশিনীকে সরল বিশ্বাসে কিছু সোনার গহনা-তৈজসপত্র জিম্মায় দিয়ে বনগাঁ গেছিলেন, যুদ্ধের পর ফিরে এসে সেই প্রতিবেশীনীকেই বিশ্বাস করে আমানত হিসেবে দেওয়া গয়না পরে সগর্বে ঘুরতে-ফিরতে দেখে (যেন এটা তারই গহনা) লজ্জায় কিছু বলতে পারেন নি। আবার আমার বড় ভাইকে পঁচিশে মার্চের ক্র্যাক ডাউনের আগে বাঁচিয়েছেন বাবার মুসলিম বাল্যবন্ধু। এই আত্মদ্বন্দ্বের কারণেই একাত্তরে জাতি ধর্ম-নির্বিশেষে ‘এক দেহ এক প্রাণ’ হয়ে যুদ্ধ করা বাংলাদেশে বাহাত্তর সালেই দুর্গা প্রতিমার মাথা ভেঙ্গে গরুর কর্তিত মাথা স্থাপন করা হয়। পঁচাত্তরে জাতির জনকের হত্যার পর, তিন জাতীয় নেতা ও মুক্তিযুদ্ধ পন্থী সেনা অফিসার খালেদ মোশাররফের হত্যার পর দেশ হয়ে ওফে জিয়া-এরশাদ সহ একাধিক ধর্ম ব্যবসায়ী সেনা অফিসারের লীলাক্ষেত্র। ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরও আওয়ামিলীগ ভোট পেলে মসজিদগুলোয় উলুধ্বনি শোনা যাবে জাতীয় অপপ্রচারকে ক্যাশ করে খালেদা ক্ষমতায় আসেন। ১৯৯৬-এ হাসিনা, ২০০১-এ খালেদা, ২০০৮-এ আবার হাসিনা এবং বর্তমানে গত দুইমাস ধরে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে শাহবাগ আন্দোলন, জামাত-বিএনপি সহিংসতা, দাঙ্গা...এসবই কি শ্যামাঙ্গ-লীলাবতীর সন্তানদের আত্ম-পরিচয়ের দ্বন্দ্ব নয়? গণজাগরণ মঞ্চের নেতা ইমরান এইচ সরকার ধর্মনিরপেক্ষ ও বাঙালী জাতীয়তাবাদকে আঁকড়ে ধরে ফেসবুকে ‘ফ্রেন্ডশিপ রিকোয়েস্ট’ গ্রহণের শর্ত হিসেবে জানান দেন যে তিনি আগে ‘বাঙালী’ ও পরে ‘মুসলিম।’

  বাংলার ভূপ্রকৃতি আফগানিস্থান বা পাকিস্থানের মত মরু-মালভূমি প্রধান নয়। ভাষাও নয় পশতু-ফার্সি। লীলাবতী আর শ্যামাঙ্গদের ‘ধর্মান্তরিত’ সন্তানরা তাই যখনি ফুলের পাপড়িতে শহীদ মিনার বানায় (কারণ ‘পূজা’ বা ‘পুষ্পক্রীড়া’ তার শতাব্দী ব্যপী প্রজন্ম-ধমনীর রক্তে বাহিত), যখনি সে দীপ জ্বালায়, তারই অপর ভাই তাকেই কোপাতে আসে ‘ধর্ম গেল!’ বলে। এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ, সমাজ-রাষ্ট্রের এই বিপুল দ্বিকোটিকরণ, এই আওয়ামি লীগ-বিএনপি সাত শতাব্দীর লিগ্যাসি। সুশীল পত্রিকা-এনজিও-জাতিসঙ্ঘ দুই নেত্রীর মুখোমুখি সংলাপে সাত শতাব্দীর লিগ্যাসি ঘুচাবে? হ্যাঁ, গত চারদশকের সৌদি টাকা আর মাদ্রাসা শিক্ষা আজ গ্রামে-গঞ্জে বাঙালী মুসলিম নারীর ‘ড্রেসকোড’ বদলে দিয়েছে। আমার কৈশোরেও এত বোরখা আর এত চাদর আমি দেখি নি। আবার বোরখা পরা নারীকে আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে দেখেছি। স্বামীর শাসনে বোরখা পরিহিতা নারীকে পহেলা ফাল্গুনে বাসন্তী রঙের বোরখা পরে চুলে ফুল গুঁজতে দেখেছি। সার্টিফিকেটের নাম ‘মাহবুব’ বা ‘শামিমা’ রাখলেও বাঙালী মুসলিম চায় বন্ধু-বান্ধবী বা প্রেমিক-প্রেমিকা তাকে ‘হিল্লোল’ বা ‘বৃষ্টি’ নামের ডাকনামে ডাকুক।

সাত কি আট শতাব্দীর যে লিগ্যাসি আজ ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ-বরিশালের রাস্তায় আগুন হয়ে জ্বলছে, সেই অগ্নি নির্বাপণের সদুত্তর আমাদের কারো কাছেই নেই। বাঙালীর প্রদোষকাল আজো শেষ হয় নি। শওকত আলী আমাদের সেই মহত্তম লেখকদের একজন যিনি শ্যামাঙ্গ ও লীলাবতীর এই সংলাপের ভেতর দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আত্ম-পরিচয়ের সঙ্কট তুলে ধরেছেন। এই বই দুই বাংলার বাঙালী হিন্দু ও বাঙালী মুসলিম উভয়ের অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। বাঙালী মুসলিমের যে অংশ আজ এদেশকে আফগানিস্থান বানানোর স্বপ্নে দিশাহারা, তাকে পড়তে হবে আত্ম-পরিচয়ের প্রশ্নে। যে বাঙালী হিন্দু ওপারে গিয়ে সর্বভারতীয় আশ্রয়ে কোনমতে মাথা গুঁজে আত্মতৃপ্ত হয়ে ভাবছেন, ‘যাক, ওপারের মুসলিম গুন্ডাদের হাত থেকে পালিয়ে বেঁচেছি’ তারও এই বই পাঠ জরুরি আত্ম-বিশ্লেষণ ও আত্মশুদ্ধির জন্য। দু’জনকেই দু’জনের সঙ্কট-সমস্যা  বুঝতে হবে। তবেই মিলতে পারবে শ্যামাঙ্গ আর লীলাবতীর ধর্মান্তরিত ও অ-ধর্মান্তরিত সন্তানরা। কারণ মা প্রকৃতি ত’ আমাদের চেহারায় এমন ছাপ দিয়েইছেন যা কিছুতেই মালা-দাড়ি, তিলক-টুপিতে ঢাকার যো নেই।